শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও আমাদের শিক্ষা

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২২, ০৯:২১

শ্রীলঙ্কা দক্ষিণ এশিয়ার একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কা অন্যতম একটি দেশ। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যসংবলিত সমুদ্রসৈকত, ভূদৃশ্য, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য শ্রীলঙ্কা সারা পৃথিবীর পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সম্প্রতি দ্বীপ রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় বিরাজ করছে গভীর সংকট। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর এই প্রথম এতবড় বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছে দেশটিকে। ঋণের ফাঁদে জর্জরিত দেশটি ইতিমধ্যে নিজেদের ঋণখেলাপি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।

শ্রীলঙ্কার এই অর্থনৈতিক বিপর্যয় হুট করে সৃষ্টি হয়নি। অপরিকল্পিত নীতি বাস্তবায়ন, পরিকল্পনাহীন অবকাঠামো নির্মাণ, মূল্যস্ফীতি, ঋণের জটে আটকা ইত্যাদি ধীরে ধীরে শ্রীলঙ্কাকে আজকের এই দুরাবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে। শ্রীলঙ্কা তাদের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য নানা দেশের থেকে ঋণ নিয়ে সেগুলি শোধ করতে গিয়ে সে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একধাক্কায় অনেকটা কমে গিয়েছে। শ্রীলঙ্কা পর্যটননির্ভর দেশ। পর্যটন থেকে দেশটির সিংহভাগ আয় হয়।

কিন্তু করোনা চলাকালে বা গত দুই বছরে পর্যটনখাত থেকে দেশটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আর্থিক সাফল্য অর্জিত হয়নি। শ্রীলঙ্কার বর্তমান মূল্যস্ফীতি ১৫ শতাংশ। দেশটিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আরেকটি বড় জায়গা হচ্ছে বিভিন্ন দেশে কর্মরত শ্রীলংকার নাগরিকদের পাঠানো ডলার। কিন্তু করোনা মহামারির সময় সেটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে ধুঁকতে হচ্ছে দেশটিকে। যার প্রভাব পড়েছে দেশটির শিক্ষা, স্বাস্হ্য, অর্থনীতি, ব্যবসা, বাণিজ্যসহ প্রতিটি খাতে। দেশটিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম আকাশচুম্বী। জ্বালানি তেলের অভাবে কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি কাগজের অভাবে স্কুল পর্যায়ে পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গেছে। পুরো দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকছে না ১০ ঘণ্টা।

দক্ষিণ এশিয়ার শ্রীলঙ্কা অর্থনীতিতে অগ্রসরমান একটি দেশ ছিল। তাদের দেশের শিক্ষার হার শতকরা ৯৫ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় ৪ হাজার ডলারের বেশি। কিন্তু এত কিছুর পরও শ্রীলঙ্কার এই আর্থিক বিপর্যয় বাংলাদেশসহ বিশ্বের বাকি দেশগুলোর জন্য সতর্ক বার্তা। শ্রীলঙ্কার এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের যে কোনো দেশই শিকার হতে পারে। তবে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রতিটি সূচক শক্ত অবস্থানে রয়েছে। প্রতিটি খাত থেকে লক্ষ্য অর্জনে তত্পর রয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্ববাজারে পোশাক, ওষুধ, রেমিট্যান্সসহ অন্যান্য খাতে বাংলাদেশের সাফল্য চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের পরিমাণ এবং রপ্তানি আয় দিন দিন বাড়ছে। শুধু গত মার্চ মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা মোট ১৮৬ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। দেশীয় মুদ্রায় যা (প্রতি এক ডলার সমান ৮৬ টাকা হিসাবে) ১৫ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। করোনা পরিস্থিতিতেও দেশের অর্থনীতিক অবস্থান বেশ ইতিবাচক ছিল। মোটা দাগে বলতে গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই, তবে সতর্ক থাকতে হবে।

শ্রীলঙ্কার এই সংকট থেকে ইতিবাচক দিক গ্রহণ করে বাংলাদেশকে এখনই সময়োপযোগী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দেশে দক্ষ মানবসম্পদ গঠনকে প্রাধান্য দিতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়নে সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করে তার সঠিক বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশের প্রতিটি খাতে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। দেশের স্থানীয় সমাজব্যবস্থা উন্নয়নে তৃণমূলে বিশেষ নজর দিতে হবে। শ্রীলঙ্কার মতো অবকাঠামো উন্নয়নকে মূল প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। সুপরিকল্পিত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। ভারসাম্য অর্থনীতিক অবস্থান তৈরি করতে হবে। দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বাড়াতে হবে। দেশের মূল্যস্ফীতি, মুদ্রাস্ফীতি ও বাজেটে সমন্বয় সাধন করতে হবে। এতে বিশ্বের বুকে দেশের অবস্থান আরো সুদৃঢ় ও মজবুত হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন