রাজনীতির সাথে উন্নয়নের একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। রাজনীতি যদি ইতিবাচক হয় উন্নয়নের ধারাও ইতিবাচক হয়। এক্ষেত্রে দেশের আপামর জনসাধারণ, সরকার এবং সকল রাজনৈতিক দলই উন্নয়নের অংশীদার হয়। উন্নয়নে যেমন সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ে ঠিক তেমনি সরকারেরও পরিতৃপ্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। আবার এ কথাও মনে রাখতে হবে, একটি দেশের যেকোনো সরকার চাইলেই যেমন উন্নয়ন করতে পারে না, ঠিক তেমনি জনগণের সকল চাওয়ার সম্পূর্ণটাও পূরণ করতে সক্ষম হয় না। এর পেছনে থাকে নানাবিধ কার্য-কারণ। তবে সরকারের আন্তরিকতা, যোগ্যতা এবং উন্নয়নের প্রবল ইচ্ছাই রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারে।
বর্তমান সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। আর এই সুশাসন প্রতিষ্ঠার যাত্রায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা, দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণ এবং যোগ্যতা রয়েছে যথেষ্ট। তবে তার সামনে রয়েছে অপরিসীম চ্যালেঞ্জ এবং নানাবিধ বাধা-বিপত্তি। ইচ্ছা করলেই এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাও সহজ নয়। কারণ একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন নির্ভর করে ওই দেশের গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর। রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব বেশি থাকলে তা কাটিয়ে উঠে সুষ্ঠু রাজনৈতিক প্রবাহ তৈরি করা যেমন সহজ নয়, তেমনি রাজনৈতিক উন্নয়নের প্রবল ইচ্ছা থাকলেও সরকার প্রধানের একার পক্ষে তা করা সহজ নয়।
জাতীয় রাজনীতিতে সুস্থধারার গণতান্ত্রিক পরিবেশের ঘাটতি এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগী বা অঙ্গসংগঠনগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে যা করতে পারে না, সে-সবই করার চেষ্টা করে থাকে। সাধারণত সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে দেশে নানাবিধ অরাজকতা, লুটতরাজ, দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, লালফিতার দৌরাত্ম্য হয়ে থাকে। সরকারের উদাসীনতা থেকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড ক্রমেই বেড়ে যায়। বিগত সরকারগুলোর মতো বর্তমান সরকারের সময়েও অফিস-আদালতে ঘুষ না দিলে কোনো ফাইল নড়ে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের যথাযথ নিয়মে কোনো কাজ হয় না। বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসে, ক্ষমতা থেকে যায়, কিন্তু রাতারাতি অনুপ্রবেশকারী সুবিধাবাদীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সরকারের ভাবমূর্তি। আর এ কারণেই জনগণও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল থেকে নিজেদের মুখ ফিরিয়ে নেন। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় অন্য কোনো রাজনৈতিক দল। নষ্ট হয় উন্নয়নের ধারাবাহিকতা। বিষয়টি কেবল চাঁদাবাজি, ধান্দাবাজি ও ক্ষমতাসীন দলের পিছিয়ে-পড়া নেতাদের মন্ত্রী বনে যাওয়া বা ওপর মহলের নেকনজরে আসার দৌড় প্রতিযোগিতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এগুলো সবই সার্বিকভাবে অসুস্থ রাজনীতির নির্দেশক। কাজেই উন্নয়নের জন্য রাজনীতির পরিবেশটাও সুস্থ হতে হবে। সম্প্রতি তিন ব্যক্তির নামকে কেন্দ্র করে ৭১টি সংগঠন গজিয়ে ওঠা এবং রাজধানীভিত্তিক তাদের সবার দোকানবাজি ও ধান্দাবাজি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আরও কলুষিত করছে। জনগণের সমস্যা ও ন্যায়সংগত দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি গ্রহণের রেওয়াজ প্রায় উঠে যেতে বসেছে। এছাড়াও বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানাবিধ ‘বাণিজ্য সংস্কৃতি’ চালু হয়েছে। এসব ‘বাণিজ্য সংস্কৃতি’ বন্ধ করতে চাইলে মূল সংগঠনগুলোর নেতাদের উচিত হবে আরো সতর্ক হওয়া। ২০০৮ সালে ডিসেম্বরের নির্বাচনে জনগণ চেয়েছিল দেশের শাসন ব্যবস্থায় ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুণগত পরিবর্তন। একটি অসুন্দর ও শ্বাসরুদ্ধকর রাজনীতি কখনোই জনগণের কাম্য হতে পারে না। যেহেতু জনগণের ভোটে সরকার গঠিত, সেহেতু প্রত্যেক ক্ষমতাসীন দলের সরকারের উচিত জনগণের জন্য কাজ করা। দেশে সৃষ্ট নানাবিধ অপকৃষ্টি সৃষ্টির পেছনেও অনেকক্ষেত্রে রাজনীতিবিদদের অদক্ষতা এবং নেতৃত্বের দুর্বলতাকে দায়ী করা যায়।
বাংলাদেশে অসংখ্য মেধাবী রয়েছে, আবার এসব মেধাবীদের অসংখ্য বেকার রয়েছে। সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বেকারত্ব অনেকটা কমে গেলেও শিক্ষার উচ্চহারের কারণে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকায় তা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। আর এসব বেকারত্ব থেকে হতাশা ও অপরাধপ্রবণতাও বেড়ে যাচ্ছে। চাকরি না পেয়ে হতাশা নিয়ে যুবসমাজ টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, লুটতরাজ, খুন প্রভৃতি অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থেকে ওইসব সমস্যা সমাধানের যথাযথ উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও অন্যদের অবহেলা ও আন্তরিকতার অভাবে এমন নেতিবাচক সংস্কৃতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক কৃষ্টিতে যেকোনো ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ডের জন্য রাজনীতির যোগসূত্র তৈরি করা হয়। কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের যোগসূত্রতা থেকে এমন অপকাণ্ডগুলো ঘটে থাকে। এক্ষেত্রে দেখা যায় সাধারণত ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়েই এসব কর্মকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এ ব্যাপারে চরম আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তা বন্ধ করা যায় না নিম্নপর্যায়ের সহযোগী কর্মীবাহিনীর কারণে। ইদানীং দেখা যাচ্ছে, চাঁদাবাজির অনেক ধরন। রাস্তায় ট্রাক-বাস থামিয়ে চাঁদাবাজি বাংলাদেশে এখন ব্যাপক আকারে হচ্ছে। প্রায়ই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির নানাবিধ নমুনা দেখতে পাচ্ছি। দুর্নীতি সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে। একসময় ছাত্ররা রাজনীতি করত কিন্তু কারও পকেটের দিকে তাদের দৃষ্টি ছিল না। এখন শুধু টেন্ডারবাজিই নয়, ছাত্ররা নানাবিধ অর্থনৈতিক বাণিজ্যের সাথে নিজেদেরকে জড়িয়ে ফেলছে। শিক্ষা প্রশাসনেরও প্রতিটি স্তরে নানাভাবে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। একজন প্রাথমিক শিক্ষককে স্বামী কিংবা স্ত্রীর কর্মস্থলে বদলির জন্যও সরকারের উচ্চপর্যায়ের তদবির প্রয়োজন হয়। তাছাড়া শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে ঘুষ না দিলে সেই ফাইল কোনোভাবেই অনুমোদন হয় না। ফাইল এমন সময় অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হয় যে-সময় বদলির ওপর নিষেধাজ্ঞা চালু হয়। অথচ প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে সরকারি চাকরিজীবীরা অনায়াসে স্বামীর কর্মস্থলে বদলি হতে পারবে। এমন অনেক বাস্তব উদাহরণ আমি পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে পারব। পাঠকরাও নিশ্চয়ই এমন সমস্যার মুখোমুখি অনেকেই হয়েছেন।
কোনো সমাজেই অসামঞ্জস্য কিংবা অন্যায় কাজ চলতে পারে না যদি জনগণ ও তাদের সরকারের মধ্যে যোগাযোগ দূরত্ব তৈরি না হয়। বাংলাদেশে দেখা যায়, অধিকাংশ নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ নিজেদেরকে জনগণ থেকে সরিয়ে রাখেন। ফলে সরকারের অঙ্গ, সহযোগী কিংবা ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনের নেতা-কর্মীরা নিজেদেরকে বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার সুযোগ পায়। কখনো চাকরি বাণিজ্য, কখনো বদলি তদবির বাণিজ্য আবার কখনোবা খুন-হত্যার বাণিজ্যও করে থাকে এ অঙ্গবাহিনীর সদস্যরা। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন যেভাবে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ইত্যাদির মাধ্যমে লুটতরাজ করে এটা সম্ভব হতো না যদি নেতৃত্বের লুটতরাজের প্রভাব তাদের আচ্ছন্ন না করত। কাজেই সরকার তাদের ছাত্র সংগঠনের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও তার জন্য সন্ত্রাস বন্ধ করতে অপারগ হলেও এসবের মূল কারণ হলো তাদের নেতৃত্বের দুর্বলতা। তারা যদি সতর্ক থাকতো তাহলে তাদের নিচের স্তরের নেতাকর্মীরা কিংবা প্রশাসনের আমলারা এভাবে বেপরোয়া ঘুষবাজি-চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির পরিবেশ তৈরি করতে পারতো না।
শেখ হাসিনার গত মন্ত্রিসভা ভালো কাজ করেও যে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেননি তার অনেক কারণের মধ্যে একটা বড় কারণ হল, একশ্রেণীর মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পরস্পরবিরোধী লাগামহীন কথাবার্তা। এতে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। এবারের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ তৈরি না হলে নির্বাচনী বৈতরণী নিশ্চয়ই চ্যালেঞ্জিং হতো। একারণে বর্তমান মন্ত্রিসভার নতুন-পুরোনো সব সদস্যকে এই বলে সতর্ক হতে হবে যে, তারা যেন গত সরকারের একশ্রেণীর সদস্যের ভুলভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেরা বাক-সংযম করেন অর্থাত্ বেশি করে কাজ করেন এবং কথা কম বলেন। তারা যেন মনে রাখেন, তাদের বর্তমান সরকার প্রধানের অন্যতম লক্ষ্য হলো বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ গড়ার প্রত্যয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। নিজেদের যোগ্যতা, সততা ও অভিজ্ঞতা দ্বারা সংশয়াতীত জনসমর্থন ধরে রাখাই অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যেকোনো বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন। গত ২৬ জুলাই যুক্তরাজ্য সফর নিয়ে গণভবনে সংবাদ সম্মেলন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে তিনি জাপান এবং চীন সফর নিয়ে একইভাবে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এভাবে খোলামেলা কথা বলার প্রচলন করে শেখ হাসিনা জনগণের কাছে তার সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়েছেন নির্ভীকচিত্তে। তাঁর মানসিকতায় রাষ্ট্র পরিচালনায় শান্তি ও স্বস্তির আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। তবে দেশের সার্বিক পরিস্থিতিকে আরো অনুকূল ও ইতিবাচক করারও চ্যালেঞ্জ রয়েছে যথেষ্ট। কারণ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কণ্টকমুক্ত পরিবেশের পথে নানাবিধ বাধা রয়েছে। এছাড়াও সরকার-বিরোধী একটা চক্র ঐক্যবদ্ধভাবে সরকারের উন্নয়নের প্রচেষ্টা ব্যাহত করতে নানা অপতত্পরতা চালাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করে জনগণকে বিভ্রান্ত করা। ইতিপূর্বে হরতাল ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকারের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। আশাকরি ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করার ক্ষেত্রে সুবিবেচনাপ্রসূত ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভার কাছে আমাদের প্রত্যাশা— তাঁরা যেন নিজেদের মেধা, মনন আর বিচক্ষণতায় গঠনমূলক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশে সুশাসনের পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকে আরো বেশি সতর্ক থাকতে হবে। তাহলেই জনগণ, সরকার এবং প্রশাসনের প্রতিটি স্তরের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে রাজনীতি ও উন্নয়নকে সম্পর্কযুক্ত করা সম্ভব হবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: [email protected]
