যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বৈশ্বিক বাসযোগ্যতার জরিপে ঢাকা এখন পৃথিবীর দ্বিতীয় ‘নিকৃষ্টতম’ নগর। এর নীচে অর্থাত্ সবচেয়ে নীচে আছে সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত দামেস্ক। আমার ধারণা, যে সমস্ত সূচক এই জরিপে নেয়া হয়েছে তার বাইরে আরো অনেক সূচক ধরার ছিল আর তা ধরলে ঢাকা চ্যাম্পিয়ন হতো, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তারা স্থায়িত্ব, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি, পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামোকে মানদণ্ড হিসেবে ধরেছে। যদি যাতায়াত বা নিরাপত্তা, বিদ্যুত্ সেবা ইত্যাদি সূচক ধরতো তাহলে আমাদের অবস্থান সবচেয়ে নিকৃষ্টতম হতে কোন বাধা থাকতো না। অথচ এই শহরটাকে নিয়ে আমাদের কত আশা, কত প্রেম, কত গৌরব, কত ঐতিহ্যের বড়াই।
মোঘলরা এই শহর নিয়ে কী রকম পরিকল্পনা করেছিল তার সবটা জানা যায় না। তবে ঢাকা শহর যে কখনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা করে এগোয়নি সেটা সবাই জানে। আর পরিকল্পনা করলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। অথচ তার পেটে প্রতিদিন অজস মানুষ ঢুকছে। খেটে খাওয়া মানুষ থেকে চাকরিজীবী, চোর-ডাকাত-মাস্তান, ফড়িয়া, ছিনতাইকারী, পকেটমার, মলম পার্টি অজস্র প্রকার মানুষ ঢুকে পড়ছে। কেউ বস্তিতে কেউ রেললাইনে কেউ পার্কে কেউ ফুটপাতে কেউ ঘন ঘিঞ্জি ফ্ল্যাটের বস্তিতে। কোন পরিকল্পনা ছাড়াই আবাসন গড়ে উঠেছে যত্রতত্র; রাস্তা ছাড়া পানির লাইন ছাড়া পয়:নিষ্কাশন ছাড়াই। কোথায় মানুষ বাসা বানাবে তার কোন ঠিক নেই, কোথায় কারখানা হবে তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই, কে কত তলা বানাবে তার কোন মাথামুণ্ডু নেই। মাটি পরীক্ষাও বোধহয় হয় না। একটা বড় ভবন আরেকটা ভবনের গায়ে হেলে পড়ছে, মানুষ নিরুপায় হয়ে বাস করছে কীটপতঙ্গের মতো। বাচ্চাদের শৈশব বলে কিছু নেই, খেলাধুলো নেই, খেলার মাঠ নেই, শুধু বাঁধা বানরের মতো স্কুলে কোচিং সেন্টারে নাচানাচি করছে।
যারা জরিপ করেছে তাদের বিরুদ্ধে হয়তো নগর কর্তৃপক্ষ গরম গরম বক্তৃতা দিয়ে বলবে, এই রিপোর্ট সম্পূর্ণ বানোয়াট, নির্জলা মিথ্যে। সরকারও বলতে পারে। কারণ তারা অনেক বছর ক্ষমতায় আছে, নগরকে দুই ভাগ করেছে, গোটাকতক ফ্লাইওভারও তৈরি করেছে। তবে কিছুই সুষ্ঠু পরিকল্পনামতো হচ্ছে না। বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটলে সবাই হৈ-চৈ করে, টক শোতে নগর পরিকল্পকরা মূল্যবান কথা বলে, কোন কাজ হয় না। পরিকল্পকদের কোন কথা কেউ ধরেই না। এশিয়ার অন্যতম পরিকল্পিত শহর নাকি চন্ডিগড়। সেটা পাঞ্জাব ও হরিয়ানার রাজধানী। সেখানে ২০১০ সালে সার্ক রাইটার্স কনফারেন্সে যোগ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কনভেনশন সেন্টারের গেটে একটি সাইনবোর্ড দেখে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে হিন্দি ও ইংরেজিতে মহাত্মা গান্ধীর একটি বাণী লেখা ছিল। তার বাংলা অর্থ হলো, নগর বলতে আমি শুধু ইট আর দালানকে বুঝি না, নগর আধুনিকতা আর প্রকৃতির যুগলবন্ধন, যেখানে মানুষ সুস্থভাবে আনন্দের সাথে বাস করবে সভ্যতা আর প্রকৃতির ক্রোড়ে। নীচে লেখা, গান্ধীজির স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই নগর তৈরি করা হয়েছে।
গান্ধীর স্বপ্ন কতটুক সেখানে বাস্তবায়িত হয়েছে জানি না, তবে তিন দিনে যা দেখেছিলাম তাতে মুগ্ধ হতে হয়। কোন বাঁকা রাস্তা নেই সেখানে, সব বাড়ি দোতলার উপরে নয়, চার লেনের রাস্তা, কেউ কাউকে ওভারটেক করছে না, কোন হর্ণের শব্দ নেই, খানিক পর পর ফাঁকা স্কয়ার, অজস পার্ক। এক রোজ গার্ডেন রয়েছে বিশাল এলাকা জুড়ে, আরো রয়েছে রক মিউজিয়াম যা অব্যবহূত যন্ত্রপাতি দিয়ে অজস গাছপালার সমাহারে তৈরি করা হয়েছে।
যে শহর দিন দিন বর্ধিত হচ্ছে সেই শহরের জন্য আমরা কী করতে পারি? এর প্রধান সমস্যা কী? আমার ধারণা, এর প্রধান সমস্যা মানুষ। দ্বিতীয় সমস্যা যানজট যা একে অপরের সাথে যুক্ত। প্রথমত, ঢাকামুখি মানুষের স্রোত কমাতে হবে, সেটা স্থায়ী বা অস্থায়ী যাই হোক না কেন। ঢাকাকেন্দ্রিক চাকরি ব্যবসায় কমানো প্রয়োজন। প্রতিটি সেক্টরের হেড অফিস ঢাকায় রাখার কোন প্রয়োজন নেই। রাজশাহীর রেশম বোর্ডের প্রধান অফিস নাকি ঢাকাতে, নৌ সদর দপ্তর ঢাকা না হয়ে চট্টগ্রাম হতে কোন বাধা নেই। শিক্ষা, বাণিজ্য, শিল্প, সংস্কৃতি এসবের অনেক ক্ষেত্র অন্য বড় শহরগুলোতে সহজে হতে পারে। সব চাকরির পরীক্ষা ঢাকায় রাখার কোন দরকার নেই। একটি আলাদা প্রশাসনিক নগরী করা খুব জরুরি। সেটা ঢাকার বাইরে গাজীপুর বা টাঙ্গাইলে হতে পারে। মালয়েশিয়াতে এরকম আছে। ঢাকায় না থেকে যাতে ঢাকায় অফিস করতে পারে সেদিকে নজর দিয়ে ঢাকার চারদিকে একশ-দেড়শ কি. মি. পর্যন্ত সহজ নিরাপদ সস্তা যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সেটা রেল ও নৌপথে করা ভালো। বাস ব্যবস্থা এক্ষত্রে মোটেও উপযোগী নয়। কারণ বাসে একদিন যাওয়া আসা করলে পরের দিনে তার পক্ষে অফিস করা সম্ভব হবে না। কোলকাতা ও দিল্লী শহরে দেখেছি, শত শত কি. মি. দূর থেকে মানুষ ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করে।
এই শহর নিয়ে আমার মতো যারা স্বপ্ন দেখতো তারা আজ বোধহয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে কোন কার্যকর পদক্ষেপ না দেখতে পেয়ে। বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে আমাদের ঢাকা শহর। সবরকম নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েও মানুষ বাধ্য হয়ে বাস করছে এখানে। সবচেয়ে কষ্ট পাচ্ছে মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীন মানুষেরা। বিদেশি অতিথিরা এসে কষ্ট পেয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করছে। ২০১২ সালে ঢাকায় আন্তর্জাতিক বেঙ্গল কনফারেন্সে যোগ দিতে এসে যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিশেষজ্ঞ আমাদের বলেছিলেন, বিমানবন্দর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে আমার প্রায় চার ঘন্টা লেগেছে, এত সময় আমি নষ্ট করতে পারবো না। তিনি রাগে সম্মেলনে যোগ না দিয়েই লন্ডনে ফিরে গিয়েছিলেন।
যে দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে সে দেশটা তার রাজধানীকে এভাবে অব্যবস্থাপনার মধ্যে রেখে কীভাবে এগোবে? সিংহভাগ নাগরিককে দুঃসহ অবস্থার মধ্যে রেখে কীভাবে সে শহর আলোর মুখ দেখবে? তবু আমরা আশাবাদী হতে চাই। কেউ হয়তো আসবেন দূত হিসেবে যে প্রতিজ্ঞা করবে নতুন উদ্দীপনা আর পরিকল্পনা নিয়ে। এবং কবি সুকান্তের সুরে বলবে, এ শহরকে এ শিশুর জন্য বাসযোগ্য করে যাবো আমি, তারপর হবো ইতিহাস।
লেখক: অধ্যাপক,ফোকলোর বিভাগ. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
