আমরা মানুষ হই

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২২, ০০:৫১

সৃষ্টির আদিতে যখন সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবার সবকিছুই ছিল অস্পষ্ট; আমাদের আদিম পূর্বপুরুষেরা যারা বনে বনে ঘুরে বেরিয়েছেন বেঁচে থাকার জৈবিক তাড়নায়, তারাও নিশ্চয়ই মানুষ, তবে সেই পরিচয় শুধু-ই জৈবিক। কেবল জৈবিক পরিচয় অতিক্রম করে আত্মিক পরিচয়ে মানুষ হয়ে উঠতে মানবজাতিকে অপেক্ষা করতে হয় কয়েক হাজার বছর। আর সেই কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসই মানবসভ্যতার প্রকৃত ইতিহাস। হাজার বছরের ক্রমবিবর্তনে আজকের আধুনিক সভ্য মানুষ বলতে যে পরিচয়টি গ্রহণ করতে চায়, সে মানুষ কেবল রক্তে-মাংসে গড়া জৈবিক মানুষ নয়, সে মানুষ নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও কর্মের জায়গা থেকে মানুষ। ফলে নৈতিকতাহীন, মূল্যবোধবির্বজিত ও অপকমের্র ধারক ব্যক্তিকে মানুষ পরিচয় দিতে আমরা আজ কুণ্ঠা বোধ করি। আমরা চাই মানুষ হোক তার কর্ম, মানসিকতা আর মূলবোধের পরিচয়ে পরিচিত একটি মানুষ।

শিশু জন্মের পর থেকে পরিবারে বেড়ে ওঠে। ফলে পরিবারের শিক্ষা ও মূল্যবোধ শিশুর চরিত্র গঠনে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। পরিবারের নৈতিক শিক্ষার বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজনে একটা সময় তাকে পড়তে হয় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করে যে ব্যক্তিটি আমাদের কাছে নতুন করে ফিরে আসে, সে সমাজের চোখে ভিন্ন একটি ব্যক্তিত্ব। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রত্যাশা তার কাছে থাকে সব থেকে বেশি। কারণ এসব ব্যক্তিত্বই একটা সময় রাষ্ট্রের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হবেন এবং রাষ্ট্রের অদূর ভবিষ্যত্ ও বর্তমান তাদের ওপরেই নির্ভর করে এগোবে! কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী এসব ব্যক্তিত্বের অনেকেই নিজেদের ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে একটা সময় নৈতিকতাহীন, মূল্যবোধবিবর্জিত অসত্ মানসিকতার ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রত্যাশাকে ধূলিসাত্ করে নিজেদের অতি ক্ষুদ্র স্বার্থ বজায় রাখতে গিয়ে তাদের অনেকে রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে মোটেও কুণ্ঠিত হন না। কর্মক্ষেত্রে যেখানে চাইলেই রুটি-রুজির বন্দোবস্তের সঙ্গে সৎ-সুখী থাকা যায়, সেখানে ভোগবিলাসিতা ও অর্থলোভের তাড়না তাদের অনেককে দিয়েই করিয়ে নেয় পৃথিবীর সব থেকে নিকৃষ্ট কাজগুলো। অন্যায়কে ন্যায় বানিয়ে, অবিচারকে সুবিচার সাজিয়ে রঙ্গমঞ্চের এই ক্রীড়াবিদরা নিজেদের স্বার্থ ষোলকলাপূর্ণ করলেও, দেশের সার্বিক অগ্রগতির পথে তারাই প্রধান প্রতিবন্ধক। আর যে কারণেই হয়তো স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরেও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা আজ অবধি খাঁটি সোনা হয়ে উঠতে পারেনি।

যাহোক, বাঁচতে হলে ভাবতে হয়। আমাদের সবার ভেবে দেখা উচিত, আমরা আসলে কে- কতটুকু মানুষ। আমরা কি কেবলই জৈবিক পরিচয়ে পরিচিত, নাকি আমরা শুদ্ধ আত্মার পরিচয়ে পরিচিত সত্যিকারের আত্মিক মানুষ। আমাদের এ-ও ভাবা প্রয়োজন যে, আমরা কি কেবলই সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত হয়ে থাকব, নাকি আমরা হব শিক্ষার সত্যিকার গুণে গুণান্বিত একটি মহৎ সত্তাধারী ব্যক্তিত্ব। আমাদের মনে রাখা আবশ্যক, মানুষ বাঁচে তার কর্মে, বিচার্য হয় তার মূল্যবোধে ও পরিচিত হয় মানসিকতায়। তাই আমরা হয়ে উঠব কর্মের জায়গা থেকে মানুষ, আমরা হয়ে উঠব নৈতিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে মানুষ, আমরা হয়ে উঠব মানসিকতায় পরিপূর্ণ মানুষ। আর একজন সত্যিকারের মানুষই তার দেশ ও রাষ্ট্রের শুভাকাঙ্ক্ষী, প্রকৃত বন্ধু।

এটা নিশ্চত যে ভালো মানুষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা কখনোই একটি ভালো রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা হওয়ার যোগ্যতা রাখি না। আমরা যেদিন সবাই সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে পারব সেদিনটায় আমরাও পেয়ে যাব সত্যিকারের চমত্কার একটি রাষ্ট্র। আমাদের পুরো সমাজ, গোটা রষ্ট্র আসলে কেমন সে জিজ্ঞাসার ঠিক আগে আমাদের সবাইকে নিজেদের ভাবতে হবে, আপনি বা আমি ব্যক্তি হিসেবে আসলে কেমন। আমরা কি কর্মের জায়গায় মহৎ, আদর্শমান? আমরা কি মানসিকতায় উৎকৃষ্ট? আমাদের নৈতিক মূল্যবোধটাই-বা কোন স্তরের! এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ যাচাইয়ে যদি আমরা নিজেদের ভেতর থেকে ইতিবাচক সাড়া পাই, তবে ধরে নিতে হবে মানুষ হওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় আমরা সফল। আর যারা মানুষ পরিচয়ে সফল, তাদের আর বৃহত্ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে বলেও মনে করি না। কারণ আমরা মানবেরা রাষ্ট্রের রাজাকে করি তিরস্কার অথচ বনের সন্ন্যাসীকে করি ভজন।

তাই লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে গিয়ে চলুন, আমরা মানুষ হই। মুখোশ ছুড়ে ফেলে সত্যি সত্যি মানুষ হই! যতটুকু সত্যি হলে পৃথিবীর কোনো অপশক্তিই আমাদের মানুষ পরিচয়টি মুছে দিতে পারবে না।

লেখক: শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন