সমাজ বিনির্মাণে তারুণ্যের দায়বদ্ধতা

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২২, ০৯:০২

আমাদের বর্তমান সমাজ অন্ধকারে আবৃত, বিকৃত চিন্তাভাবনা আর লোভী মানুষে জর্জরিত। ফলাফল, উচ্ছন্নে যাচ্ছে সমাজ সেই সঙ্গে আমরা ধাবিত হচ্ছি অনালোকিত ও অনিশ্চিত আগামীর পথে। সমাজের বর্তমান অবস্হার দিকে তাকালে দেখা যায় কোথাও নৈতিকতার বালাই নেই। হিংসা, বিদ্বেষ, ক্রোধ, পারস্পরিক দ্বন্দ্বের মাঝখানে অসহায় হয়ে পড়ে আছে আমাদের সমাজ। যেন কোথাও কেউ নেই, সুশীল সমাজ বইয়ের পাতায় থাকা রূপকথার রাজ্যের মতো। আমাদের বর্তমানে সমাজে ভালো কিছুর অনুপ্রেরণা খুঁজে পাওয়া খুবই দুরূহ। আমরা এখন এমন একটি সমাজে বসবাস করছি, যেখানে নেতিবাচক চিন্তার মানুষের ছড়াছড়ি। সুতরাং সেখানে ভালো কিছুর চিন্তার করাটা অলীক!

তবু কিছু মানুষ স্বপ্ন দেখে। ইতিবাচক স্বপ্ন! যেখানে বইয়ের পাতার রূপকথার গল্পকে বাস্তবায়িত করার জন্য নিজের সামর্থ্য দিয়ে কাজ করে। আর সে তালিকায় তারুণ্যের সংখ্যাটাই বেশি। একটি সমাজ সংস্কারে তরুণদের গুরুত্ব কোনো মাপকাঠি দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। আমাদের অতীত ইতিহাস দেখলে তা খুব সহজেই অনুধাবন করা যায়। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন কিংবা ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ’, আমাদের দেশের স্বাধীনতার প্রতিটি পরতে পরতে ছিল তারুণ্যের ত্যাগ ও কঠোর সংগ্রাম।

আমাদের এখন সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তার জন্য আমাদের তরুণ সমাজকে জাগ্রত হতে হবে। রাজনীতিতে তারুণ্যের লেজুড়বৃত্তি আমাদের জন্য অন্যতম বড় অভিশাপ। অসত্ ও অযোগ্য নেতার পদতলে থেকে মেধাবী তরুণ তার চিন্তাভাবনাকে সম্প্রসারিত করতে পারছে না। ফলে দিন দিন তরুণ কাঠের পুতুল হয়ে উঠছে। নৈতিকতার চরম অবক্ষয়, দুর্নীতির করাল গ্রাসে তারুণ্য খেই হারিয়ে ফেলছে। তাদের মধ্যে প্রতিবাদ করার সামর্থ্য দিন দিন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমাদের দেশের তরুণেরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে কারো থেকে কম নয়। আমাদের দেশে ছাড়া অন্যান্য দেশে ঠিকই দ্রুত ছড়াচ্ছে তরুণেরা। কিন্তু দেশে তারা কেন পারছে না? আমাদের তরুণেরা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার পরে চাকরিতে গিয়ে ব্যাংকের হিসাবের জট খুলতে গিয়ে নিজের এত দিনের অর্জন পরিশ্রম সব জলাঞ্জলি দেয়। সঠিক সুযোগ আর পর্যাপ্ত যথাযথ কর্ম পরিবেশের স্বল্পতার কারণে দেশের প্রতি তরুণদের বিতৃষ্ণা জেগে গেছে। তাই অবলীলায় তারা পাড়ি জমায় সীমার ওপারে।

আমাদের সমাজের বর্তমান যে হাল তাতে এই সমাজ ব্যবস্হার পুনঃনির্মাণ এখন সময়ের দাবি। কারণ, এমন অবস্হা চলতে থাকলে দেশের প্রতি আগামী প্রজন্মের ক্ষোভের পাহাড় আকাশ ছঁুয়ে ফেলবে। আগামী প্রজন্ম যখন দেখবে দেশে সুশাসনের বালাই নেই, মেধার সর্বোচ্চ মূল্যায়ন এখানে হয় না। এখানে মাথাপিছু আয় হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেলেও অনাহারি থাকে তার প্রতিবেশী। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে চাকরির পরীক্ষায় দৌড়ে জুতার তলা ক্ষয় করে ফেলছে চাকরি প্রার্থী। রাজনীতির গ্যাড়াকলে ফেঁসে নিজের জীবনের কোনো মানে খুঁজে পায় না দেশের মঙ্গলে নিরলস কাজ করতে অঙ্গীকার করা রাজনৈতিক নেতা। এমন অবস্হা থেকে বের হওয়া এখন সময়ের দাবি। আর এই পরিস্থিতি মোকাবিলার দায়িত্ব তরুণদেরকেই নিতে হবে। যে দেশের মোট জনসংখ্যা ৩২ শতাংশ তরুণ রয়েছে, সেখানে সমাজ সংস্কারের দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তায়। বর্তমান আধুনিক বিশ্বে খোলস ছেড়ে বের হয়ে নিজে সামর্থের প্রমাণ রাখার অনেক ক্ষেত্র রয়েছে তরুণদের মধ্যে। শুদ্ধ চিন্তাভাবনার ব্যাপ্তি ঘটিয়ে নিজেকে যোগ্য করে তৈরি করে সমাজকে সুন্দর ও পরিমার্জিত করা তরুণদের দ্বারাই সম্ভব। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে লেজুরবৃত্তি বন্ধ করে শুদ্ধ রাজনীতির চর্চার ফলে তারুণ্য এই সমাজকে বদলে দিতে পারে।

ডিয়ানা পিটারফ্রেউন্ড বলেন, ‘কিছু সময় এমন কিছু তরুণই পৃথিবীর পরিবর্তনে সক্ষম, যারা কিছুটা পাগল এবং জেদি’ অর্থাত্ তরুণদের মনোবল আর তীব্র ইচ্ছাশক্তি সমাজ বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। নিজেদের দায়বদ্ধতার জায়গাটাকে বুঝতে হবে তরুণদের। সত্য ও সুন্দরের চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করতে হবে। অর্জন করতে হবে বিদ্যা, হতে হবে বুদ্ধিমান। নিজেদের দায়িত্বটা সঠিকভাবে পালন করতে হবে আগামীর কল্যাণে। যোগ্যতায় নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সামর্থ্য অর্জন করতে পারলেই তরুণেরা উচ্ছনে যাওয়া সমাজটাকে ভেঙে বিনির্মাণ করতে সক্ষম হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন