খবরে প্রকাশ, ঝালকাঠি জেলা এখন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড শূন্য। জেলায় চারজন সহকারী কমিশনার (ভূমি)’র পদ রহিয়াছে। কিন্তু তাহাদের একজনও না থাকায় চার উপজেলার বাসিন্দাদের জমিসংক্রান্ত বিষয়ে নানা দুর্ভোগ পোহাইতে হইতেছে। বিশেষত নামজারি মোকদ্দমার নিষ্পত্তি না হওয়ায় জমির ক্রেতা ও বিক্রেতাদের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করিয়াছে। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু ঝালকাঠি সদর উপজেলায় ৮০০ নামজারি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হইল, কাঁঠালিয়া উপজেলায় ১৯৯৮ সালের ১১ আগস্ট এবং রাজাপুরে ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বর হইতে এই পদটি খালি রহিয়াছে। এমতাবস্থায় ভূমিসংক্রান্ত জরুরি ও প্রয়োজনীয় কাজ চলিতেছে জোড়াতালি দিয়া বা দায়সারাভাবে। শুধু ঝালকাঠি নহে, সারাদেশেই আছে এসিল্যান্ড সংকট। এক্ষেত্রে সাধারণত ইউএনওগণ এসিল্যান্ডের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ততার কারণে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাগণ নামজারির ফাইলে যথাসময়ে স্বাক্ষর করিতে পারেন না। ফলে দিনের পর দিন ভূমি অফিসে ঘুরিতে হয় সাধারণ মানুষকে। ইহা হইতেই জন্ম নেয় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি। এভাবে আর কতদিন চলিবে সেই প্রশ্নই আজ বড় হইয়া দেখা দিয়াছে।
জানা যায়, সারা দেশে এসিল্যান্ড পদ রহিয়াছে ৪৮৩টি। তন্মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি শূন্য। প্রকৃতপক্ষে এসিল্যান্ড ইস্যুতে ভূমি মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের রশি টানাটানির কারণেও রাজস্ব সার্কেলগুলিতে প্রয়োজনমত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া যাইতেছে না। তাহাদের বদলি ও পদায়নে দীর্ঘদিন ধরিয়া এই দুই মন্ত্রণালয়ের মতবিরোধ চলিতেছে । ১৯৮৪ সালের আগে এসিল্যান্ড পদটি ছিল না। তখন রাজস্ব সার্কেলের প্রধান ছিলেন একজন নন-ক্যাডার রাজস্ব কর্মকর্তা। তাহারা সার্কেল অফিসার (রেভিনিউ) হিসাবে পরিচিত ছিলেন। উপজেলা পদ্ধতি চালু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে রাজস্ব সার্কেলে কাজের স্বচ্ছতা ও মানোন্নয়নের জন্য বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তাদের (সহকারী সচিব) সেখানে পদায়ন শুরু হয়। তখন রাজস্ব অফিসারের পদটি সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিলান্ড হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া সুদূরপ্রসারী ও যথাযথ ছিল না বিধায় দুই মন্ত্রণালয়ের বিরোধ যাইতেছে না। এখন রাজস্ব সার্কেল অফিস নিজেদের অধীনে বলিয়া তাহাতে কর্মরত এসিল্যান্ডদের নিয়ন্ত্রণ করিতে চায় ভূমি মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে এসিল্যান্ড পদটি যেহেতু সহকারী সচিবের (প্রশাসন), তাই তাহাদের প্রতি নিয়ন্ত্রণের দাবিদার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এই সমস্যার সমাধান না হইলে এসিল্যান্ড নিয়োগ গতিশীল হইবে না।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদটি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ। নামজারি-নামপত্তন, জমা খারিজসহ নানা কাজে মানুষ ভূমি অফিসের দ্বারস্থ হন। কিন্তু দীর্ঘদিন মূল কর্মকর্তা না থাকায় জনগণের দুর্দশার অন্ত নাই। ইহার কারণে যেমন নামজারির সংখ্যা কমিয়া যাইতেছে, তেমনি উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলিতে দলিল সম্পাদনের হারও কমিয়া যাইতেছে। ইহাতে সরকার রাজস্ব হইতে বঞ্চিত হইতেছে। অভিযোগ আছে যে, ইউএনওগণ বাড়তি দায়িত্ব মনোযোগ সহকারে করেন না। ভূমি ও রাজস্ব সংক্রান্ত কাজটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ বলিয়া একজনের পক্ষে দুই কাজ সুচারুভাবে করা সম্ভবও নহে। তাহাছাড়া ইউএনওগণ ইহার জন্য কোন ভাতা পান না বলিয়া জানা যায়। এই প্রেক্ষিতে ২৮তম বিসিএস ব্যাচ হইতে (যেহেতু ২৭তম ব্যাচের অধিকাংশ কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠতা লাভ করিয়াছেন) দ্রুত পদায়ন দেওয়ার মাধ্যমে এই সংকট কিছুটা হইলেও সামাল দেওয়া যায়। আবার ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে শত শত নন-ক্যাডার প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা আছেন। তাহাদেরকেও আপাতত ভারপ্রাপ্ত এসিল্যান্ড হিসাবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যাইতে পারে। তবে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করিতে হইলে এবং জট খুলিতে হইলে বিসিএস পরীক্ষায় পৃথকভাবে ল্যান্ড ক্যাডার সৃষ্টির কোন বিকল্প নাই। আমরা এ ব্যাপারে পিএসসিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশু দৃষ্টি আকর্ষণ করি।
