সম্প্রতি প্রকাশিত সংবাদপত্রের কিছু বিষয়বস্তু আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। যেমন- বুড়িগঙ্গার তীর ধরে গড়ে ওঠা ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী শহর ঢাকা এখন পরিবেশ দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, তীব্র যানজট, গ্যাস সংকট, অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধার মতো বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিনিয়ত ধুঁকছে।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনএপি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শব্দদূষণে বিশ্বের শীর্ষ শহর এখন ঢাকা। গত ১৫ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু হওয়ায় রাজধানীর যানজট পৌঁছেছে এক ভিন্ন মাত্রায়। আধাঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে এখন লাগছে তিন ঘণ্টারও বেশি সময়। রাজপথের এই দুর্ভোগ প্রতিটি চলমান ব্যক্তির জীবনকেই বিষিয়ে তুলছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, যানজটের কারণে ঢাকা মহানগরীতে দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে কর্মজীবীদের, যার আর্থিক ক্ষতি বছরে ৩৭ হাজার কোটি টাকা।
মুসলমানদের সিয়াম সাধনার পবিত্র রমজান মাসের প্রথম দিনেই গ্যাস সরবরাহ অপর্যাপ্ত ছিল রাজধানীর বহু এলাকায়। ইফতার ও সেহরির জন্য তাই হোটেলগুলো শেষ ভরসা হলেও সেখানেও দেখা গেছে গ্যাসহীনতার চিত্র। গ্যাস সংকটের কারণে গ্যাসনির্ভর বিদু্যত্ কেন্দ্রগুলোর উত্পাদন ব্যাহত হওয়ায় বেড়েছে লোডশেডিং। এছাড়া পানির অভাবে ফসল উত্পাদন ব্যাহত হওয়ায় সাঁওতাল কৃষকের আত্মহত্যা, হলের খাবারের টাকা জোগাড় করতে না পেরে ছাত্রের অত্মহত্যা এবং সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি। আমাদের সামনে এসেছে টিসিবির ট্রাকের পেছনে মধ্যবিত্তের দৌড় প্রতিযোগিতার ছবি, ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যকার ইঁদুর-বেড়াল খেলা, নিত্যপণ্যের বাজারে মধ্যবিত্তের দীর্ঘশ্বাসের উষ্ণ বাষ্প। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার দুর্ভিক্ষের চিত্র অচিরেই মনে ভয় ধরিয়ে দেয়।
তবে আশার কথা আমাদের অর্থনীতি পুরোপুরি পর্যটননির্ভর নয়। সর্বশেষ অর্থবছরে বেড়েছে রফতানি আয়, বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রা, রেমিট্যান্স। দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ এবং সংকট উত্তরণে বর্তমান সরকার অক্লান্তভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি একাজে প্রতিটি নাগরিকের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। অথচ বেশির ভাগ সময়েই আমরা এমন সব বিষয় নিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হইচই করি, নিজেদেরকে বিভক্ত করে ফেলি, যার চাপে হারিয়ে যায় অত্যন্ত জরুরি ইস্যুগুলো।
যেমনভাবে টিপের নিচে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির আলোচনা কিংবা গ্যাস সংকট। সম্প্রতি টিপ কাণ্ড নিয়ে দেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো সরব। কেউ কেউ আবার হিজাব নিয়ে কটুক্তির বিষয়কেও সামনে এনেছেন। আমরা বুঝি দেশের কল্যাণ এবং সংকট উত্তরণ ভাবনা এসবের চেয়ে ঢের জরুরি। অথচ সেই ভাবনার সময় আমাদের নেই। দেশের যত সংখ্যক মানুষ তুচ্ছ বিষয়গুলো নিয়ে সরব হয়ে ওঠে তার এক শতাংশও দেশের বৃহত্ সংকটগুলো নিয়ে ভাবে না। দেশের চলমান এতসব সমস্যা সংকটে আমরা টিপ, হিজাব ইস্যু দিয়ে নিজেদের চোখ ঢাকতে চাই। কিন্তু অন্ধ হলেই কি আর প্রলয় বন্ধ হয়?
দেশের সার্বিক সংকটের দায় জনগণও কোনোভাবে এড়াতে পারে না। সোনার বাংলা গড়ার কথা মুখে বললেও কাজের ক্ষেত্রে কেউ নেই। কাজের প্রসঙ্গ এলেই সরকারের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে আমরা পাশ কাটিয়ে যাই। আমরা সুশাসনের বুলি আওড়াই, কিন্তু সুশাসন নিশ্চিতে সুনাগরিকের ভূমিকা যে কোনো অংশে কম নয়, একথা বিশ্বাস করতে প্রস্ত্তত নই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শক্তি সম্পর্কে আমরা প্রত্যেকেই অবগত।
তবে বেশির ভাগই সেই শক্তিকে ব্যবহার করি অপ্রয়োজনীয়, অযৌক্তিক জায়গায়। আমাদের চিন্তাভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলছি অপ্রয়োজনীয় ইসু্যতে। যা কখনই একজন প্রকৃত নাগরিকের আচরণ হতে পারে না। বাংলাদেশের সংবিধানের ২০ ও ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকের কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে— সংবিধান ও আইন মান্য করা, শৃঙ্খলা রক্ষা করা, নাগরিক দায়িত্ব পালন করা, জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করা ও সব সময়ে জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা। তাই দেশের স্বার্থে, জাতীয় স্বার্থে বৃহৎ সংকটগুলো নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো নিজেদের চিন্তাভাবনা এবং মেধার প্রতিফলনের দ্বারাই নিজেদের সংকট মোকাবিলা করে বিশ্বের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাই ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য লড়াই নয়, বরং আসুন বৃহত্ স্বার্থে আমাদের শক্তিকে একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে কাজে লাগাই।
লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
