ছাত্র-রাজনীতির অপ্রাপ্তি

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২২, ০৩:৩৯

প্রখর রোদের তপ্ত ঝাঁজে খেটে খাওয়া মানুষের দেহের ঘামে দেশের জমিন হয় উর্বর, তার বুকে ফলে সোনালি ফসল। দেশ রূপান্তরিত হয় রূপবতী-গুণবতীরূপে সবার কাছে। তাদের ট্যাক্সের টাকায় যেমন একদিকে পুরো দেশের মানুষের ভাগ্য ফেরে, অন্যদিকে একটি নতুন মেধাবী প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য তাদেরই সন্তানরা পড়াশোনা করে। এই মেধাবী নতুন প্রজন্ম যদি পথ হারায়, তাহলে পুরো দেশই পথ হারায়।

প্রতিনিয়ত পড়াশোনা, গবেষণা ও আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে দেশকে গড়ার কাজ করে ছাত্রসমাজ। এজন্য তাদের একটি সুন্দর পরিবেশের দরকার হয়, ভালো একটি শিক্ষাব্যবস্থার দরকার হয়, গবেষণা প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়। এসব কিছু সময়মতো ছাত্ররা পেলে তারা এগোয়, তারা এগিয়ে গেলে দেশও এগিয়ে যায়। একজন ছাত্র এসব অধিকার সরকার ও মনোনীত কর্তৃপক্ষের কাছে আদায় করে নেয়। যখনই কোনো অনিয়ম দেখে তখনই অনিয়ম ভেঙে নিয়মের মধ্যে শিক্ষা-কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার জন্য সংঘবদ্ধ ছাত্রসমাজের প্রয়োজন হয়। এই সংঘবদ্ধভাবে অধিকার আদায়ের নাম যদি ছাত্ররাজনীতি হয়, তবে এমন ছাত্ররাজনীতিই দেশ গড়ার কাজে অনিবার্য হয়ে পড়ে।

বিশ্বের দেশে দেশে ছাত্র রাজনীতি রয়েছে। ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড, কেম্ব্রিজসহ সব উচ্চতর প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি রয়েছে। কিন্তু তাদের এ রাজনীতির মূল স্পিরিট হলো ছাত্রদের সব সুবিধা নিশ্চিত করা। ছাত্রদের খাবারের মান, আবাসন, পড়াশোনাবিষয়ক সিদ্ধান্ত এবং তাদের কাছে ছাত্র হিসেবে যেসব অধিকার প্রাপ্য মনে হয়, সেসব নিয়ে তারা আন্দোলন করে। গত ১২ অক্টোবর থেকে দীর্ঘ ৩৩ দিন আবাসন সংকট নিয়ে আন্দোলন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। তাদের এসব আন্দোলনে জাতীয় রাজনীতির প্রভাব সৃষ্টি করে না বলেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে তারা তাদের অধিকার আদায় করতে পারে, যা শিক্ষার একটি সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে সাহাঘ্য করে। অস্ট্রেলিয়াতেও ছাত্ররাজনীতির ব্যাপক সাড়া রয়েছে এবং ছাত্র সংগঠনগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন না হওয়ায় ইতিবাচক একটি রাজনৈতিক চর্চা প্রতিষ্ঠানগুলোতে হয়ে থাকে। তারা জাতীয় ইস্যু নিয়েও সজাগ থাকে।

বাংলাদেশে আক্ষরিক অর্থে ছাত্ররাজনীতি থাকলেও প্রকৃতার্থে নেই। যেসব ছাত্ররা তাদের অধিকারের জন্য কথা বলে, তারা প্রকৃতার্থে কোনো দলের নয়। সাধারণ ছাত্ররা একটা ক্যাজুয়াল গ্রুপে সংগঠিত হয়ে তাদের দাবি আদায়ের জন্য মাঠে নামে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের উন্নতির গ্রাফ দিন দিন নিচের দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে মানহীন শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ছেই। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় ব্যাঙের ছাতার মতো গজাচ্ছে। অথচ যে-কয়টি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সেগুলোর গবেষণায় ভর্তুকি নেই; হলে খাবারের মান নিম্ন, দাম বেশি; জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবহেলা-অনাদরে মানুষ করা হয়; গ্রামের কলেজ ও বিদ্যালয়গুলোতে সায়েন্স ল্যাব নেই, ব্যবহারিক জ্ঞান না থাকার কারণে গ্রামীণ ছাত্ররা সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থায় পরাস্ত হয়। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রামীণ ছাত্ররা কম টেকে; ফরম পূরণের সময় কলেজ ও স্কুলগুলো ব্যবসা করা শুরু করে। এমন হাজারটা সমস্যা নিয়ে কথা বলা যায়, যেগুলো অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু ছাত্র রাজনীতির পোস্টার লাগানো ছাত্র সংগঠনগুলো কোথায়? তারা এসব বিষয় নিয়ে কথা বলে না কেন? ছাত্র হয়ে ছাত্রদের প্রতি তাদের দরদ নেই?

দুঃখজনক হলো এই পরিবেশের পরিবর্তন ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো যায় না, এটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। একটি সুশিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে উঠলে তারাই এরকম একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাবে। তার আগে দরকার সুশিক্ষার পরিবেশ। ছাত্র রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন এই প্রক্রিয়াটিকে অনেক দূরে ঠেলে দিচ্ছে। সুতরাং ছাত্র রাজনীতিকে একটি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেওয়া সময়ের দাবি। এই পরিবেশ ততক্ষণ তৈরি হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত রাজনৈতিক অভিভাবকবিহীন ছাত্র সংগঠন গড়ে না উঠবে। একটি রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন পরিপূর্ণভাবে কখনো অসংগতির বিরুদ্ধে কথা বলতে পারবে না। তারা ছাত্রদের জন্য উন্নয়নমূলক কিছু করার মঞ্চটিও পাবে না—অতীতের ইতিহাস তাই বলে। সুতরাং ছাত্র রাজনীতিকে হতে হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তার অন্য কোনো কোন মূল সংগঠন থাকা যাবে না। এ ছাড়া সুস্হ রাজনীতির বিকাশের জন্য আদর্শভিত্তিক দলগুলোকে প্রতিযোগিতামূলকভাবে কাজ করতে হবে এবং লেজুড়বৃত্তিক তোষণের সংস্কৃতি ছাড়তে হবে। মুক্তবুদ্ধির চর্চা বাড়ানোর জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ হাতে নিতে হবে। এ পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারলেই ছাত্ররা ছাত্র রাজনীতির সুফল লাভ করতে শুরু করবে এবং তারাও ভয়ভীতি কাটিয়ে ছাত্র রাজনীতিতে আসা শুরু করবে।

ছাত্ররাজনীতি গতানুগতিক পড়াশোনার বাইরের একটি প্রতিষ্ঠান যেটা শেখায়, অভিজ্ঞতা বাড়ায় তথা সমাজ সংস্কার, অর্থনীতি, স্বরাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতির মগজ বাড়ায়; ছাত্ররাজনীতি না থাকলে এ জিনিসটা হারাতে হবে। দেশের সম্মানজনক জায়গাগুলো পরবর্তী জীবনে তারা অলংকৃত করলে রাজনীতিতে একটি স্হিতিশীলতার নির্মল বাতাস নিয়ে আসবে; অন্যায়, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অপচর্চা থেকে বাঁচাবে বাংলাদেশকে এবং দেশকে নিয়ে যাবে এতটা দূরে, যেখানে গেলে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় না।

লেখক: শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন