আলোকপাত

বার্ধক্যের স্মৃতিবিভ্রাট :একজন নিঃসঙ্গ উপাচার্য

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০১৪, ২১:২৭
অবরুদ্ধ অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা। নিজের ফ্ল্যাটেই তিনি অবরুদ্ধ। দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদটি পড়ে চমকে উঠেছি। থমকে গেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার শিক্ষা সনদে উপাচার্য হিসেবে যাঁর স্বাক্ষর, তিনি অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা! এই সনদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেক সাধনার ফল। জীবনকে অর্থময়, গতিময় ও প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন, এই সনদ যে তারই প্রমাণ। আর নিয়মিত অধ্যয়ন, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এই সনদ প্রাপ্তিকে নিশ্চিত করে। মনে পড়ে যেদিন মাস্টার্সের সনদ হাতে পেলাম বুক চিড়ে স্বস্তি, শান্তির শ্বাস বের হয়েছিল। সনদের প্রতিটি অক্ষর, শব্দ যেন এক একটা নক্ষত্র। উপাচার্যের স্বাক্ষর, তাও যে কতটা শৈল্পিক! এই স্বাক্ষর সনদকে আলোকিত করে, বৈধতা দেয়। একজন উপাচার্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অভিভাবক। যদিও আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, দেশে যে রাজনৈতিক দল যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, তখন সেই দলীয় সরকার তার দলীয় মতাদর্শের অনুসারী ব্যক্তিকে সমাজের, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বসিয়েছে। এই সুবাদে তর্ক, বিতর্ক বা যৌক্তিকতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মত বিশ্ববিদ্যালয়েও উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হয় রাজনৈতিকভাবে। যা হোক, যেভাবেই হোক পদটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সম্মানের। পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারলাম, পরিবারের দেয়া ভাষ্যানুযায়ী, স্যার স্মৃতিবিভ্রমে আক্রান্ত। যা হোক, এ আর নুতন কি? মানব জীবনে এ রকম ঘটনা ঘটতেই পারে। ঘটাও স্বাভাবিক। শুধু বয়স বাড়ার সাথে সাথে কেন, দুর্ঘটনা, আঘাত, মানসিক নিপীড়ন-নির্যাতনেও স্মৃতিবিভ্রম হতে পারে। যদিও আমাদের দেশে বয়স বাড়ার সাথে সাথে ব্যক্তির এমন বিপর্যয় এর কথা শোনা যায় অহরহ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, বয়সই কি শুধু স্মৃতিবিভ্রমের একমাত্র কারণ হতে পারে? বোধহয় না। পারিবারিক, সামাজিক কিছু কারণও পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে রয়ে যায় এর পেছনে। এ কারণগুলো পারিপার্শ্বিক যে সকল ব্যক্তি দ্বারা সৃষ্টি, হতে পারে তা তাদের অজ্ঞানবশত বা জ্ঞানবশত আচরণে সৃষ্টি। এ ক্ষেত্রে হয়ত দায়ী ব্যক্তি বা পরিবেশ বুঝে উঠতে সক্ষম হন না যে, তাদের কোথাও ফাঁক রয়ে যাচ্ছে কি না বা ভুল হচ্ছে কি না। হতে পারে পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগহীনতা এই না বুঝে উঠার মূল কারণ। যার পরিণতি স্মৃতিবিভ্রম এবং আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য তা দুর্বিষহ। স্যারের অবরুদ্ধ সংবাদের সাথে তাঁর স্মৃতিবিভ্রমের বিষয়টি মিলিয়ে দেখা বেশ কষ্টকর। অবরুদ্ধ শব্দ বড্ড অমানবিক। শাস্তির মত শোনায়, দেখায়, বোঝায় এবং সর্বোপরি এক ধরনের করুণ শাস্তিকে নিশ্চিত করে ব্যক্তির জীবনে। সেই সাথে চোখের সামনে কারাগারের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। জনবিচ্ছিন্নতা মানব সভ্যতার বিপরীত ধারা। বিপরীত সংস্কৃতি। জনবিচ্ছিন্নতা, ব্যক্তি মাত্রকেই চরম আঘাত করে, তাঁর অসহায়ত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তার উপর যদি কোন সামাজিক ব্যক্তিত্ব জনবিচ্ছিন্নতায় বসবাস করতে বাধ্য হন, তাহলে তার অসহায় অবস্থা সহজেই অনুমান করা যায়। জীবনের যে বয়সে অন্যের সান্নিধ্য, সঙ্গ প্রয়োজন, সেই বয়সে জনবিচ্ছিন্নতা ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক অবস্থার জন্য সুখকর হয় না। প্রকাশিত সংবাদে যা বলা হয়েছে পরিবারের পক্ষ থেকে অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা স্যারের অবস্থা সম্পর্কে, তাতে খুব স্বচ্ছ ও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় না। খুব স্বাভাবিকভাবে মনে প্রশ্ন জেগেছে, স্যার আসলেই কেমন আছেন? পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর চিকিত্সা চলছে এবং তাঁর নিরাপত্তার জন্য ঘরে মধ্যে আটকে রাখা হচ্ছে এমন দাবী করা হয়েছে। চিকিত্সা চলছে, এমন তথ্য মেনে নেয়া যায় বিষয়টি অপরিহার্য বলেই। এবং তা সকলের প্রত্যাশা পূরণ করে। কিন্তু আটকে রাখা হয়েছে নিরাপত্তার স্বার্থে, এমন তথ্য মেনে নিতে আমাদের কষ্ট হয়। বিবেকে বাঁধে। সঙ্গত কারণেই বলি, একজন প্রবীণ উপাচার্য, অধ্যাপক এমন নির্জন, নিঃসঙ্গ জীবন-যাপন করছেন, করবেন, তা কি করে মেনে নেয়া যায়? ভাবা যায়? যে মানুষের জীবন অতিবাহিত হয়েছে অসংখ্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শুভাকাঙ্ক্ষী, বন্ধু আর স্বজন দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে, যাঁর জীবন অনেকের জীবনে প্রদীপ জ্বেলেছেন, তাঁর জীবনের এমন মেঘ আঁধারের খেলা কি প্রত্যাশিত? নিশ্চয়ই নয়। শুধু মনিরুজ্জামান মিঞা স্যার কেন, কোন প্রবীণ ব্যক্তির জীবনেই এ ধরনের ঘটনা ঘটুক, তা বোধহয় মানবিক জ্ঞানসম্পন্ন, সুস্থ মস্তিষ্কের কারোরই কাম্য নয়। কাম্য হতেও পারে না। একটা সময় ছিল, যখন যৌথ পরিবারের চল ছিল সমাজ কাঠামোয়। মূল্যবোধ সঠিকভাবে গড়ে না ওঠা, ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব ও আধুনিকতার পদচারণায় ও বিস্তারের সাথে সাথে এই চল ফিকে হতে শুরু করে। ঠুনকো হয়ে যায়। সমাজ কাঠামোয় সৃষ্টি হয় একক পরিবারের ধারণা, যা নিজস্বতা আর স্বার্থপরতায় আবৃত, আচ্ছন্ন। সেই সাথে প্রযুক্তির বেপরোয়া ব্যবহারে মানবজীবনে যান্ত্রিকতার স্বাদ বাড়িয়ে দেয়ায় মানবজীবনে আন্তঃসম্পর্ক চর্চার বিষয়টি অপেক্ষাকৃত দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার ঘোর এতটাই প্রকট হয়ে যায় যে ‘সম্পর্ক’ বিষয়টি ফরমাল হয়ে দাঁড়ায়। দায় এড়ানো, দায়িত্বশীল না হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। আর একক পরিবারের মানসিকতার কারণেই সমাজে গড়ে উঠে ‘বৃদ্ধাশ্রম’। প্রায় মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা এই বৃদ্ধাশ্রমে বসবাসরত মা, বাবা, বড় ভাই, বড় বোন অর্থাত্ পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের দুঃখের কথা, বেদনার কথা শুনি। শুনি তাঁদের জীবনের পড়ন্ত বেলার আকুতি, ভালোবাসা না পাবার হাহাকার। যাঁদের দায়িত্ব নিতে পারেনি, নেবার চেষ্টা করেনি তাঁদের সন্তান বা পরিবারের অন্য কোন সদস্য। ‘বৃদ্ধাশ্রম’ গড়ে উঠাটা যেন সামাজিক, মানবিক মূল্যবোধহীন জীবনচর্চার কথাই বলে। ঘোর আপত্তি থাকা উচিত সমাজ বিশেষজ্ঞদের এ বিষয়ে। একটি পরিবারের কাঠামো যদি সঠিক মানবীয় শিক্ষা, দায়িত্ববোধে গড়ে না ওঠে, তাহলে সমাজের কাঠামোটাও ভঙ্গুর হয়ে যায়। কতগুলো পরিবার নিয়েই যদি একটি সমাজ তৈরি হয়, তাহলে তো ঐ পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভাব সমাজে গিয়ে পড়বে। সমাজ বিশেষজ্ঞদের এই বিষয়ে মনোনিবেশ জরুরী। পরিবারে যে বাবা, মা বা বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য জীবন গড়ে দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি উত্তরসূরীদের করণীয় দায়িত্ববোধ, দায়িত্ব পালন জরুরী, এই শিক্ষার বীজ সঠিকভাবে বপন করা উচিত সমাজের প্রতি রন্ধ্রে। বৃদ্ধাশ্রম নয়, প্রতি পরিবারই হবে আশ্রয় প্রতি বাবা, প্রতি মায়ের, প্রতি বয়োজ্যেষ্ঠের। অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা স্যারের অবরুদ্ধ জীবন যেন আরেক বৃদ্ধাশ্রম। দেখতে চাই না এমন আশ্রয়। স্যারের অবস্থা যেটুকু জানা গেল, তাতে মনে হল স্যারের পরিবেশ, নিসঙ্গতায় ছেয়ে আছে। মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজন প্রিয়সান্নিধ্য, সাহচর্য, যত্ন এবং আনন্দময় পরিবেশ। বয়সের সাথে সাথে স্মরণশক্তির বিলোপ ঘটে। স্মরণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা না করে, যেটুকুন মানসিক শক্তি আছে, তা দিয়ে তিনি যেন স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারেন, দিন অতিবাহিত করতে পারেন, তেমন একটি পরিবেশ, ব্যবস্থা তাঁর প্রয়োজন। স্মৃতিবিভ্রমের কি চিকিত্সা বার্ধক্যে, চিকিত্সাইবা কতটুকু কার্যকর হয়ে উঠবে সেই প্রশ্ন করে উত্তর না খুঁজে, যদি স্যারের যে মানসিক ও শারীরিক অবস্থা, তা যেন আপনজনের সঙ্গ ও সহমর্মিতায় ভরা থাকে সেই প্রত্যাশা আমাদের। স্যার এখনও যখন কোন বৃদ্ধাশ্রমে পৌঁছাননি, তখন ভেবে নেয়া যায় তাঁর পরিবার এখনও তাঁর প্রতি সহনশীল ও দায়িত্বশীল আছেন। কাজেই তাদের কাছে আবেদন, স্যারের জন্যে এমন ব্যবস্থা করা উচিত যাতে তিনি জীবনের বাকি দিনগুলো মুক্ত আকাশ দেখতে পান, দেখতে পান তাঁকে ঘিরে থাকা সুন্দর মানুষ। লেখক : কথাসাহিত্যিক ও উন্নয়নকর্মী