হত্যাকাণ্ডের পর সাজানো হয়েছিল সমকামিতার নাটক। আবার সেই সমকামিতার অভিযোগে আটক করা হয় এক শিশুকে। আদায় করা হয় জবানবন্দি। আবার ভিকটিমের পরিবার ৮ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করতে গেলেও সেই এজাহার ছিঁড়ে ফেলেন খোদ পুঠিয়া থানার তৎকালীন ওসি সাকিল উদ্দিন আহমদ।
বাদীর অজ্ঞাতে সৃজন করেন আরেকটি এজাহার। পরবর্তীকালে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্তে এজাহার ছিঁড়ে ফেলা ও নতুন করে এজাহার সৃজনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এরপরই হাইকোর্ট রাজশাহী জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম হত্যা মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন্সকে (পিবিআই)। সেই তদন্তে বাদীর এজাহারভুক্ত এক আসামিকে সাক্ষীর তালিকায় রাখা হয়েছে। শুধু হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামিই নয়, সাক্ষীর তালিকায় রয়েছেন ওসি সাকিলসহ আরো দুই জন। এদিকে মামলার বাদী নিগার সুলতানার অভিযোগ, তদন্ত কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে আসামিকে সাক্ষী করেছেন। যাতে আমি আমার পিতার হত্যার বিচার না পাই।
উচ্চ আদালতের আদেশের পর মামলাটির তদন্ত করেন পিবিআইয়ের রাজশাহী জেলার পরিদর্শক মো. শামীম আকতার। কিন্তু তিনি হাইকোর্টের রায়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করেই এই মামলার তদন্ত সম্পন্ন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগের বিষয়ে হাইকোর্টের জিজ্ঞাসার জবাবে কোন সুদত্তর দিতে পারেননি তিনি। হাইকোর্ট তদন্ত কর্মকর্তার উদ্দেশে বলেছেন, উচ্চ আদালতের রায়টি ছিল বাংলা ভাষায় লিখিত। এ রায় তদন্ত কর্মকর্তার না বোঝার কোন কারণ নাই। ঐ রায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্ত না করায় আদালতের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে উনি। আদালত বলে, তদন্ত কর্মকর্তা এমনভাবে তদন্ত করেছেন তাতে আসামির স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে বাদীর ক্ষতির করেছেন। এমতাবস্থায় হাইকোর্টে ক্ষমা চেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। ক্ষমার আবেদনে তিনি বলেন, আমি ভুল করেছি। নতুন করে সুযোগ দেওয়া হলে মামলাটির অধিকতর তদন্ত করে ঘটনার আদ্যপান্ত বের করা হবে। এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মিজানুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে হাইকোর্টে রুল শুনানি হয়েছে। শুনানিতে তদন্ত কর্মকর্তা তার কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। আগামী ৩ এপ্রিল রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য রেখেছে হাইকোর্ট।
এদিকে তদন্ত কর্মকর্তার তদন্ত নিয়ে হাইকোর্টে আপত্তি তুলেছেন নিহত নুরুল ইসলামের মেয়ে নিগার সুলতানার আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. আবু বকর সিদ্দিক রাজন। তিনি আদালতে বাদীর মূল এজাহার, পিবিআইয়ের চার্জশিট তুলে ধরে বলেছেন, মূল এজাহারের ৪ নম্বর আসামি মো. গোলাম ফারুক ও এজাহার ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ যার বিরুদ্ধে সেই ওসি সাকিল উদ্দিন আহমদকে সাক্ষী করা হয়েছে চার্জশিটে। এছাড়া শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহকারী জজ আদালতে করা দেওয়ানি মামলার বিবাদীদের মধ্য থেকে দুই জন মো. কাজী সাঈদ হোসেন দুলাল ও শাহরিয়ার কনককে সাক্ষীর তালিকায় রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এই কাজটি করেছেন। যাতে মামলাটি প্রমাণিত না হয়।’
এ প্রসঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তা মো. শামীম আকতার বলেন, ‘এ বিষয়ে হাইকোর্টে মামলা বিচারাধীন। আমি কোন মন্তব্য করতে পারব না।’
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় যদি এভাবে সাক্ষীর তালিকা প্রস্তুত করা হয় তাহলে ভিকটিমের বিচার পাওয়া পথ রুদ্ধ হয়। এজাহারভুক্ত আসামিকে সাক্ষী করা হলে বিচারের রায় কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
প্রসঙ্গত, রাজশাহীর পুঠিয়ার সড়ক ও পরিবহন মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি ছিলেন নুরুল ইসলাম। নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বিরা ২০১৯ সালের ১০ জুন তাকে হত্যা করে। এ ঘটনায় নিহতের মেয়ে নিগার সুলতানা মামলা করতে গেলে সেই এজাহার লিপিবদ্ধ না করে পুঠিয়া থানার তত্কালীন ওসি সাকিল উদ্দিন আহমেদ তা ছিঁড়ে ফেলেন। পরে সাদা কাগজে বাদীর সই রেখে নিজেরাই পরদিন একটা এজহার সৃজন করে তা থানায় লিপিবদ্ধ করেন। পরে বাদী থানায় গিয়ে দেখতে পান যে, ঐ এজাহারে কোন আসামির নাম নেই। এমনকি তিনি যে বক্তব্য এজাহারে উল্লেখ করেছিলেন তাও পরিবর্তন করা হয়েছে। পরে এ নিয়ে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি। ঐ রিটের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের দ্বৈত বেঞ্চ এজাহার পরিবর্তনের অভিযোগ তদন্তের জন্য রাজশাহীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দেয়।
অভিযুক্ত ওসি সাকিল এখন দুদকের মামলায় কারাগারে
বিচার বিভাগীয় তদন্তে বলা হয়, বাদীর এজাহার গ্রহণ না করে কারসাজিমূলকভাবে এজাহার দায়েরের ক্ষেত্রে ওসি সাকিলের সন্দেহজনক ভূমিকা রয়েছে। এই তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, ওসি সাকিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিঃসন্দেহে গুরুতর। যা দণ্ডবিধির ১৬৬ ও ১৬৭ ধারা অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেজন্য সাকিলের বিরদ্ধে দুদক আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হলো। এরপরই তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। ঐ মামলায় তিনি এখন কারাগারে।
তদন্ত নিয়ে হাইকোর্টের অসন্তোষ
তদন্ত চলাকালীন সময়ে কেস ডকেটসহ শামীম আক্তারকে গত বছরের এপ্রিলে তলব করেছিল হাইকোর্ট। কিন্তু তিনি আদালতে হাজির না হয়ে ৪২ দিনের মাথায় চার্জশিট জমা দিয়ে দেন। চার্জশিটভুক্ত আসামি মো. আবুল কালাম ওরফে আবু হাইকোর্টে জামিন চান। ঐ জামিন আবেদনের শুনানিকালে বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. সেলিমের দ্বৈত বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করেন। এরপরই তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করে। ঐ রুলের শুনানিতে তদন্েতর নানা অসংগতি উঠে আসে। তখন হাইকোর্ট তদন্ত কর্মকতার্র উদ্দেশে বলেন, এই দেশ ৩০ লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে। যা ইচ্ছে তাই করবেন সেটা মেনে নেওয়া যায় না।
প্রসঙ্গত, চার্জশিটে পুঠিয়া মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল রহমান পটলসহ চার জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এতে বলা হয়, পুঠিয়া মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বের কর্তৃত্ব নিজেদের হাতের মুঠোয় রাখতেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেন আসামিরা। আর যে শিশুর সঙ্গে সমকামিতার অভিযোগ করা হয়েছিল তাকেও এই মামলায় অভিযুক্ত করে পৃথক দোষীপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়েছে। ঐ শিশুর বিরুদ্ধে চার্জশিটে বলা হয়েছে, সে নুরুল ইসলামের গতিবিধি অন্য আসামিদের অবগত করেছে। ইটভাটায় ডেকে নিয়ে প্রথমে ইট দিয়ে নুরুল ইসলামের মাথায় আঘাত করে ঐ শিশু। আর এজাহারভুক্ত অপর আসামি মো. নুরুল আমিন, মো. মিঠু ওরফে গুন্ডা মিঠু, মো. আব্দুর রশিদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কোন সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
