নদীমাতৃক বাংলাদেশে একসময় আমরা মত্স্যসম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিলাম। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটি ইহা হইতেই উত্সারিত। কিন্তু এই ক্ষেত্রে আজ আমাদের অবস্থা অনেকটাই শোচনীয়। মাছ এখন আমাদের আমদানিও করিতে হয়। প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারত শুধু নহে, মাছ আমদানি করা হইতেছে পাকিস্তান, দক্ষিণ আমেরিকা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমানসহ বিভিন্ন দেশ হইতে। কিন্তু এই মাছে যে বিষাক্ত উপাদান থাকে বা থাকিতে পারে, সেই ব্যাপারে আমাদের কোন মাথাব্যথা নাই বলিলেই চলে। সমপ্রতি মধ্যপ্রাচ্য হইতে আমদানি করা ২২ কন্টেইনার মাছ পরীক্ষা করিয়া বিষাক্ত উপাদান তথা মাত্রাতিরিক্ত ক্যাডমিয়াম ও লেডের (হেভি মেটাল) উপস্থিতি পাওয়া গিয়াছে বলিয়া জানা যায়। ইহা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এইজন্য মত্স্য, বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করিতেছে যাহা আশাব্যঞ্জক। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর হইতে আমদানি করা মাছ খালাস করিবার প্রক্রিয়া বন্ধ করা হইয়াছে। যদিও সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকগণ তাহাদের পণ্যে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান থাকার কথা অস্বীকার করিয়াছেন।
জানা মতে, যেইসব দেশ হইতে মাছ আমদানি করা হইতেছে, তাহা সেই দেশের স্বাস্থ্যসনদ ছাড়াই জাহাজিকরণ করা হইতেছে। এইজন্য প্রয়োজনে আমাদের আমদানি নীতি পরিবর্তনের দাবি উঠিয়াছে। আর এই কাজে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য। আমাদের মাছ বিদেশে রফতানির ক্ষেত্রে যদি নানা পরীক্ষা-নীরিক্ষা করা হয়, তাহা হইলে আমদানি করা মাছ কেন পরীক্ষার আওতায় আসিবে না? এই প্রশ্নটি অযৌক্তিক নহে। তাহাছাড়া আজকাল সারাবিশ্বেই ভেজাল খাদ্যের ব্যাপারে সচেতনতা বাড়িয়াছে। এইবার আমের মৌসুমে আমে রাসায়নিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরকার দৃঢ়তার প্রমাণ দিয়াছে। যদিও আমদানিকৃত ফলের ভেজালরোধে বা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তেমন কোন উদ্যোগ যেমন তখন দেখা যায় নাই, তেমনি এখনও চোখে পড়িতেছে না। আমাদের বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার। ভেজাল খাবার আমরা নিজেরা খাইবো না, অন্যদেরকেও খাওয়াইবো না। রফতানি করি আর আমদানি করি সকল খাদ্যের মান নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়। জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরিয়া ছোট ইলিশ বা চান্দিনা ইলিশ আমদানি করা হইতেছে আমাদের দেশে। ইহাছাড়া ইলিশ প্রজাতিভুক্ত ফ্রোজেন গিজার্ড শাড ফিশ, হোয়াইট গিজার্ড শাড ফিশ, সার্ডিন, চাকোরি, ডটেড গিজার্ড শাড প্রভৃতি মাছ আসিতেছে বিদেশ হইতে। অথচ আমাদের ভাল ইলিশ রফতানি হইতেছে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে। এইসব আসলে চাহিদা ও বাজারের গতি-বিধির ওপরই নির্ভরশীল। ইলিশের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তুলনামূলকভাবে সস্তা ইলিশ সাধারণ মানুষের নিকট সরবরাহ করিতে ইলিশ প্রজাতির মাছ আমদানিকে বাঁকা চোখে দেখিবার কোন অবকাশ নাই। কিন্তু তাহা যদি হয় মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তাহা হইলে অবশ্যই তাহাতে আমাদের আপত্তি থাকিবে।
এইখানে আমাদের আরেকটি বিষয় বলিবার আছে। মাছের দেশ মাছ আমদানি করিতেছে বা মাছের জন্য দিন দিন অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল হইয়া পড়িতেছে এই বিষয়টি খুব ভাল শোনায় না। ইহাকে হতাশাজনক বলাই শ্রেয়। আসলে এই দুর্দশার মূল কারণ একদিকে নদীনালা সংকুচিত হইয়া পড়া, অন্যদিকে জনসংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়িয়া যাওয়া। কিন্তু আমরা এই দুই সমস্যা মোকাবিলা করিয়া আনুপাতিক হারে মত্স্য উত্পাদন বাড়াইবার তেমন কোন প্রচেষ্টা গ্রহণ করি নাই। দুঃখজনক হইল, এইক্ষেত্রে আমাদের আলস্য দূর হইতেছে না। মাছ চাষের বিকল্প পদ্ধতির সমপ্রসারণে আমরা এখনও বেখেয়াল। আজকাল আমাদের দেশেই কেহ কেহ ড্রামে করিয়া মাছ চাষ করিতেছেন যাহা উত্সাহব্যঞ্জক। কিন্তু ইহার বিপরীতে দেখা যায়, অনেক স্থানে পুকুর-নালাগুলি ঘষামাজা করিয়া মাছ চাষের উদ্যোগ নাই। বাড়িতে বা আশেপাশের জায়গায় সামান্য একটু গর্ত খুঁড়িয়াও মাছ চাষ করা যায়। নদীতে ভাসমান পদ্ধতিতেও মাছ চাষ করা যায়। কিন্তু এই ব্যাপারেও আমরা উদাসীন। এই ক্ষেত্রে সরকারের মত্স্য বিভাগেরও দায়িত্ব রহিয়াছে। এই ব্যাপারে আমাদের সচেতনতা বাড়িলে এবং গ্রামে গ্রামে ও পাড়া-মহল্লায় আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ করা হইলে মাছ চাষে বিপ্লব ডাকিয়া আনিতে পারে। তখন মাছ আমদানি করার তেমন প্রয়োজন পড়িবে না এবং মাছে-ভাতে বাঙালি প্রবাদটি এই যুগেও সার্থকতা অর্জন করিবে।
