মনে মনে

বাঙালির বর্ষাযাপন

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৪, ২১:৩৪
কালিদাসের ঋতুসংহারে বর্ষা আসে রাজার বেশে, সঙ্গে রাজ ঐশ্বর্যের সব অনুষঙ্গ। মেঘ তার হাতি বাহন, বজ্র, বিদ্যুত্ আর ঝঞ্ঝা তার যুদ্ধের আয়ূধ। এমন বর্ষার মর্জি-মেজাজের সঙ্গে বাংলার বৃষ্টিবহুল বর্ষার মিল খোঁজা নিরর্থক। কালিদাসের অনেক পরে দশম শতকে পূর্ববঙ্গ অভিযানকারী দাক্ষিণাত্যের রাজা রাজেন্দ্র চোলের তিরুমুল্লাইলিপিতে লেখা রয়েছে—‘বঙ্গাল দেশ অবিরাম বৃষ্টির দেশ’। সে যাত্রায় পূর্ববঙ্গে চোলরাজার অভিযান দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তার হঠাত্ ফিরে যাওয়ার পেছনে সম্ভবত বাংলার প্রলম্বিত বর্ষাও কম দায়ী নয়। বাংলার অপরূপ বর্ষাকে খুঁজে পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের লেখনিতে। তার নানা গানে বর্ষার রূপ ফুটে উঠেছে তা শান্তিপুর-বোলপুরের বা রাঢ়বঙ্গের বর্ষা নয়। এই বর্ষা মূলত পূর্ববঙ্গে প্রলম্বিত অঝোরধারার বর্ষা, ঝিনাইদহ-সাজাদপুর-পতিসর অঞ্চলের সজল-কাজল-কোমল বর্ষা। দীর্ঘকাল পূর্ববঙ্গে বসবাসকারী রবীন্দ্রনাথের চেতনায় গাঁথা এই বর্ষা তাঁর গানের বাণী ও সুরের পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে। যদিও অনেক বর্ষার গানই তাঁর পূর্ববঙ্গ ছাড়ার পরে বোলপুরে বসে লেখা। ঢাকায় বর্ষার স্মৃতি পরিণত বয়সেও বিস্মৃত হননি ত্রিশের দশকের পুরানো পল্টনের বাসিন্দা তরুণ বুদ্ধদেব বসু। শাঁখা-শাড়ি আর বাকরখানির নানা অলিগলির ঢাকার চেয়ে বুদ্ধদেব বসু যা বেশি মনে রেখেছিলেন তা হল—পুরানা পল্টনের ধ্বনিবহুল, বর্ণবহুল, উচ্ছৃঙ্খল, অঝোরধারা বর্ষা। তখন পুরানা পল্টনের দক্ষিণে ছিল মাইল ছড়ানো মাঠ, পুবের দিকে ফুটবল খেলার বিশাল প্রাঙ্গণ। নিজেই লিখেছেন, ‘কী ঘন সমারোহ বর্ষা নামতো পুরানা পল্টনের নির্জন প্রান্তরে। মেঘের সমুদ্র আকাশকে জাপটে ধরে আছে। তখন বাইরে তাকালে মনে হয় পৃথিবী শেষ সীমা এইখানে।’ এখনও পুরানা পল্টনে বর্ষা নামে অঝোরে তবে তা হারিয়ে যায় উঁচু উঁচু বাড়ির মাথায়, দোকান পাটের ভিড়ে আর যানবাহনের উত্কট চিত্কারে। বর্ষা এলে এখন আর মনে হয় না পৃথিবীর শেষসীমা এইখানে। আমাদের কৈশোর যৌবনে বর্ষার আদিগন্ত মেঘ দেখতে ঢাকার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হতো না। শহরের প্রায় মাঝখানে রমনার ঘোড়দৌড়ের মাঠের যেকোনো প্রান্তে দাঁড়ালে ভেসে উঠত সবুজ ঘাসে ভরা এক আদিগন্ত মাঠ। হাঁড়ির মাছ যেন পুকুরে পড়ল। মাথার উপর ঘন মেঘের বুনটে ছাওয়া ধু-ধু আকাশ। সেই মাঠে বৃষ্টির দল নেমে হাত ধরাধরি করে নেচে বেড়ায়। মাঠের শেষপ্রান্তে গাড়িগুলো দেখায় যেন লাল রঙের ছোট ছোট মাছ বৃষ্টির নতুন পানিতে উজানে পাড়ি দিচ্ছে। ঘোড়দৌড়ের মাঠের ঠিক উল্টো দিকেই পাবলিক লাইব্রেরি। চত্বরের এককোণে সাজানো রয়েছে নভেরা আহমদের একগুচ্ছ অপূর্ব ভাস্কর্য। লাইব্রেরিতে যাওয়া-আসার পথে এরা আমাদের নিত্যসঙ্গী। সারা বর্ষায় মাঠের মেঘ রৌদ্রের ঢেউ দেখতে দেখতে আর পড়ার ফাঁকে ফাঁকে কখন যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো ফুরিয়ে গেল, বুঝতেই পারিনি। তারপর কেটে গেছে কতকাল। মনে হয় যেন সেদিন। চোখের সামনে দেখতে দেখতে আমাদের চেনা শহরটা বদলে গেল। এখন বর্ষায় রাজপথের হাঁটু পানি গা সওয়া হয়ে গেছে। জলাবদ্ধতায় পর্যুদস্ত শহরের জনজীবন থমকে থমকে বয়ে চলে। তবু জন্ম-রোমান্টিক বাঙালির বর্ষাপ্রণয়ের শেষ নেই। এই সমস্যাভরা শহরটিকে ঘিরে তার ভাব-ভালোবাসারও কমতি নেই। তাই তো একে বুকের কাছে কবচের মতো গভীর মমতায় জড়িয়ে রাখে সারাক্ষণ। লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন