শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা কোথায়?

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২২, ১০:০৭

একজন শিক্ষার্থী তার মেধা এবং যোগ্যতার দ্বারা নিয়মিত বিদ্যাচর্চার মাধ্যমে দেশের কল্যাণে নিজেকে গড়ে তোলার ব্রত নিয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করে। যেন পরবর্তীকালে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে অত্যন্ত আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, সাম্প্রতিক সময়ে সেই শিক্ষার্থীরাই পড়ছে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা সংকটে। স্থানীয় জনগণ, ব্যবসায়ী, শ্রমিক বা উগ্রপন্থিদের দ্বারা শিক্ষার্থীদের নিগৃহীত হওয়ার ঘটনা বারবার প্রত্যক্ষ করছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী এবং ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষে নিউমার্কেট এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া সেই ধারারই উদাহরণ। কথা কাটাকাটির জের ধরে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা প্রহার করে কয়েক জন শিক্ষার্থীকে। প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামলে সেখানেও তাদের ওপর হামলা চালানো হয়।

প্রভাবশালীদের দ্বারা শিক্ষার্থী নির্যাতিত হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। বিগত জানুয়ারি মাসে সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি-বিরোধী আন্দোলনে পুলিশের অতর্কিত হামলা এবং নির্যাতনের দৃশ্য আমরা দেখেছি। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ধর্ষণের ঘটনার বিচার চাওয়ায় স্থানীয়দের হামলায় আহত হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ২৫ মার্চ ২০২২, স্থানীয়দের হামলায় কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০ শিক্ষার্থী আহত হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, গভীর রাতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ওপর দুবৃ‌র্ত্তদের সশস্ত্র হামলায় ১৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১ স্থানীয় প্রভাবশালীরা সংঘবদ্ধভাবে আক্রমণ চালায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর। এর আগে ২০১৮ সালে বাসচাপা পড়ে ছাত্রের মৃত্যুর প্রতিবাদে রাস্তায় নামা স্কুল শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের বাস থেকে ফেলে দেওয়া, তাদের ওপর হকারদের চড়াও হওয়ার ঘটনা সংবাদপত্রের পাতা ওলটালে ভুরি ভুরি দেখা যায়। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে। যারা দেশের ভবিষ্যৎ, যাদের হাতে উড়বে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের নিশান, তাদের নিরাপত্তা আমরা কতটুকু নিশ্চিত করতে পারছি?

শিক্ষা ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব না। যুগে যুগে যখনই দেশ-জাতি ক্রান্িতলগ্নে উপস্থিত হয়, দেশের মেধাবী সন্তানরাই সেই সংকট উত্তরণের পথ বের করে। তাই শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সুস্ঠু পরিবেশ এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের কর্তব্য দেশের সাধারণ জনগণেরই। অথচ তারাই এখন অবতীর্ণ হচ্ছেন ভক্ষকের ভূমিকায়। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যদি শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামতে হয় এবং সেখানেও আবার নির্যাতনের শিকার হতে হয়, সেই লজ্জা দেশের প্রতিটি নাগরিকের। শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সৌন্দর্য। তাদের বিচরণক্ষেত্র হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই। শিক্ষার্থীদের যদি রাস্তায় নামতেই হয় সেটা দেশ এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করতে।

আইনের ঊর্ধ্বে কেউই নয়। শিক্ষার্থীরা অপরাধ করলে প্রচলিত আইনে তাদেরও শাস্তি হবে। তবে ন্যায়ের জন্য পথে নামা শিক্ষার্থীদের ওপর পুনঃপুন হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যারা শিক্ষার্থীর গায়ে হাত তোলে, তারা দেশের উন্নয়ন আসলেই চায় কি না সে ব্যাপারে সংশয় থেকে যায়। বাংলাদেশের অভু্যদয়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাব, দেশের বৃহত্ আন্দোলন-সংগ্রামে শিক্ষার্থীদের ত্যাগই সবচেয়ে বেশি।

স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম শক্তি ছিল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তৎকালীন ছাত্রদের অবদান অনস্বীকার্য। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেও পুলিশের কাছে মার খেয়েছে ছাত্ররা। স্বাধীনতার ৫১ বছর পরেও পুলিশের হাতে মার খাচ্ছে তারা। যা একটি স্বাধীন দেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত অমানবিক। শিক্ষার্থীদের ওপর এমন বর্বর হামলায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে এবং উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের ভার নিতে হবে রাষ্ট্রকেই। নতুবা শিক্ষার্থীদের ওপর হিংস্র মনোভাব পোষণকারীরা আবারও উৎসাহিত হবে। দেশে শিক্ষার্থী নিপীড়িত হওয়ার ঘটনা বাড়বে। বিঘ্ন হবে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন