যানজট নিরসনে গণপরিবহন বৃদ্ধি জরুরি

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২২, ০০:৪৬

শিক্ষা, ব্যবসা ও প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু ঢাকায় দিন দিন জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ জনসংখ্যার বাস এই মেগাসিটিতে। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতি দিন শত শত মানুষ ছুটছে ঢাকায়। অথচ এই শহরে নেই পর্যাপ্ত সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা! নগর ও পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘একটি শহরের মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ সড়ক থাকা প্রয়োজন।’ কিন্তু ঢাকায় এর পরিমাণ ৯ শতাংশের চেয়েও কম। তাই তো যানজটের যন্ত্রণা ঢাকাবাসীদের জীবনে ওতপ্রোতোভাবে জড়িয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই যানজট আরো বহুগুণে বেড়ে গেছে।

বুয়েটের দুর্ঘটনা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, ‘দিনে ৮০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে যানজটের কারণে, এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৪০ কোটি টাকা।’ এ ছাড়াও যানজটের ফলে ব্যক্তিজীবনে নামছে ধস; চাকরিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীরা সময়মতো অংশ নিতে পারছে না, রোগীকে সংকটময় পরিস্হিতিতে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ছে, বাড়ছে বায়ুদূষণের পরিমাণ, নগরবাসীর উচ্চরক্তচাপ, বক্ষব্যাধি এবং উত্কণ্ঠা এবং কমছে রাস্তার আয়ুষ্কাল। এমন দুর্বিষহ অবস্থা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে সরকার মেগা প্রকল্প মেট্রোরেল চালু করতে যাচ্ছেন। এতে করে ২০৩৫ সালের মধ্যে পাঁচটি মেট্রোরেল ঢাকাবাসীকে সেবা দিবে। তবে কাঙ্ক্ষিত এ বাহনটিও যানজট এড়াতে পারবে কিনা তা নিয়েও বেশ শঙ্কা রয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। উপরন্তু, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে রেলওয়ে স্টেশনগুলোকে কেন্দ্র করে যানজটের আশঙ্কা আরো বেড়ে যেতে পারে।

যানজট বৃদ্ধির পেছনে সংকীর্ণ সড়কব্যবস্থা, ফুটপাত দখল, আইনের অবমাননা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিংসহ একাধিক কারণ জড়িয়ে থাকলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ‘গণপরিবহনের থেকে ব্যক্তিগত গাড়ির পরিমাণ বৃদ্ধি অন্যতম একটি প্রধান কারণ।’ কেননা, সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে ‘জীবনমান উন্নত হওয়ায় চলতি বছরের গত তিন মাসে ঢাকায় ৮ হাজার ব্যক্তিগত গাড়ি নিবন্ধিত হলেও এর বিপরীতে বাস ও মিনিবাস নিবন্ধিত হয়েছে মাত্র ৩৬২টি। এসব ব্যক্তিগত গাড়ির সড়কের ৭৬.৩ শতাংশ অংশ দখল করেছে, যা মাত্র ২৫ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করে। অন্য দিকে বিশাল অঙ্কের যাত্রীর জন্য গণপরিবহন ব্যবস্থায় সংকট থাকায় চড়ম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ জনগোষ্ঠীকে। বিশেষ করে জাতীয় ও ধর্মীয় উৎসবগুলো শিকড়ের টানে ঘরে ফিরতে ব্যাকুল যাত্রীরা পর্যাপ্ত গণপরিবহনের অভাবে ট্রাক, কনভার্ট, ট্রেনের ছাদ ও লঞ্চ বোঝাই করে দীর্ঘ যানজটের ভোগান্তি সহ্য করে যাত্রাপথ পাড়ি দেয়। দুর্ঘটনা ইনস্টিটিউট, বুয়েটের দেওয়া তথ্য মতে, ‘এবারও ঈদের আগ মুহূর্তে প্রতি দিন ঢাকা ছাড়বে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ অথচ দেশে নৌপথ, রেলপথ ও সড়ক পথে মিলিয়ে যাত্রী পরিবহনের ধারণ ক্ষমতা ১৩ থেকে ১৪ লাখ মাত্র!’

তাই জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে গণপরিবহনের সংখ্যা বৃদ্ধি ও এর প্রতি মানুষের নির্ভরশীলতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে প্রশাসনের সার্বিক নজরদারি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। সেই সঙ্গে রাজধানী উন্নয়নে ইতিমধ্যেই গৃহীত বিভিন্ন পরিকল্পনাসমূহ ও পরিবহন খাত উন্নত করতে আইএসপির যেসব ব্যবস্থা প্রণীত হয়েছে তার সমন্বিত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জনগণকেও দেশের অবকাঠামোর প্রতি নজর রেখে বৃহত্ জাতীয় স্বার্থে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ রাখা উচিত। একই সঙ্গে গণপরিবহনসমূহের মান বৃদ্ধিতে যুগোপযোগী পদক্ষেপ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। সর্বোপরি শহরকে যানজটমুক্ত রাখতে প্রশাসন ও পরিবহন মালিক সমিতির ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গণপরিবহন বৃদ্ধির প্রয়াস যেন সার্থক হয়।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন