কয়েক দশক পূর্বেও বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ছিল প্রাথমিক পর্যায়ে। অতঃপর সময় যত গড়াইয়াছে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং উত্কর্ষ সাধিত হইয়াছে জ্যামিতিক হারে। ফলে সারা বিশ্বেই মানুষের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আসিয়াছে আমূল পরিবর্তন। এই ইতিবাচক ও উন্নয়নমুখী পরিবর্তন আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, যোগাযোগ, চিকিত্সাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের। আর্থিকভাবে পিছাইয়া পড়া অনেক জনগোষ্ঠীও এখন এই পরিবর্তনের অংশীদার। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রযুক্তিক্ষেত্রে এমনই এক বৈপ্লবিক সময় পার করিতেছে। অতীতের অনেক কল্পনাই এদেশের মানুষের কাছে এখন বাস্তবরূপ লাভ করিয়াছে।
‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ নামে যে ধারণাটি এক সময় এদেশের মানুষের কাছে অস্পষ্ট ও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন ছিল, কয়েক বত্সরের ব্যবধানে এখন তাহার সপর্শ লাগিয়াছে নিভৃত পল্লী কিংবা নেহায়েত দরিদ্র মানুষটির জীবনেও। এদেশের লক্ষ বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও তথ্যপ্রযুক্তি যে ব্যাপক ভূমিকা রাখিতে পারে তাহার স্বাক্ষর অনেক আগেই রাখিয়াছে এই খাতটির উদ্যোক্তারা। গত কয়েক বত্সরে ফ্রিল্যান্সিং, ভয়েস আউটসোর্সিং বা এদেশেরই তরুণদের দ্বারা উদ্ভাবিত সফটওয়্যার রপ্তানির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হইয়াছে—তাহা চমকাইয়া দেওয়ার মতো। অধিক আশার কথা হইল—অর্জিত অর্থের এই পরিমাণকে কয়েক কিংবা কয়েকশত গুণ বৃদ্ধি করিবারও সুযোগ রহিয়াছে। তবে এই সুযোগকে কাজে লাগাইতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। এই খাতে আগ্রহীদের বিনিয়োগের জন্য প্রাথমিক অর্থ যোগান, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দেশি-বিদেশি বাজার সৃষ্টিতে যে সহায়তা প্রয়োজন—তাহা নিশ্চিত করিতে হইবে। ‘আমরা কীভাবে সিলিকন বাংলাদেশ গড়তে পারি এবং এটি কীভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে সাহায্য করতে পারে’—শিরোনামে গত শনিবার দৈনিক ইত্তেফাক আয়োজিত প্রযুক্তিবিষয়ক এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞগণ প্রযুক্তিখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আগ্রহী তরুণ ও মেধাবীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা প্রদানের পক্ষে মত দিয়াছেন। প্রকৃতপক্ষে এই সহযোগিতা ভিন্ন আমরা বাংলাদেশকে প্রযুক্তিভিত্তিক দেশ হিসাবে গড়িয়া তুলিতে বিবিধ প্রতিবন্ধকতার শিকার হইব। সিলিকন বাংলাদেশের ধারণাটি মূলত একটি পদক্ষেপ-বিশেষ—যেখানে প্রযুক্তিখাতের উদ্যোক্তা, দক্ষ জনশক্তি এবং প্রয়োজনীয় পুঁজির আনুষ্ঠানিক সঠিক সংযোগ ও সুষ্ঠু সমন্বয় ঘটে। ডিজিটাল বা প্রযুক্তিভিত্তিক বাংলাদেশ গড়িয়া তুলিবার ক্ষেত্রে ‘সিলিকন বাংলাদেশ’ ধারণাটি বাস্তবায়নের বিকল্প নাই।
বিচ্ছিন্নভাবে ছড়াইয়া থাকা বিভিন্ন সৃজনশীল ধারণা এবং মেধার সমন্বয় সম্ভব না হইলে প্রযুক্তি খাতের লক্ষ্য অর্জিত হওয়া কঠিন। এই খাতে প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান এবং কতক ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তির অভাবে মাঝপথে অনেক উদ্যোগই থামিয়া যাইবার দৃষ্টান্ত রহিয়াছে। বিনিয়োগকারীদের যথাযথ সহযোগিতা ও দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি এবং ইহার প্রতি সযত্নদৃষ্টি রাখা হইলে এই খাতে আরও উন্নয়ন সম্ভব। দেশের চাহিদা মিটাইয়া দক্ষ জনশক্তিকে বিদেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করিতে পারিলে তাহা আমাদের অর্থনীতির ক্ষেত্রে নূতন দ্বার উন্মোচন করিবে নিঃসন্দেহ। তরুণদের জন্য কার্যকর সহযোগিতার যেমন প্রয়োজন রহিয়াছে তেমনি তরুণদেরও দায়িত্ব রহিয়াছে প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার এবং সামর্থ্যের পরিপূর্ণ প্রয়োগ নিশ্চিত করিবার। হাজারও নূতন উদ্ভাবনের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রযুক্তিক্ষেত্রে এক নূতন যুগে প্রবেশ করুক—এমনটিই প্রত্যাশা।
