স্বপ্নের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। স্বপ্নরাজ্যের বিভিন্ন স্তরে মানুষের অবাধ বিচরণ। তা সত্ত্বেও সব মানুষ কি স্বপ্নরাজ্যের সব স্তরে পৌঁছাতে পারে? হ্যাঁ পারে, যদি প্রতিটি মানুষ সব দিক দিয়ে সমান বিবেচিত হতে পারে। বিশ্বজগতে সবদিক বিবেচনায় প্রতিটি মানুষ সমান নয়, যেমন মানুষের স্বপ্নগুলোও সমান নয়। মানুষ তাঁর স্বপ্নের সমান বড়। সুতরাং স্বপ্ন ও মানুষের বড় হওয়ার মাঝে বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। স্বপ্ন মানুষের বড় হওয়ার সীমারেখা নির্ধারণ করে দেয়। এই বড় হওয়া হতে পারে অন্তরের বিশালত্বের দিক দিয়ে, হতে পারে মনুষ্যত্বের দিক দিয়ে। এই বড় হওয়া হতে পারে মহত্ত্ব কিংবা জ্ঞান গরিমার দিক দিয়ে। জীবসত্তার বিবেচনায় প্রতিটি মানুষ সমমর্যাদার অধিকারী। সেখানে মানুষের স্বপ্নের কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকে না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে মানুষ কীভাবে তার স্বপ্নের সমান বড়? একজন মানুষ যত বড় স্বপ্ন দেখে জীবসত্ত্বার সীমানা পেরিয়ে তার সত্তা কি তত বড় স্তরে পৌঁছে যেতে পারে? হ্যাঁ পারে। প্রশ্ন জাগতে পারে যদি তাই হয় তবে সব মানুষ স্বপ্নের উচ্চ স্তরে বিচরণ করে ‘বড় মাপের’ মানুষের স্তরে ইতোমধ্যে পৌঁছে যেত। যেহেতু স্বপ্নরাজ্যে সবার অধিকার ও অবাধ স্বাধীনতার সুযোগ রয়েছে, এবং স্বপ্ন দেখতে কোনো মূল্য লাগে না—কিন্তু বাস্তবিকই তা হয়নি কেন? মানব জাতির ইতিহাসে মানুষ যে সময় থেকে স্বপ্ন দেখতে শিখেছে, জীবসত্তার ঊর্ধ্বে গিয়ে সব মানুষ সমান ‘বড়’ হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ আমার আগের কথায় ‘স্বপ্নরাজ্যে সবার অধিকার ও অবাধ স্বাধীনতার সুযোগ রয়েছে’—এটি সর্বাংশে সত্য হলেও বাক্যের আরেকটি অংশ, ‘স্বপ্ন দেখতে কোনো মূল্য লাগে না’—এই কথাটি সত্য নয়। স্বপ্ন দেখতে মূল্য লাগে। সবাই সব স্বপ্ন দেখার সামর্থ্য রাখে না। কোনো মানুষ স্বপ্নের কত গভীরে ও বৈচিত্র্যময় অংশে বিচরণ করতে পারবে তা নির্ধারিত হয় তার গুণাবলী ও যোগ্যতার বিচারে। যোগ্যতা পার্থিব ও অপার্থিব উভয় মানদণ্ডেই বিবেচিত হতে পারে। অন্য কথায় বলা যায়, স্বপ্ন যেমন নির্ধারণ করে মানুষ কত বড় হবে তেমনি মানুষের গুণাবলীও নির্ধারণ করে যে, সে কতদূর পর্যন্ত স্বপ্ন দেখতে পারে। সুতরাং স্বপ্নরাজ্যের কোনো সীমা-পরিসীমা না থাকলেও স্বপ্ন দেখার পরিসীমা সেখানেই নির্ধারিত হয়, যেখানে একজন মানুষ তার অর্জিত গুণাবলীর ভিত্তিতে স্বপ্নের যত বেশি প্রকার রং, গন্ধ ও স্বাদ উপলদ্ধি ও নির্ণয় করার সামর্থ্য রাখে।
আধ্যাত্মিক ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, চিন্তাশীলতা, জ্ঞান, শিক্ষা অভিজ্ঞতা, জীবনাবোধ প্রভৃতি এই গুণাবলীর অন্তর্ভুক্ত। সুদূর তানজেনিয়ায় অবস্থিত সিরেঙ্গেটি পার্কের চিত্র আপনি ঘরে বসে ইন্টারনেটে একটা ক্লিক দিলেই দেখতে পারেন। কিন্তু পৃথিবীতে সিরেঙ্গেটি নামক যে একটি বিশাল পার্ক রয়েছে—এই তথ্যটি যদি আপনার না থাকে, তবে আপনি ইন্টারনেট রাজ্যে সার্চ দেবেন কীভাবে? স্বপ্নরাজ্যে স্বপ্ন দেখার বেলাতেও একথা সত্য।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন ঘুমন্ত মানুষের স্বপ্ন ও জাগ্রত মানুষের স্বপ্ন এক নয়। ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষ তার অর্জিত গুণাবলীর ঊর্ধ্বে গিয়েও নানা অদ্ভুত ও বিচিত্র স্বপ্ন দেখতে পারে। এই লেখায় সে-ই স্বপ্নই প্রতিপাদ্য, যা মানুষের ‘বড়’ হওয়ার সাথে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত এবং সে স্বপ্ন জাগ্রত অবস্থায় দেখা স্বপ্ন বৈ কিছু নয়। একজন ভূমিহীন সেই সাথে পূর্বোল্লেখিত গুণাবলীর নিম্নতর স্তর অধিকারী কৃষকের স্বপ্ন এত বড় হওয়াই খুব স্বাভাবিক যে, সে একসময় এক শ’ বিঘা জমির মালিক হবে। ঐ কৃষককে দিয়ে মঙ্গলগ্রহ পরিভ্রমণের স্বপ্ন দেখানো কখনই সম্ভবপর হবে না, যদি সে এটাই না জানে মঙ্গলগ্রহ বলতে মহাবিশ্বে কোনো কিছুর অস্তিত্ব বিরাজমান। অপরপক্ষে একজন মহাকাশ বিজ্ঞানী মঙ্গলগ্রহে পরিভ্রমণ, এমনকি সেখানে মানুষের স্থায়ী বসবাস নিয়ে সহজেই স্বপ্ন দেখতে পারেন। সে স্বপ্নের রং, গন্ধ ও স্বাদ তার উপলব্ধ।
লেখক : কবি, প্রবন্ধকার
লেখা পাঠাবার ঠিকানা :email :[email protected]
