বিগত দুই বছর মহামারি করোনার কারণে ইচ্ছে থাকলেও অনেকে নাড়ীর টানে যেতে পারেনি গ্রামের বাড়ি ঈদ কাটাতে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, আদালতসহ প্রত্যেকের কর্মক্ষেত্র থেকে ছুটি পেলেও স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে নিয়ে একপ্রকার বাধ্য হয়েই ঈদ কাটাতে হয়েছে ইট-পাথরের এই যান্ত্রিক শহরে। তাই এবার সব বাধা উপেক্ষা করে মা-মাটির সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে উদগ্রীব হয়ে পড়েছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা মানুষেরা। ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে বাড়ি যাওয়ার প্রস্ত্ততি। তবে ঘরমুখো মানুষের বাড়ি ফেরার এই যাত্রা কতটুকু স্বস্তিকর হবে, সেটা নিয়ে বরাবরের মতোই রয়ে গেছে আশঙ্কা।
কিছুদিন আগে বাসে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। এতে করে বেশ কিছুটা ভোগান্তি পোহাবে ঘরমুখো মানুষ। তার ওপর অন্য বছরের থেকে এ বছর ট্রেনের বগি কম সংযোজন করার কারণে ট্রেনেও থাকবে যাত্রীদের অতিরিক্ত ভিড়। আর আকাশপথে ইচ্ছে থাকলেও সাধ্যে পেরে উঠবে না মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তরা। তবু ইতিমধ্যে আকাশ পথের অভ্যন্তরীণ সব এয়ারলাইন্সের টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। এ বছরও সড়ক সংস্কার, অতিরিক্ত গাড়ির চাপে মহাসড়কে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে তীব্র যানজট। বিশেষ করে সব থেকে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ। আরিচা এবং মাওয়া ফেরিঘাটে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হয় পারাপারের। এ বছর ফেরি সংকটে এ ভোগান্তি আরো বাড়িয়ে তুলবে। ওদিকে উত্তরবঙ্গের মানুষেরও এবার বেশ ঝামেলা পোহাতে হবে নিজ নিজ ঠিকানায় ফিরতে। বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড় সংযোগ মহাসড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় তাদের জন্যও এবারের ঈদযাত্রা খুব বেশি স্বস্তির হবে না।
প্রতি বছরই দেখা যায়, ঘরমুখো অতিরিক্ত যাত্রীদের চাপে সড়কে গণপরিবহন ও নদীতে লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে। চাপ সামলাতে না পেরে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি গাড়ি উঠানোর ফলে মাঝপথে ফেরি ডুবির ঘটনায় শত শত মানুষ মারা যায়। তাছাড়া দেখা যায়, যানজটের কবল থেকে রেহাই না পেয়ে স্বল্পপাল্লার গাড়িতে চড়ে ফেরি বা লঞ্চের পরিবর্তে স্পিডবোটে পার হয় অনেক যাত্রী। দ্রুততার সঙ্গে নদী পাড়ি দিতেই মূলত তারা এই পদ্ধতি অবলম্বন করে। কিন্তু সাম্প্রতিক একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নদীতে ডুবে মারা যাওয়ার বড় একাংশ এই স্পিডবোট দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এজন্য এসব দুর্ঘটনা ঘটার আগেই কর্তৃপক্ষকে আরো বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। ছোট ছোট এ বিষয়গুলো নজরে না আনলে কোনোভাবেই অপ্রত্যাশিত এই দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে না।
অনেক সময় তড়িঘড়ি করে বাড়ি ফিরতে গিয়ে পথেঘাটেই যেন মৃত্যু না হয়, সেদিকে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। সব সময় মনে রাখতে হবে, সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি। কারণ আপনার আমার একটু অসচেতনতার ফলেই শুধু আমরা পৃথিবী ছেড়ে চলে যাই না। বরং পথে বসতে হয় আমাদের পরিবারকেও। হারিয়ে যায় আপনার আমার ছেলেমেয়ের হাসিমাখা মুখ। অপেক্ষায় থাকা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ সবকিছু ভেবেই আমাদের উচিত হবে নিজ জায়গা থেকে সচেতনতার সঙ্গে বাড়ি ফেরা। সেক্ষেত্রে সময় বাঁচাতে লাফ দিয়ে পরিবহনে ওঠা, অতিরিক্ত যাত্রীবাহী লঞ্চে যাত্রা করা, দ্রুত পার হতে স্পিডবোট ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। যাতে অনেক প্রতীক্ষার পরে আসা এই ঈদের যাত্রা আমাদের জন্য নিরাপদ হয়। সুস্থ-সুন্দরভাবে যেন পরিবারের সঙ্গে ঈদানন্দ উপভোগ করতে পারেন, এসব বিষয় মাথাই রেখেই হোক আপনার এবারের ঈদযাত্রা।
লেখক: শিক্ষার্থী, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা
