দেশে ব্রেইন ড্রেইন বাড়ছে কেন?

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২২, ১০:১৪

বিশ্বের যেসব দেশ জ্ঞান-গবেষণায় বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজেদের প্রকৃষ্ট জাতিতে রূপান্তর করতে পেরেছে, সেই সব দেশ শিক্ষার উৎকৃষ্টতার বদৌলতে সমৃদ্ধতার চূূড়ায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। মানসম্মত শিক্ষা একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ নিশ্চিত করে তাকে বিশ্বদরবারে উন্নত ও মর্যাদাশীল জাতির আসনে আসীন করে। এ ক্ষেত্রে দেশের শিক্ষিত ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাই প্রধান কান্ডারিরূপে পরিগণিত হয়।

মেধাবী ও শিক্ষিত নাগরিক তৈরিতে একটি দেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকা ব্যয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্র এসব কার্যাবলি সম্পন্ন করে থাকে; যার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের মেধাবী জনগোষ্ঠীর এই অংশ, যাতে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র বিনির্মাণে সচেষ্ট থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ক্রমশ বর্ধনশীল ব্রেইন ড্রেইন বা মেধা পাচার দেশের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার পথে প্রতিবন্ধকতার সূচনা করেছে। বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত আমাদের দেশে শিক্ষিত-দক্ষ-মেধাবী জনশক্তির সংখ্যা খুবই স্বল্প। তার মধ্যে বর্ধনশীল ব্রেইন ড্রেইন বা মেধা পাচার ভবিষ্যতে সমৃদ্ধ দেশ নির্মাণের অন্তরায়।

বাংলাদেশ সরকার তার নিজস্ব অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষা প্রদান করছে। পাবলিক প্রতিষ্ঠানের এই শিক্ষার্থীরা তাদের উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে যোগ্যতার মাপকাঠিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন করে থাকে, কিন্তু হতাশার দিকটি হচ্ছে, দেশ থেকে বিদেশে শিক্ষা ও গবেষণার জন্য গমনকারী শিক্ষার্থীদের বিরাট অংশ আর দেশে প্রত্যাবর্তন করছে না; যেখানে মেধাবী ও দক্ষ এসব শিক্ষার্থী যে কোনো রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান জনশক্তি; যার দ্বারা রাষ্ট্র উন্নতির শিখরে আরোহণ করতে পারে।

ইউনেসকোর তথ্যমতে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৪ হাজার ১১২ জন শিক্ষার্থী বিদেশে অভিবাসন করেছে। ২০২০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বলছে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি ব্যাচের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীই বিদেশে চলে যায়। তাদের খুব কমসংখ্যকই দেশে ফিরে আসে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ক্রমাগত মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিদেশে অভিবাসনের ফলে দেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাবের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সেবা খাতকেও মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন করবে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে মেধাবীদের বিদেশে পাড়ি জমানোর হার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদের নতুন করে ভাবনার জন্ম দিচ্ছে, কেন এসব মেধাবী বিদেশে চলে যাচ্ছে? একটি দেশে যদি সুশাসন, রাজনৈতিক স্হিতিশীলতা, সামাজিক ন্যায়বিচার বিরাজমান থাকে, তাহলে সেই দেশ অগ্রগতির পথে ধাবিত হয়। দেশ হয়ে ওঠে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের বসবাসের উপযোগী। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমাদের বিদ্যমান সমাজব্যবস্থায় মেধাবীদের মূল্যায়নে নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তাদের যথাযথ সম্মান এবং কাজের সুষ্ঠু পরিবেশের অভাব দেখা যায়। যার কারণে দেশে ব্রেইন ড্রেইন ক্রমাগত হারে বেড়ে চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশ হয়ে পড়বে মেধাশূন্য, যা কখনো দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না। এ ছাড়া মেধাবীদের বিদেশ গমনের ফলে দেশের অনেক উন্নয়ন প্রকল্প ও কর্মক্ষেত্রে বিদেশি বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করতে হয়, যার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়ের সঙ্গে রয়েছে দেশপ্রেমহীন নিম্নমানের কাজের শঙ্কা।

উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলা ব্রেইন ড্রেইন মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে দেশের রাজনৈতিক সরকারকেই। এজন্য দেশে মেধাবীদের প্রতিভা বিকাশের যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বাড়াতে হবে সামাজিক মর্যাদা ও সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনী। পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশের আদলে আমাদের দেশেও ব্রেইন হান্টিং প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে মেধাবীদের ফিরিয়ে আনতে হবে। একটি দেশ তখনই উন্নত, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল জাতিতে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে, যখন দেশের মেধাবীদের যথাযোগ্য মূল্যায়ন করা হবে। তাই এখনই দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সরকারের উচিত ব্রেইন ড্রেইনের এই চাকার গতি ক্রমাগত কমিয়ে আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন