স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতীয় পার্টি-জেপির আলোচনাসভা

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২২, ১২:৪৮

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ বুকে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করে ভবিষ্যতেও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে পরাজিত করতে হবে। এর মাধ্যমে আরেক ধাপ সামনে এগিয়ে নিতে হবে বাংলাদেশকে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও ৫২তম মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে গতকাল রবিবার (২৭ মার্চ) জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় পার্টি-জেপি আয়োজিত ‘সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের’ শীর্ষক আলোচনাসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

শাজাহান খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, বিএনপি বলছে তারা জাতীয় ঐক্য চায়। কার সঙ্গে ঐক্য? এর ভিত্তি কী? স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার-আলবদর-আলশামস, যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছিল এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করেছিল; তাদের সঙ্গে ঐক্য! বিএনপিকে বলব, আপনারা তাদের নিয়ে থাকুন। ২০০৪ সালে জামায়াতের রোকন সম্মেলনে তারেক জিয়া বলেছিল, জামায়াত ও বিএনপি এক পরিবার। বিএনপি আসলে সূত্র জানে না, তাই অঙ্ক মেলাতে পারছে না। বীজগণিতের মতো রাজনীতিতেও সূত্র লাগে।

বিএনপির উদ্দেশে আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, আপনারা স্বাধীনতার পরাজিত শক্তিকে নিয়ে রাজনীতি করতে চান, করুন। জামায়াত ও আপনারা এক সূত্রে গাঁথা। এজন্যই পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে। বিএনপি বলেছিল নির্বাচনে যাবে না, তারা নির্বাচনে গেছে। বলেছিল শপথও নেবে না, সংসদেও যাবে না। তারা শপথ নিয়েছে, সংসদেও গিয়েছে।

তিনি বলেন, রাজাকার-আলবদর যাদের বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন, জিয়া-মোশতাকরা তাদের মুক্ত করে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করে। অথচ সেই বিএনপি দাবি করে তারা নাকি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল, জিয়াউর রহমান নাকি স্বাধীনতার ঘোষক। ইতিহাস কখনো বিকৃত করা যায় না। ইতিহাস থেকে কাউকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা যায় না। বরং দেশের মানুষের হৃদয়ে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান আরো সুদৃঢ় হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে যারা ভেবেছিল তার আদর্শ মুছে ফেলবে, তাদের সেই অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে শাজাহান খান বলেন, এই জয়বাংলা স্লোগানে দেশ স্বাধীন হয়েছে। ইতিহাস মুছে ফেলা যাবে না। মহানবি (স.) যখন মক্কা বিজয় করেছিলেন, তখন তিনিও বলেছিলেন, ‘ফাতেহ মক্কা’। আরবি ‘ফাতেহ’ শব্দের অর্থ ‘জয়’। তাহলে মহানবি (স.) যদি ‘জয় মক্কা’ বলতে পারেন, আমরা তার উম্মত হিসেবে কেন ‘জয় বাংলা’ বলতে পারব না? নৌপরিবহন মন্ত্রী থাকাবস্থায় নিজ মন্ত্রণালয়ের সচিবের নাম উল্লেখ করে শাজাহান খান বলেন, ‘অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার পরেও তার গড়িমসি ও ধানাই-পানাইয়ের কারণে মুক্তিযুদ্ধের বেশ কয়েকটি স্মৃতি সংরক্ষণের কাজ শেষ করতে পারিনি।’ তিনি বলেন, আসলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক না হলে এবং চেতনা না থাকলে এভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে বিসর্জন দিতে হয়।

অপ্রয়োজনে কেউ কারো ভার বহন করে না: আনোয়ার হোসেন মঞ্জু

আলোচনাসভায় সভাপতিত্বকারী ও জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ১৪ দল করা হয়েছে, ঠিক আছে; কিন্তু আমাকে নিতেই হবে, প্রয়োজন না থাকলেও নিতে হবে—এমন হীনম্মন্যতায় আমি ভুগি না। অপ্রয়োজনে কেউ কারো ভার বহন করে না। তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ১৪ দলের একটা মিটিং হয়েছিল। কোন দল কয়টা আসন নেবে—এ নিয়ে অনেকে কথা বললেন। আমি সেদিন বলেছিলাম, নির্বাচনে আসন নেওয়া বিষয় নয়, লক্ষ্য হলো জয়লাভ করা। আসন ভাগাভাগি করতে গিয়ে যদি হেরে যায়, সেটা ঐক্য হয় না। এই সেদিনও গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ১৪ দলের বৈঠকে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার জন্য অনেকে অনেক কথা বললেন। আমি বলেছি, সবাই যার যার এলাকায় প্রতিরোধ করুন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা কথায় কথায় বলি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এবং রাজাকারদের সঙ্গে আপস হবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোনো কোনো দলের কমিটিতেও রাজাকার রয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে আমাদের রাজনীতি, চিন্তাধারা ও আদর্শের মিল নেই। নতুন প্রজন্ম এটা জানে না। স্বাধীনতার এই ৫১ বছরে নতুন প্রজন্মের চিন্তা-চেতনাকেও ধারণ করতে হবে।’ আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ‘এই অনুষ্ঠানে আসার সময় রাস্তায় এত জ্যাম দেখলাম। এতে প্রমাণিত হয়, দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরছে।’

অপ্রস্তুত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ হয়নি: অজয় দাসগুপ্ত

আলোচনাসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক-গবেষক অজয় দাসগুপ্ত বলেন, ‘যারা বলেন অপ্রস্ত্তত অবস্হায় মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, এটা আমি মানি না। বঙ্গবন্ধু কথায়-কথায় বলেননি যে, ‘সাত কোটি বাঙালিকে দাবায়ে রাখতে পারবা না’। বঙ্গবন্ধু সেইভাবে মানুষকে প্রস্ত্তত করেছিলেন। ’৭১-এর ৩ মার্চ যখন বলা হলো সংসদ বসবে না, এই একটি ঘোষণার যে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, ঢাকায় কত মিছিল-সমাবেশ, ব্যারিকেড হয়েছিল, এটা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা নেই।’

তিনি বলেন, তিন সপ্তাহের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের শপথ হয়েছিল। মাত্র দুই মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হয়েছিল, তা-ও নিজস্ব শিল্পী ও কলাকুশলী নিয়ে। অজয় দাস বলেন, বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের সারিতে যেতে হলে অনেক শৃঙ্খলা লাগবে। বাংলাদেশের যেসব মেধা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছে, তাদের ফিরিয়ে এনে দেশের কাজে লাগাতে হবে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে: শেখ শহীদ

জেপির সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী চতুর্থ শিল্পবিপ্লব আসছে। এই বিপ্লব তথ্যপ্রযুক্তির ও বিজ্ঞানের। এই বিপ্লবে যদি আমরা যথাযথভাবে অংশ নিতে না পারি, তাহলে উন্নত দেশ করতে পারব না। এই শিল্পবিপ্লবের জন্য আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞাননির্ভর মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতা দূর করতে হলে শিল্পবিপ্লবের বিকল্প নেই। বাজেটের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। মানুষে-মানুষে বৈষম্য চলবে না। অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কীভাবে সংগ্রাম করতে হয়, বঙ্গবন্ধু সেটি আমাদের শিখিয়েছেন।’

শেখ শহীদ বলেন, ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের ঐক্য করেছি দুর্নীতি দূর করার জন্য, লুটতরাজের জন্য নয়, বেগমপাড়া কিংবা সেকেন্ড হোম করার জন্য নয়।’ তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫০ বছরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন বিস্ময়কর। অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি সূচকে আমরা এই অঞ্চলের অনেকের চেয়ে এগিয়ে। আমাদের জিডিপি, মাধাপিছু আয় ও গড় আয়ু অনেকের চেয়ে বেশি।’

জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাদেক সিদ্দিকী বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির মধ্যে দূরত্ব কিংবা ফাটল দেখা দিলে সেটির সুবিধা নেবে বিপক্ষ শক্তি। তাই আমাদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। জেপির প্রেসিডিয়াম সদস্য এ এইচ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, উন্নয়নের পাশাপাশি দুর্নীতি রোধের দিকে জোর দিতে হবে। প্রেসিডিয়াম সদস্য এজাজ আহমেদ মুক্তা বলেন, ১৪ দলের ঐক্যকে সুদৃঢ় করতে হবে। পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক এমপি রুহুল আমিন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে একত্রে নির্বাচনের মাধ্যমে স্বাধীনতার পরাজিত শক্তিকে আবারও পরাজিত করতে হবে। জেপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান খলিল, সহসাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান ও জাতীয় যুব সংহতির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ আলম আলোচনাসভায় বক্তব্য রাখেন। পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আবু সাঈদ খান, ওসমান গনি ও মীর মোশারফ হোসেন মিরন, ভাইস চেয়ারম্যান মোহম্মদ হোসেন রেণু, হাজি আব্দুল আলী ও আফজাল হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দপ্তর সম্পাদক এম সালাহ উদ্দিন আহমেদ, পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক নুরুল ইসলাম খান, যুগ্ম দপ্তর সম্পাদক জীবন কৃষ্ণ বৈরাগী প্রমুখ অনুষ্ঠানে উপস্হিত ছিলেন।

ইত্তেফাক/ ইআ