মো. সুজাউদ দৌলা, প্রভাষক
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা
আমরা বাঙালি। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। বাংলার প্রতি দায় আমাদের অনেক। কিন্তু কতটুকু আমরা তা পূরণ করতে পেরেছি বা পারছি?
আমরা ইংরেজি শিখি অত্যন্ত যত্ন সহকারে। সন্তানদেরও শেখাই। ইংরেজি গ্রামারের নানা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে আত্মস্থ করার চেষ্টা করি এবং ভাবি তা না পারলে জীবন বৃথা। কিন্তু বাংলার প্রতি আগ্রহ আমাদের কতটুকু? বাংলা ব্যাকরণের কত সাধারণ বিষয় আমরা অহরহ ভুল করে যাই, কিন্তু একটুও তা সংশোধনের চেষ্টা করি না।
অথচ আমাদের এই বাংলা ভাষা কত সমৃদ্ধ। ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলার অবস্থান চতুর্থ। আমাদের আছে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম; আছে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ড. হুমায়ূন আজাদ সহ আরো কত ভাষাশিল্পী।
প্রিয় পাঠক, নিচে বাংলার কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হলো, যেগুলো খুব সহজ বিষয় বলে আমি মনে করি। একটু সতর্ক থাকলে বিষয়গুলো আমরা শিখতে পারি। সেটা শুধু আমাদের একার উপকার নয়; এগুলো আমাদের সন্তানদেরকেও আমরা শেখাতে পারি।
১। লক্ষ/লক্ষ্য
লক্ষ:‘লক্ষ’ শব্দের অর্থ হলো ১০০ হাজার । উদাহরণস্বরূপ বলা যায় : আমাকে এক লক্ষ টাকা দাও। আবার ‘লক্ষ’কে আমরা যদি ক্রিয়াপদ হিসেবে ব্যবহার করি তাহলেও য-ফলা দেওয়া লাগবে না। যেমন : নিজের শরীরের প্রতি সে কোনো লক্ষই করে না। আরো সহজ করে বলা যেতে পারে — লক্ষ-এর পরে যদি ‘করা’ বা ‘রাখা’ শব্দ থাকে তাহলে তাহলে ‘লক্ষ’ এর সাথে য-ফলা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।
লক্ষ্য : এই ‘লক্ষ্য’ শব্দের অর্থ হলো উদ্দেশ্য, সহজ কথা। এটি বিশেষ্য পদ। এখানে য-ফলা ব্যবহার করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় — দেশের উন্নতি করাই আমার একমাত্র লক্ষ্য।
২। কি/কী
কি : ব্যাকরণের নিয়ম অনুসারে এই ‘কি’ হলো অব্যয় পদ। একটি উদাহরণ দেয়া যাক : সে কি গান গায়? ‘কি’ ব্যবহার করলে বাক্যের ভিতরে প্রশ্ন আসে। আরো সহজ করে বলা যায়, কোনো বাক্যে প্রশ্নের উত্তরে যদি হ্যাঁ/না আসে তাহলে সেখানে ‘কি’ ব্যবহার করতে হবে। কী : ব্যাকরণের নিয়ম অনুসারে এই ‘কী’ হলো সর্বনাম পদ। এখানে একটি উদাহরণ দেওয়া যাক : সে কী খায়? এখানেও অবশ্য প্রশ্ন আসবে। তবে উত্তরে হ্যাঁ/না আসবে না। উত্তরে কোনো বিষয় বা বস্তুর নাম আসবে।
৩। কোলন (:)/বিসর্গ (ঃ)
কোলন (:) এবং বিসর্গ (ঃ) এ দুটোকে আমরা অধিকাংশই গুলিয়ে ফেলি। সাধারণে তো করেন এবং যারা বাংলা নিয়ে পঠন-পাঠন করেন তাদের মধ্যেও এ বিভ্রান্তি প্রায়ই লক্ষ করি। আমাদের জানা দরকার কোলন (:) হলো বিরামচিহ্নের একটি অংশ আর বিসর্গ (ঃ) হলো ব্যঞ্জনবর্ণের একটি বর্ণ, যাকে বলা হয়ে থাকে পরাশ্রয়ী বর্ণ। কোলন ব্যবহার করি আমরা সাধারণত উদাহরণ দেওয়ার সময়। যেমন : ‘পদ পাঁচ প্রকার। যথা :’। কিন্তু দুঃখের বিষয় অহরহ লক্ষ্য করছি এমন — ‘পদ পাঁচ প্রকার। যথাঃ’। আর বিসর্গ যেহেতু ব্যঞ্জনবর্ণ তাই এর ব্যবহার শব্দের ভিতরে থাকবে, অবশ্য দু একটি ক্ষেত্রে শব্দের শেষেও থাকে । যেমন : দুঃখ, অন্তঃস্থ ইত্যাদি। মনে রাখা দরকার বিসর্গ এর উচ্চারণ অনেকটা ‘হ’ এর মতো।
৪। ষ্ণ/ঞ্জ
ষ্ণ : এই যুক্ত ব্যঞ্জনটা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গোলমালের শেষ নেই। অধিকাংশের ধারণা ‘ষ্ণ’ এর ভিতরে ‘ষ’ এবং ‘ঞ’ রয়েছে। কারণ একটাই ‘ষ্ণ’ বর্ণে ‘ঞ’ পিঠের বোঝার মতো একটা বোঝা দেখা যায়। কিন্তু ‘ষ্ণ’ বিশ্লেষণ করলে ‘ষ’ ও ‘ণ’ হয়। শব্দে ব্যবহার করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। তৃষ্ণা, উষ্ণ শব্দদুটি উচ্চারণের সময় আমরা উচ্চারণের একেবারে শেষে ‘ণ’ এর উচ্চারণ পাচ্ছি। ‘ঞ’ এর উচ্চারণ এখানে আসছে না।
ঞ্জ : এই যুক্তবর্ণটির যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে দাঁড়ায়, ঞ্ + জ ; কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রায়ই এটা ভুল করে। এটাকে তারা ন্ + ঞ্ + জ এভাবে লেখে। ‘ঞ্জ’ বর্ণটির উপরাংশের বাম পাশে যে বাকানো অংশ সেটাকে তারা ‘ন’ মনে করে ভাবে এই যুক্তবর্ণের সাথে ‘ন’ যুক্ত আছে। আসলে কিন্তু ঐ বাকানো অংশটি ‘ঞ’ এর মাথার বাকানো অংশ। ‘ঞ্জ’ যুক্তবর্ণে ‘ন’ এর কোনো অস্তিত্বই নেই।
৫। উদ্দেশ/উদ্দেশ্য
এই শব্দ দুটো প্রায় একই রকম অর্থ প্রকাশ করে। তবে সামান্য অর্থের পার্থক্যও দেখা দেয়। তাই লেখার সময় অসতর্ক থাকলে প্রায়ই ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
উদ্দেশ : শব্দটির অর্থ ‘খোঁজ’ ‘লক্ষ্য’ ‘সন্ধান’। যেমন : তুমি কার উদ্দেশে ঢাকায় এলে? এখানে ‘উদ্দেশ’ অর্থ ‘খোঁজ’ বা ‘সন্ধান’ বোঝাচ্ছে।
উদ্দেশ্য : শব্দটির অর্থ হলো ‘অভিপ্রায়’ ‘তাত্পর্য’ ‘প্রয়োজন’। যেমন : লোকটা সুবিধের নয়, উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো কাজ করে না । এখানে ‘উদ্দেশ্য’ অর্থ ‘অভিপ্রায়’ বা ‘প্রয়োজন’ বোঝাচ্ছে।
