ভালো নেই প্রাণের ক্যাম্পাস

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২২, ০৯:১১

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, হাজারো স্বপ্ন ভাঙা-গড়ার শতবর্ষের পুরোনো এক কারখানা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশেষ আবেগ-অনুভূতির, এক বিশেষ স্বপ্নের নাম। হাজারো নির্ঘুম রাত, শত শত শখ আর আনন্দের বিসর্জনে খুব ভাগ্যবান কিছু মানুষ নিজের জন্য একটি জায়গা করে নিতে পারে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর এটিই থেকে যায় তার জীবনের সেরা অর্জনের পাতায়। কিন্তু এত বড় অর্জনের পরেও সেসব শীর্ষস্থানীয় মেধাবীদের জীবনে অপ্রত্যাশিত সব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

গেস্টরুম অপসংস্কৃতি চর্চার ফলে হলে একটি সিটের জন্য নিজেকে ক্রীতদাসে পরিণত করতে হয়। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও লোক দেখানো রাজনীতিতে নিজেকে জড়াতে হয়। সারাদিন বইয়ের সঙ্গে কাটানো ছেলেটিও রাজনৈতিক মিটিং, মিছিল গেস্টরুম শেষ করে বইকে সময় দিতে পারে না। এভাবে শুরুতেই অনেকে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। তারপর চরম হতাশা নিয়ে পরবর্তী চারটি বছর কোনোমতে পার করে শূন্য হাতে বিদায় জানাতে হয় প্রাণের ক্যাম্পাসকে। অথচ দেশ ও জাতির জন্য সে ছিল এক অপার সম্ভাবনাময় নক্ষত্র।

অপরাজেয় বাংলার সামনে একদিকে চলছে সভা, সম্মেলন অন্যদিকে কলাভবনে চলছে পরীক্ষা, যা কখনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবান্ধব পরিবেশকে নির্দেশ করে না। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পরে ক্যান্টিনে খাওয়ার পুষ্টিগুণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করার ভাষা নেই, দাম তো লাগালের বাইরে। রমজান উপলক্ষ্যে হলের ক্যান্টিনে খাদ্যের যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অধিকাংশ শিক্ষার্থীদের সাধ্যের বাইরে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা নিয়ে ভাববার সময় কোথায়! কীভাবে দুবেলা খেয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকবে তা ভাবতে ভাবতেই তাদের দিন পার করতে হয়। আবার বয়স্ক পিতার ওপর নির্ভরশীল জীবন থেকে মুক্তি পেতে হন্য হয়ে ছুটতে হয় চাকরির পেছনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী প্রাপ্তবয়স্ক, সাবলম্বী হওয়ার সক্ষমতা রাখে। শুধু যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তাদের নির্ভরশীল জীবনযাপন করতে হয়।

ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা বিভিন্নভাবে তাদের অবসর সময় অতিবাহিত করছে যার অধিকাংশ সময়ই যুক্ত হচ্ছে অপচয়ের, অপব্যবহারের খাতায় কিন্তু চাইলেই যথোপযুক্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ সময়কে কাজে লাগানো যেতে পারে দেশের ও জাতির কল্যাণে। একজন শিক্ষার্থী শত লড়াই করে দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয় নিজের অবস্থান গড়ে নিতে পারলেও সেই বিশ্ববিদ্যালয় তাকে একটি থাকার জায়গা, একটু স্বাস্থ্যসম্মত খাওয়ার নিশ্চিয়তা দিতে ব্যর্থ, যা সত্যি লজ্জাজনক। দেশের সেরা মেধাবীদের জন্যই সবচেয়ে অপরিষ্কার স্থানে, অযত্নে খাদ্য তৈরি করা হয়। অস্বাস্থ্যকর, পুষ্টিগুণহীন এসব খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যর অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় মেধাবীরা একদিন দেশ পরিচালনা করবে, এটাই সবার প্রত্যাশা কিন্তু যদি তাদের জন্য একটি সুস্থ জীবনের ব্যবস্থা আমরা না করতে পারি, নিজেদেরকে বিশ্বের বুকে মেলে ধরার সুযোগ করে দিতে না পারি, তাহলে আমরা তাদের কাছ থেকে কি পাওয়ার আশা রাখতে পারি, এটা সত্যি ভাববার বিষয়। তবে এগুলো নিয়ে ভাববার মতো কেউ নেই। আবার বহিরাগতদের আগমনে ক্যাম্পাসে এক অসুস্থ পরিবেশের সৃষ্টি করে। ছুটির দিনগুলোতে প্রাণের ক্যাম্পাস পরিণত হয় পার্কে। কার্জন হলের বিভিন্ন স্থানে অনেকে আপত্তিকর অবস্থায় লক্ষ্য করা যায়। এগুলো শিক্ষার্থীদের সুন্দর মানসিকতা গড়ার পথে বাঁধা হিসেবে কাজ করে।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে টিকটকের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করা হয়, যা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। ক্যাম্পাসের ভিতরে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, ছিনতাই, চুরি, মারামারি ইত্যাদির মতো ঘটনা ঘটে বহিরাগতের অবাধ, অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশের ফলে। এ ক্ষেত্রে আমাদের সচেতন অবস্থানে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রাণের ক্যাম্পাসে প্রাণচাঞ্চল্যকর পরিবেশ ধরে রাখতে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন