শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পুতিনের সন্ত্রাসের প্লেবুক: ইউক্রেন আগ্রাসন চেচনিয়ার ঘটনার পুনরাবৃত্তি

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২২, ১০:০৪

চেচনিয়ানরা জানে মস্কোর আগ্রাসন কতটা দুর্বিষহ হতে পারে—ইউক্রেনে রাশিয়ার বিজয় হবে রাশিয়ার আগ্রাসনে ভুক্তভোগী সবার বিপক্ষে বিজয়। দখলকৃত ইউক্রেনীয় শহরগুলোতে রাশিয়ার সৈন্যদের দ্বারা সংঘটিত গণহত্যার দৃশ্যগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত না করা আমার জন্য অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অসাড়তা কাটিয়ে উঠে আগ্রাসনের শিকার মানুষগুলোর ছবি জুম করে, প্রতিটি মুখ ভালোভাবে বিশ্লেষণ করে আমার মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে :‘তারা আগেও এটা করেছে। তারা আবার এটা করছে।’

নির্বিচারে গোলাগুলি, লুটপাট, ধর্ষণ, নির্যাতন ও মৃত্যুদণ্ডের প্রমাণ, সর্বোপরি এই যুদ্ধাপরাধগুলো যে উদ্দীপনা নিয়ে সংঘটিত হচ্ছে, তা বেদনাদায়কভাবে পূর্বপরিচিত। সাম্প্রতিক সময়ে আমার মন আরেকটি ছবির দিকে ঘুরপাক খাচ্ছে, সেটি হলো ১৮ বছর আগে চেচনিয়ার রিগাখয় গ্রামে আমার মা, মানবাধিকারকর্মী নাটালিয়া এস্তেমিরোভার তোলা ছবিটি। সেখানে দেখা যাচ্ছে, পাঁচটি ছোট ধূসর চেহারার শিশুর মৃতদেহ উচ্চতা অনুসারে সারিবদ্ধভাবে পড়ে আছে, যারা সবাই ছিল ভাইবোন। সবচেয়ে বড় শিশুটি পাঁচ বছর বয়সি, সবার ছোট যমজ শিশু দুটি ১২ মাস বয়সিও ছিল না। ২০০৪ সালের ৯ এপ্রিল রাশিয়ান বোমা হামলায় শিশুগুলো এবং তাদের মা মায়দাত সিন্টসায়েভা নিহত হয়েছিলেন।

এ ঘটনা ছিল চেচনিয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে রাশিয়ান সেনাবাহিনীর দ্বারা সংঘটিত অনেকগুলো বিচারহীন অপরাধের মধ্যে একটি। আমার মা আশা করেছিলেন, এই ছবিগুলো চেচেন বেসামরিক নাগরিকেরা কী অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সে বিষয়ে বিশ্বকে সতর্ক করবেন, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। কয়েক বছর পরে এলো তার পালা—কেউ একজন রোদে পোড়া ঘাসে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা তার প্রাণহীন, বুলেটবিদ্ধ দেহের একটি ঝাপসা ছবি তুলেছিল। আমার মায়ের খুনিরা মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটাই চেচনিয়ায় রাশিয়ার সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের প্রকৃত চিত্র।

১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ এবং ১৯৯৯ থেকে ২০০৯-এর মধ্যে চেচনিয়ার বিরুদ্ধে রাশিয়া যে দুটি যুদ্ধ করেছিল, তাতে চেচনিয়ান প্রজাতন্ত্র পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। এ দুটি যুদ্ধে প্রায় ৩ লাখ লোক নিহত এবং ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার লোক নিখোঁজ হয়? ইউক্রেনে ভ্লাদিমির পুতিন যা অর্জন করতে চাইছেন, তারই একটি অদ্ভুত ক্ষুদ্র প্রতিকৃতি চেচনিয়ার আজকের এই পরিণতি :নেতৃত্বের বর্বরতার দ্বারা আতঙ্কিত একটি অবরুদ্ধ, পরাধীন জায়গা। রমজান কাদিরভ, যাকে প্রয়াত সাংবাদিক আনা পলিটকভস্কায়া আখ্যা করেছিলেন পুতিনের ‘ছোট ড্রাগন’, তিনি ক্রেমলিনের হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, তার নিজের লোকদের ভয় দেখাচ্ছেন এবং তাদের ইউক্রেনে যুদ্ধ করতে পাঠাচ্ছেন। তার শাসনের বিরোধীদের একাধিক হত্যাকাণ্ডের পেছনেও তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে।

মারিউপোল প্রসূতি হাসপাতালে বোমা হামলার আগে, ১৯৯৯ সালে গ্রোজনি প্রসূতি হাসপাতাল ও একটি জনাকীর্ণ বাজারে রাশিয়া বোমা হামলা চালিয়েছিল, সেখানে আনুমানিক ১০০-১২০ জন নিহত হয়। বুচা ও ইরপিনের আগে ৭ এপ্রিল ১৯৯৫ সালে রাশিয়ান সৈন্যরা সমাশকি শহরে জাচিস্টকা অপারেশন পরিচালনা করেছিল, যার মাধ্যমে নিরপরাধ মানুষের ওপর অকথ্য ভয়াবহতা প্রকাশ পায়। সৈন্যরা বেসামরিক লোকদের গুলি করে, নারীদের ধর্ষণ করে এবং বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঐ দিন অন্তত ১০৩ জনকে হত্যা করা হয়। এই তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর: নভিয়ে আলদি, ক্যাটির ইয়ার্ট, কমসোমলস্কয়—অনেক গণহত্যা, অনেক জীবননাশ, যা গণনা করে শেষ করা সম্ভব নয়।

এই ঘটনাগুলো প্রশ্ন জাগায় :রাশিয়ার দ্বারা সংঘটিত এই সমস্ত নথিভুক্ত নৃশংসতার পরও আবার কীভাবে একই ঘটনার পুনারাবৃত্তি ঘটে? চেচনিয়ায় রাশিয়ার এসব অপকর্ম ক্রেমলিনের পরবর্তী দুই দশকের সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশলের জন্য একটি ব্লুপ্রিন্ট হিসেবে কাজ করেছিল, এটি রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষার একটি ভয়ংকর পদ্ধতি। এর পরের বছরগুলোতে আমরা দেখেছি—তিসখিনভাল থেকে আলেপ্পো, ক্রিমিয়া থেকে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র—বিশ্ব মঞ্চে দায়মুক্তির পাশাপাশি সহিংসতা ঘটানোর অপচেষ্টা।

যেখানে আমার মায়ের মতো কর্মীরা চেচনিয়ায় যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ সংগ্রহের জন্য তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন, সেখানে বাস্তববাদী পশ্চিমা নেতারা রাশিয়ার তেল, গ্যাস ও অর্থের স্রোতকে স্বাগত জানিয়ে তাদের সরিয়ে দিয়েছিলেন। কিছু সহানুভূতি দেখালেও বিষয়টি রাশিয়ার ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে অনেকাংশে বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল।

রাশিয়ার অভ্যন্তরে ক্রেমলিনের প্রপাগান্ডাকারীরা সফলভাবে চেচনিয়ায় ‘রাশিয়ান গণহত্যা’ সম্পর্কে পৌরাণিক কাহিনি তৈরি করেছে এবং চেচেনদের অমানবিক প্রমাণ করতে এবং বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধকে ন্যায়সংগত করতে বিশ্বব্যাপী ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ অভিধাকে ব্যবহার করেছে। একই প্রচার কৌশল এখন ইউক্রেনীয়দের ‘নব্য-নাত্সি’ বা ‘ব্যান্ডেরোভাইটস’ হিসাবে ভূষিত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর অনেক মস্কোঘেঁষা উদারপন্থি বলেছিল যে তারা জানে না কীভাবে নিজেদের সঙ্গে বাঁচতে হয়—যদিও তাদের বেশির ভাগই সরকারের কর্মকাণ্ডকে স্বাচ্ছন্দ্যে মেনে নিয়েছিল, কারণ ১৯৯৪ সাল থেকে তারা তাদের নিজস্ব (মুসলিম) জনসংখ্যার বিরুদ্ধে হত্যা ও সন্ত্রাস অব্যাহত রেখেছে। তবে সিরিয়ার শহরগুলোতে রাশিয়ার বোমা বর্ষণ করার সময় আমরা এমন আত্মপ্রতিফলন দেখতে পাইনি।

বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, পুতিনের বর্তমান আচরণ দেখে অনেকেই হতবাক হয়েছেন, যখন তিনি শুরু থেকেই তার কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা প্রদর্শন করেছেন। আরো বিস্ময়কর যে, ক্রিমিয়াকে অবৈধভাবে সংযুক্ত করার পরে রাশিয়াকে কবজিতে চড় মেরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল এবং ডনবাসে যুদ্ধ চালানোর সময় ২০১৮ বিশ্বকাপ আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। রাশিয়ার দ্বারা ইউক্রেনে যে নৃশংসতা সংঘটিত হচ্ছে, সেটি অনিয়ন্ত্রিত আগ্রাসন এবং সহিংসতার চূড়ান্ত পরিণতি, যেটি কয়েক দশক ধরে উপেক্ষা করা হয়েছিল।

এই যুদ্ধ কেবল একটি উপায়ে শেষ হতে পারে :ইউক্রেনের বিজয়ের মাধ্যমে। ক্রামতোর্স্কে সাম্প্রতিক রকেট হামলায় যে কয়েক ডজন বেসামরিক লোককে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেটি রাশিয়ার পক্ষ থেকে আসা যুদ্ধবিরতির যে কোনো আলোচনা কীভাবে একটি প্রতারণা হতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। পশ্চিমাদের অবশ্যই ইউক্রেনের সরকার যা চাইবে তা দিয়ে সাহায্য করতে হবে—ট্যাংক, কামান, বিমান, নিষেধাজ্ঞা। এটি কেবল বছরের পর বছর উদাসীনতার ফলে যে ক্ষতি হয়েছে, সেটির ক্ষতিপূরণ হবে।

একজন চেচেন হিসেবে আমি ইউক্রেনের জনগণের রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ। তাদের বিজয় হবে পুতিনের অপশাসনের শিকার প্রতিটি জনগণের বিজয়।

লেখক: চেচনিয়ান সাংবাদিক, ট্রাবল উইথ দ্য ট্রুথ পডকাস্টের উপস্থাপক

দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর—এইচ এম নাজমুল আলম

ইত্তেফাক/ইআ