শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মাদকের বড় চালানে জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স

ধ্বংসের পথে যুবসমাজ, এখনই কার্যকর ব্যবস্হা গ্রহণের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২২, ০২:৩০

মাদক নির্মূলে একের পর এক অভিযান চালালেও খোঁদ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণির সদস্যের বিরুদ্ধে পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি অনেকে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন। শুধু তাই নয়, টেকনাফ, কক্সবাজার, পার্বত্যাঞ্চলসহ অধিকাংশ সীমান্ত দিয়ে মাদকের চালান পাচার করে আসছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণীর সোর্স। এই সকল সোর্স নিয়োগ করে মাদক পাচার করছেন এক শ্রেণির কর্মকর্তারা। 

সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স ও কোন কোন ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা, মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত এবং এই ব্যবসার নেপথ্যে গডফাদার কারা তাদের আমরা চিনি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় কক্সবাজার জেলার টেকনাথসহ পার্বত্যাঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক ব্যবসায় জড়িত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, রাজনৈতিক নেতা ও মাদক ব্যবসার গডফাদারদের নামও উল্লেখ রয়েছে। 

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক শ্রেণির কর্মকর্তারাও মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। তাদের সোর্সরাও পাচারের সাথে জড়িত। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সোর্সরা সীমান্তে মাদক পাচারের সাথে জড়িত। সীমান্তে ব্যাপক হারে বিনা বাধায় মাদকের চালান প্রতিদিনই আসছে, তা খতিয়ে দেখার জন্য একাধিক সংস্হা কার্যক্রম চালাচ্ছে। মাদক উত্পাদনকারী দেশ না হলেও বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্হানের কারণে মাদকের সর্বাত্মক আগ্রাসনের শিকারে পরিণত হয়েছে। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে সর্বনাশা মাদক। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মাদক পাচারের পরিমাণ বেড়ে গেছে, এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মাদকে আসক্তদের সংখ্যা।

দেশের সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে মাদকাসক্ত রয়েছে। তবে তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তের সংখ্যা সর্বাধিক। আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ইংলিশ মিডিয়াম সহ উচ্চ শিক্ষার সকল প্রতিষ্ঠানে মাদকাসক্তের হার বেশি। এমন কোন পেশা নেই, যেখানে মাদকাসক্তের সংখ্যা কম নয়। অর্থাৎ দেশের যুব সমাজকে ধ্বংসের পথে। এটা অশনিসংকেত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা। তারা বলেন, মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসনের মধ্যে অবস্হান করছে দেশের যুব সমাজ। মাদক নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর ব্যবস্হা গ্রহণ করা না হলে যেকোন সময় যুব সমাজে চরম অবক্ষয় ঘটবে। অভিভাবকরাও মাদকের এই ভয়াবহ দৃশ্য দেশে তারাও ভীতিসন্তস্ত্র। আক্রান্ত সন্তানের হাতে পিতা-মাতা প্রায় দিনই লাঞ্চিত হচ্ছেন। তাই সময় থাকতে মাদকের বিরুদ্ধে এখনই সর্বাত্মক ব্যবস্হা গ্রহণ করা জরুরি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীসহ সারাদেশে থানাসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্সদের অধিকাংশই গ্রামাঞ্চলে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। এমনকি গ্রাম্য চৌকিদারদের অনেকেই মাদক ব্যবসাকে পেশা নিয়ে নিয়েছে।

প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জাতীয় মাদক নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন ঘোষণা করেছেন। কিন্তু মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। দেশকে ও আগামী প্রজন্মকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। তিনি বলেন, দেশের সীমান্ত এলাকায় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সীমান্ত দিয়ে মাদক পাচার বন্ধ হলে দেশের অভ্যন্তরেও মাদক নিয়ন্ত্রণ এমনি চলে আসবে। সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি শতভাগ বাস্তবায়নে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদিচ্চা থাকা প্রয়োজন। যারা আক্রান্ত হচ্ছে তারা এদেশেরই নাগরিক, পরিবারের সদস্য, সন্তান কিংবা তার আপনজন হতে পারে। তাই যারা সীমান্তে মাদক পাচারের সাথে জড়িত তাদের ভাবতে হবে যে, তার সন্তানও একদিন সর্বনাশা এই মাদক থেকে রেহাই পাবে না। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ার মূল কারণ চালক মাদকাসক্ত। এর কারণে চালক সব সময় উত্তেজিত থাকে। সে কী গাড়ি চাপা দিয়ে মানুষ মারলো নাকি কী মারলো তার কোন প্রতিক্রিয়া হয় না।

তেজগাঁও কেন্দ্রীয় মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের মনরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রায়হেনুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন মাদকাসক্ত দিনমজুর-রিক্সা চালক থেকে শুরু করে ছাত্র-ছাত্রী ও বিভিন্ন পেশার মানুষ চিকিত্সার জন্য আসছে। এদের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। এই সংখ্যা দেখে আশংকা করা হচ্ছে, বাংলাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা খুবই ভয়াবহ। মাদকের এই ভয়াল ছোবল থেকে যুব সমাজকে এখনই রক্ষা না করলে আগামীতে দেশ পরিচালনাসহ সকল ক্ষেত্রে মেধা শূন্যতা দেখা দেবে। এটা বাংলাদেশকে মেধা শূন্য করার ইঙ্গিত কিনা বুঝতে পারছি না। তবে এখনই এর লাগাম টেনে ধরতে হবে। নইলে মাদকের কারণে খুন-খারাবিসহ সামাজিক সহিংসতা, পারিবারিক সহিংসতা বাড়তেই থাকবে।

মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, তিনি দীর্ঘদিন মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। মাদক যতোটা নিয়ন্ত্রণ করা দরকার, ততোটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে যে জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট দরকার তাও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নেই। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকে সম্পৃক্ত করে সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সকলে এগিয়ে না আসলে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। নইলে যে লাউ সেই কদু। যদিও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে জনগণকে সম্পৃক্ত করার এবং বিভিন্ন পেশার মানুষকে মাদক সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করার কার্যক্রম চলছে। এই কর্মকর্তার মতে, বর্তমানে দেশে মাদকের যে ভয়াবহ বিস্তার, তা মহাসমুদ্রের মধ্যে এক ফোঁটা পানির মতো কার্যক্রম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, দেশের মানুষের জীবন-মান উন্নয়ন হয়েছে। এখন তরুণ সমাজের হাতে টাকা। তাদের লাইফ স্টাইলও পরিবর্তন হয়েছে। আর মাদকও এখন সহজলভ্য। দেশে যেকোন জায়গায় চাইলেই মাদক পাওয়া যায়। তরুণ সমাজ যেমন মাদকাসক্ত হচ্ছে, লেখাপড়া বাদ দিয়ে মাদক ব্যবসায়ও জড়িয়ে পড়ছে। কারণ এটা লাভ বেশি, সহজলভ্য। তিনি বলেন, দেশে মাদক যাতে আসতে না পারে সেজন্য সীমান্তবর্তী এলাকা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ইতিমধ্যে যারা মাদকে আসক্ত হয়ে গেছেন তাদের পুনর্বাসন করতে হবে। তিনি বলেন, সীমান্ত উন্মুক্ত রেখে মাদক নির্মূল করা সম্ভব হবে না। সীমান্ত দিয়ে মাদক আসা বন্ধ করতেই হবে। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিপদপ্তরকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে মাদকের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে। 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ডায়ানা অ্যাওয়ার্ড পেলেন বাংলাদেশি ফায়েজ

করোনায় মৃত্যু বেড়েছে, কমেছে শনাক্ত

সৌদিতে আরও ৩ বাংলাদেশি হজযাত্রীর মৃত্যু

‘বি-বাড়িয়া’র পরিবর্তে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ লেখার নির্দেশ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

হজে কুড়িয়ে পাওয়া অর্থ ফেরত দিলেন ঢাকার আব্দুর রহমান

বিশেষ সংবাদ

চালকের সহকারীরাই চালান পণ্যবাহী ট্রাক

দুর্নীতির অভিযোগে ব্যক্তিকে একাধিক নোটিশ দিতে পারবে দুদক: আপিল বিভাগ

বিশেষ সংবাদ

শিক্ষক হত্যা-লাঞ্ছনা: মানবিক-পারিবারিক শিক্ষার অভাবকে দুষলেন তারা