আলোকপাত

রাজনীতি বনাম উন্নয়ন

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৪, ২১:৩১
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে পঁচাত্তর-পরবর্তী রক্তক্ষয়ী এক সহিংসতায় দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের মাধ্যমে অসুস্থ রাজনীতির যাত্রা শুরু হলেও সময়ের কাল-পরিক্রমায় এর চেহারায় ও প্রকৃতিতে এক বিশাল পরিবর্তন ঘটেছে। সে সময়কার শাসক মেজর জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি আমি কঠিন করে তুলব’ এবং এর পর থেকেই অসুস্থ রাজনীতির যাত্রা শুরু হয়েছিল বলে অনেকের অভিমত। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামী (বাংলাদেশ) কে রাজনীতির অনুমতি দিয়ে ও তদীয় দলের আমীর গোলাম আজমকে নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিয়ে অর্থাত্ মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়াউর রহমানের কাজগুলো ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক যা আস্তে আস্তে বিস্তৃতি লাভ করে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিকে পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসনের মাধ্যমে। সংবিধানের মূল দলিল থেকে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে সূচনা করা হয় ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা থেকে নেয়া বাজার অর্থনীতির মূলমন্ত্র এবং সমাজ পরিবর্তনের নূতন সংগ্রাম। শুরু হয় খাল কাটা কর্মসূচি ইত্যাদি এবং সেনা শাসন থেকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণের সিঁড়ি হিসাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন এবং পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ। কিন্তু এই গণতন্ত্র খুব একটা স্থায়িত্ব পায়নি বিভিন্ন কারণে। যেমন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি যাদেরকে তার নতুন দলে এবং সরকারে অন্তর্ভুক্তি করেছিলেন তাদের অধিকাংশই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি। উনিশশ’ বিরাশি সালে নতুন রূপে আবির্ভূত হয় আরেক শাসক তদানীন্তন সেনা প্রধান লে:জে: হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনিও পূর্বের ন্যায় সেনা শাসন থেকে গণতান্ত্রিক শাসনের উত্তরণ কিভাবে করা যায় সেই পথ অনুসরণ করে জাতীয় পার্টি গঠন করেছিলেন এবং ছিয়াশি সালে দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচন দিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে যাত্রা শুরু করে প্রায় বিভিন্ন মেয়াদে নয় বছর দেশ শাসন করে ঊননব্বইয়ের শেষের দিকে দেশব্যাপী স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এর মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় ধাপের অসুস্থ রাজনীতির পরিসমাপ্তি ঘটে সত্যি, কিন্তু আস্থার অভাব ও অবিশ্বাসের কারণে শুরু হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামে আরেকটি নতুন কল্পিত সরকার এবং এই সরকারের আওতায় নব্বই-এর সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় আসে পরবর্তী পাঁচ বছর রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশেষত সুস্থ ধারার রাজনীতির মাধ্যমে। সেই সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত পাঁচটি গণতান্ত্রিক সরকার ও চারটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাংলাদেশকে শাসন করে চলছে সত্যি, কিন্তু অসুস্থ ধারার রাজনীতি থেকে দেশ মুক্ত হয়েছে তা কোনভাবেই বলা যাবে না। এখন প্রশ্ন আসে, কেন এই আস্থাহীনতা এবং এর প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয় আদর্শিক রাজনীতির পরিবর্তে ক্ষমতার রাজনীতির প্রভাব যা দেশের দুটি বৃহত্তর রাজনৈতিক জোটের মধ্যেই বিদ্যমান। বিএনপি’র নেতৃত্বে ১৯ দল দুইবার এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দল তথা মহাজোট তিনবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় এবং এই যে পর্যায়ক্রমে পালা বদলের খেলা তা এটাই প্রমাণ করে যে, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক দল পাঁচ বছর সময়ে দেশের সাধারণ ভোটারদেরকে স্বস্তিতে রাখতে ব্যর্থ হয় বিধায় পরিবর্তন তখন অনিবার্য হয়ে যায়, অথচ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন, দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সরকারের ধারাবাহিকতার কোন বিকল্প নেই যার প্রকৃত উদাহরণ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারত। এখন প্রশ্ন আসে, এই যে পরিস্থিতি তা অর্থনীতিকে কিভাবে প্রভাবান্বিত করছে এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব কি হতে পারে এ নিয়ে সাংবাদিক, গবেষক, সুশীল সমাজ, ইত্যাদি এরি মধ্যে মন্তব্য দিতে শুরু করেছেন যা এক অনিশ্চিত যাত্রার শেষ কখন ও কোথায় তারই বার্তা বহন করে। গত ১৭ডিসেম্বর, ২০১৩ তারিখে একটি জাতীয় দৈনিকে সাংবাদিক শওকত হোসেন ও মনজুর আহমেদ ‘ধ্বংসের মুখে জীবিকা ও বিপর্যস্ত মানুষ’ এই শিরোনামে একটি গবেষণা ধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন যাতে দেশের সার্বিক অর্থনীতির একটি নিরপেক্ষ চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়। এই প্রতিবেদন মতে, স্বাধীনতার পর অনেক আন্দোলন হলেও এবারকার আন্দোলন দেশের চার দশকের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বিপন্ন করে ফেলেছে যা অপূরণীয়। যেমন বাজার ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিল্পে কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থা, বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যবস্থা, পর্যটন শিল্প ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, আবাসন শিল্প ইত্যাদি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৯০-এর পর থেকে প্রতিটি নির্বাচনী বছরেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, অসুস্থ রাজনীতির কারণে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এমন যদি একটি সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে তা কতদিন চিরস্থায়ী হবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায় এবং এই অবস্থায় টেকসই কোন দীর্ঘ মেয়াদী উন্নয়ন কোনভাবেই সম্ভব নয়। কারণ দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট নিয়েই নতুন সরকার ক্ষমতায় আসছে। এখন প্রশ্ন আসে, যারা ক্ষমতায় থাকে তাদেরকে বেশি উদ্যোগী হতে হয় সমস্যার সমাধানকল্পে যা বর্তমান সরকার নিয়েছে। তাদের রাজনৈতিক ইশতেহারেও এটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি মধ্যআয়ের দেশে পরিণত হবে যদি উন্নয়নের গতিধারা একইভাবে চলে। বিগত ও বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষার প্রসার, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রসার, নারীর ক্ষমতায়ন, কল্যাণকামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রত্যয় ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা। এই অবদানগুলো যেমন দেশীয়ভাবে স্বীকৃত একইভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত। বাংলাদেশ বিশ্বের পরবর্তী এগারো উন্নয়নশীল অর্থনীতির অন্যতম এবং ২০১১ সালে মার্কিন দৈনিক পত্রিকা ‘দি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’, ২০১২ সালে ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘দি ইকনোমিস্ট’ এবং ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর ব্রিটেনের ‘দি গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় উল্লেখিত আছে যে, ২০৫০ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি ইউরোপের প্রধান প্রধান কয়েকটি দেশের অর্থনীতিকেও ছাড়িয়ে যাবে। নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেন ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে বলেছেন, মানব উন্নয়নে অনেকগুলো সূচকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন ভারতের চেয়ে বেশি। বিবিএস খানা আয় ব্যয় জরিপ ২০১০ সালে বাংলাদেশের দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাসকারী জনসংখ্যার অনুপাত মাত্র ৩১.৫% যা ২০১৩ সালে ২৬%-এ নেমে এসেছে। ১৯৮১-৮২ সালে জিডিপি এর অনুপাত হিসাবে বৈদেশিক সাহায্য ১৩.৭% বিগত তিন দশক পর ২০১১-২০১২ বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীলতা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ২% এর নীচে। আরও গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ২০১১-২০১২ সালে এই বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের মাত্র ৩% ছিল খাদ্য সাহায্য। বাকি ৯৭% ছিল প্রকল্প ঋণ ও অনুদান। বিগত তিন দশকে বাংলাদেশ এখন আর খয়রাতি নির্ভর দেশ নয় বরং বাণিজ্য নির্ভর দেশে পরিণত হয়েছে। ২০১৪ সালের মার্চ শেষ নাগাদ মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দাঁড়িয়েছিল যা বর্তমানে ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার । ১৯৭২ সালে ধান উত্পাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ টন যা ২০১৩ সালে ৩ কোটি ৪০ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। আকস্মিক খাদ্য সংকট মোকাবেলার জন্য ১৭ লাখ টন খাদ্যশস্যের বিশাল মজুদ গড়ে তোলা হয়েছে। বিকাশমান পোশাক শিল্পে ৩৫ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানে ৯০% নারী শ্রমিক যা নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখছে। এম.ডি.জি. লক্ষ্য অর্জন ২০১৫ সালের মধ্যে বেশিরভাগ নিশ্চিত সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশের জন্য আরও আশার কথা, বিগত দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে বিশ্বের যে আঠারটি দেশ প্রবাসী আয়ে প্রত্যাশার তুলনায় ভাল করেছে বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বর্তমানে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৯০ মার্কিন ডলারে।এই সকল অর্জন অবশ্যি সুস্থ রাজনীতির মাধ্যমে অব্যাহত রাখতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের করণীয় কাজগুলো হলো, প্রথমত, যেকোন মূল্যে প্রশাসনিক যন্ত্রকে ব্যবহার করে শান্তি ফিরিয়ে আনা; দ্বিতীয়ত, বিরোধী দলের অসাংবিধানিক দাবিগুলো থেকে সরে এসে সুস্থ ধারায় রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের চেষ্টা অব্যাহত রাখা। দেশের গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে নির্বাচনের কোন বিকল্প নেই বিধায় দেশীয় সমস্যা নিজস্ব উপায়ে সমাধানের পথ বেছে নিতে হবে তাতেই সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে দেশের মর্যাদা বাড়বে।  লেখক : অর্থনীতিবিদ ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন