বাংলাদেশ সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশগুলোর মধ্যে একটি, তাই এখানে নোনাজল অনুপ্রবেশের বিরূপ প্রভাব উল্লেখযোগ্য। লবণাক্ততা উপকূলীয় এলাকার ভূমি ও পানিকে প্রভাবিত করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে লবণাক্ত পানি অভ্যন্তরীণ পানি ও মাটির দিকে প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রায় ৩২ শতাংশ জায়গা জুড়ে সর্বমোট ১৯টি জেলা নিয়ে উপকূলীয় অঞ্চল গঠিত, যেখানে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি মানুষ বসবাস করে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ধীরে ধীরে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশের এই দৃশ্য প্রাথমিক উৎপাদনব্যবস্থা, উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে মোট লবণাক্ত প্রভাবিত জমির পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর, যা ২০০৯ সালে ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টরে উন্নীত হয়েছে এবং ক্রমাগত এটি বৃদ্ধি পাচ্ছে (এসআরডিআই, ২০১০)।
জীবিকা নির্বাহের তাগিদে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, বন উজাড় করা, ফারাক্কা ব্যারেজের প্রভাব ইত্যাদি কার্যকলাপের সঙ্গে সঙ্গে সারা বিশ্বে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী, যা পরবর্তী সময়ে লবণাক্ততা বৃদ্ধিতে সাহাঘ্য করছে। এছাড়া ঘূর্ণিঝড়, জোয়ারভাটা, ভূগর্ভস্হ পানি প্রবাহের পরিবর্তন, আর্থসামাজিক অবস্থা, কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ, দুর্বল অবকাঠামো ও রক্ষণাবেক্ষণ, অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা এবং অসংখ্য মানবিক ক্রিয়াকলাপ লবণাক্ততার অনুপ্রবেশের জন্য দায়ী । উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল বিধায় তারাই সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও লবণাক্ততা চিংড়ি চাষের জন্য কিছু সুবিধা বয়ে আনে, তবে এটি অন্যান্য স্বাদু পানির মাছের বিলুপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কতিপয় অসাধু ও লোভী চিংড়িচাষি ইচ্ছাকৃতভাবে লবণাক্ত পানি প্রবেশের ব্যবস্থা করছে। এভাবে বিভিন্ন নদীর জীবনচক্রও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নদীর প্রাণিজ ও জলজ সম্পদ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, কৃষি জমিতে সেচকাজে বিঘ্ন ঘটছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে মাটির গুণাগুণ হ্রাস পায়, ফলে ধানের উত্পাদনও তুলনামূলকভাবে হ্রাস পায়।
উপকূলীয় এলাকায় ধান ছাড়াও অন্যান্য খাদ্যশস্য, ফল-মূল, শাকসবজি এবং বৃক্ষরোপণও অসম্ভব হয়ে ওঠে। হাঁস-মুরগি, গবাদি পশুর খামার গড়ে উঠতে পারে না। কারণ তাদের খাদ্য আসে কৃষি থেকে। অধিকাংশ শাকসবজি আসে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলো থেকে। এর ফলে খাদ্যের সংকট দেখা যাচ্ছে এবং বাজারে শাকসবজির মূল্য বেড়েই চলেছে। এর ফলে জিডিপি তুলনামূলকভাবে কমে যাাচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল। মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসরত মানুষ পানীয় জলের অভাবে ভোগে। কারণ মিঠা পানির সব উৎস তখন লবণাক্ত পানিতে পরিণত হয়।
লবণাক্ত পানি পান করার ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। যেমন: উচ্চরক্তচাপ, খিঁচুনি, কলেরা, অকাল গর্ভপাত, বিকলাঙ্গ সন্তান জন্মদান, অপুষ্টি ইত্যাদি। বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েই চলেছে। এছাড়া ৩ শতাংশ শিশু গর্ভাবস্থায় বা জন্ম নেওয়ার পরপরই মারা যাচ্ছে (আইসিডিডিআরবি)। এর বিরূপ প্রভাব থেকে বাঁচতে মানুষের স্থানান্তরের ঘটনা প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। তাই এই সমস্যা সমাধানের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ মিঠা পানির ব্যবস্থা করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাসমূহ যেমন: বৃষ্টির পানি ধরে রাখা, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ বন্ধের জন্য সঠিক আইন প্রণয়ন করা এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন কমাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
