তিনি বেঁচে থাকলে আজ চুয়াত্তর বছর পূর্ণ হতো। ১৯৪৮ সালের ২ এপ্রিল তিনি সিরাজগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। (পিতা জাতীয় নেতা শহিদ এম মনসুর আলী, মা বেগম আমিনা মনসুর)। ২০২০ সালের ১৩ জুন ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে আমাদেরকে ছেড়ে চলে যান। আমি বলছি, মোহাম্মদ নাসিমের কথা। তিনি আমার স্বামী। আমার জীবনের আলো। যদি মানুষের সাত বার জন্ম নেওয়ার সুযোগ থাকে, আমি ততবার তারই প্রতীক্ষায় থাকব। আমাদের বিয়ের আগেই তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘বিথী, সংসার তোমার আর রাজনীতি আমার।’ তিনি আমাকে যেমন ভালোবাসতেন, বিশ্বাস করতেন, সম্মান করতেন, তেমনি স্বাধীনতাও দিয়েছেন। আমিও তার বিশ্বাস ও ভালোবাসার মূল্য দিতে চেষ্টা করেছি। তিনি যাতে নির্বিঘ্নে রাজনীতি করতে পারেন, এজন্য আমি কখনো তাকে সংসারের দায়ভার গ্রহণ করতে দিইনি। আমি নিজে চাকরি করেছি, সংসার সামলেছি, সন্তানদের মানুষ করেছি।
আমি ও নাসিম ছোটবেলায় পাবনায় একই স্কুলে পড়াশোনা করেছি। আমাদের স্কুলের নাম ছিল ‘মহিমচন্দ্র জুবিলী হাইস্কুল’। নাসিম অসম্ভব ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের ছিলেন। খুব ভালো ক্রিকেট খেলতেন। পাবনা শহরে ওনারা ‘নিউ লাইট ক্লাব’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ক্লাবের বার্ষিক নাটকে নায়কের ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় করতেন। ১৯৬৭ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে মোহাম্মদ নাসিম ছাত্রলীগ থেকে ‘সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক’ পদে নির্বাচিত হন বিপুল ভোটে। তখন তিনি লেখালেখি করতেন। খুব ভালো সাহিত্যচর্চা করতেন , যা রাজনীতির কারণে পরবর্তীকালে ধরে রাখতে পারেননি।
আমাদের বিয়ে হয়েছিল ১৯৭৩ সালের ১৫ জুলাই। মনে পড়ে ১৯৭৮ সালে রাজনীতির পাশাপাশি আইন পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। পরীক্ষার দিন সকালে গণবাহিনী দলীয় এক কর্মীকে খুন করে। নাসিম পরীক্ষার হলে না গিয়ে সরাসরি কর্মীর বাড়িতে ছুটে যান এবং তার সত্কারসহ অন্যান্য সব ব্যবস্থা করেন। সে সময় ওনার আর পরীক্ষা দেওয়া হলো না।
আমাদের তিন সন্তান। বড় ছেলে পড়াশোনা শেষ করে, বাবার অসুস্থতার সময় রাজনীতিতে প্রবেশ করে বাবার হাত ধরেই। এখন সে দ্বিতীয় বারের সংসদ সদস্য। মেজো ছেলে ইকোনমিকসে পিএইচডি শেষ করল। ছোট ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করছে। হাসি আনন্দ দুঃখ সবকিছু ওনাকে ঘিরেই ছিল। হঠাৎ করোনা নামক এক কালো হাওয়া আমাদের জীবনের শেষ আলো নিভিয়ে দিল, আমরা দিশেহারা, অভিভাবকশূন্য হয়ে গেলাম। আমরা পরিবারের সবাই মোহাম্মদ নাসিম ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে যথাসাধ্য চেষ্টা করছি ওনার স্মৃতি রক্ষার সেবামূলক কাজ করতে।
মোহাম্মদ নাসিম ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ১৯৫৬ সালে পাবনা জুবিলী হাইস্কুল থেকে এসএসসি (ম্যাট্রিক) পাশ করেন। ১৯৬৭ সালে এডওয়ার্ড কলেজে উচ্চমাধ্যমিক ছাত্র থাকা অবস্থায় ভুট্টা আন্দোলনে পিতা এম মনসুর আলীর সঙ্গে কারারুদ্ধ হন। তিনি কারাগার থেকেই আইএ পরীক্ষা দেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। সেই সময় ছাত্ররাজনীতি করার অপরাধে মোহাম্মদ নাসিমকে এডওয়ার্ড কলেজ থেকে টিসি দেওয়া হয়। তিনি ঢাকায় এসে তত্কালীন জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। স্বাধীনতার আগে পাবনা শহরে পূর্ব বাংলা ছাত্র ইউনিয়নের প্রচণ্ড দাপট ছিল এবং নকশালপন্থিরা বিভিন্ন জায়গায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাত। নকশাল সন্ত্রাসী দ্বারা হামলার শিকার একজন আহত ছাত্রলীগ কর্মীকে দেখতে মোহাম্মদ নাসিম পাবনার একটা হাসপাতালে গিয়েছিলেন। আর সেই হাসপাতালের বারান্দাতেই তাকে হামলা করা হয়। তাকে এতটাই আঘাত করা হয়েছিল যে, তিনি বেঁচে ফিরে আসবেন বলে কারো বিশ্বাস ছিল না। এমন সংবাদ জানতে পেরে বঙ্গবন্ধু নিজে মোহাম্মদ নাসিমের চিকিত্সার তত্ত্বাবধান করেন। হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় আনা হয়। উন্নত চিকিৎসা শেষে মোহাম্মদ নাসিম নবজীবন লাভ করেন।
এরপর ১৯৬৯ সালের গণ-অন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি কলকাতা অবস্থানকালে সীমান্তবর্তী যুবক্যাম্প এবং শরণার্থী শিবির পরিচালনার দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করেন।
স্বাধীনতার পরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন । ১৯৭৫ সালে পাবনা জেলা গভর্নর নিযুক্ত হন।
মোহাম্মদ নাসিম জীবনে কখনো বাবা-মায়ের অবাধ্য হননি, বাবা-মাকে অসম্মান করেননি। পিতা জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহিদ এম মনসুর আলীর পদাঙ্ক অনুসরণ করেই তিনি পথ চলতেন। তিনি বিরোধী দলে থাকাকালীন পর্যায়ক্রমে জাতীয় সংসদের হুইপ ও চিফ হুইপ ছিলেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ভোটে বিজয়ী হওয়ার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের ডাক-তার ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন সফলভাবে। ২০১৪ সাল থেকে পাঁচ বছর স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি আমৃত্যু ছিলেন খাদ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মতো এত বৃহৎ রাজনৈতিক দলের পর্যায়ক্রমে ছিলেন—যুব সম্পাদক, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক এবং প্রায় দীর্ঘ ৯ বছর ছিলেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য।
তিনি ছিলেন জনবান্ধব, জনদরদি একজন রাজনীতিবিদ। তার নির্বাচনি এলাকা সিরাজগঞ্জ-১, বিশেষ করে কাজীপুর উপজেলাটি নদীভাঙন-কবলিত অঞ্চল। ১৯৮৬ সাল থেকে ২০২০ সাল তার মৃত্যু অবধি তিনি ঐ অঞ্চলে ছয় বার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। প্রতি বছর নদীগর্ভে শত শত একর জমি বিলীন হয়ে যেত, তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নদীভাঙন থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য স্থায়ী বাঁধের ব্যবস্থা করা হয়। কাজীপুর জুড়ে এখন নদীর পাড় দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। তার সমস্ত নির্বাচনি এলাকায় তিনি মানুষের কল্যাণে বহু স্কুল কলেজ হাসপাতালসহ কত ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তিনি হাজার হাজার বেকারকে চাকরিসহ নানা ধরনের কর্মসংস্থান করে দিয়েছেন। মানুষকে ভালোবাসতেন অন্তর দিয়ে। মানুষও তাকে ভালোবাসত। একবারের একটি ঘটনা এখনো মনে পড়ে, এক রাতে বর্ষায় সদ্য সংস্কার করা একটা বাঁধ দিয়ে চুইয়ে পানি ভেতরের জনপদে প্রবেশ করছিল। তিনি খবরটা শুনে খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। যে মানুষটিকে আমি জীবনে কখনো কাঁদতে দেখিনি, সেই মানুষটি মাঝরাতে জায়নামাজে বসে অঝোরে কাঁদছিলেন আর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলেন—‘হে আল্লাহ বাঁধটি যেন না ভাঙে, আমার অসহায় মানুষগুলো যেন ভিটেমাটি শূন্য না হয়।’
এই মানুষটির স্ত্রী হতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করি। কখনো ভাবিনি, তিনি এত তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন! বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি ছিল তার সীমাহীন বিশ্বাস, সম্মান ও মমত্ববোধ। প্রতি রাতে ঘুমোবার আগে বলতেন, ‘আমি আমাকে নিয়ে চিন্তা করি না, চিন্তা করি নেত্রীকে নিয়ে। চারপাশে ষড়যন্ত্রের জাল। তিনি বাঁচলে দেশ বাঁচবে। আমরা বাঁচব।’
মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি—হে করুণাময়, তাকে জান্নাতবাসী করুন,আমিন।
লেখক: আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিমের সহধর্মিণী ও চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি ও গভর্নিং বডি, শহীদ মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।
