নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌ-দুর্ঘটনা নতুন বিষয় নয়। তবে দুঃখের বিষয় এই যে, এদেশে প্রতি বছর-ই শত শত নৌ-দুর্ঘটনা ঘটছে। তাতে শত শত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে; শত শত স্বপ্নের সলিল সমাধি হচ্ছে; নদীর তীরের আকাশবাতাস স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হচ্ছে। আর প্রতিবার-ই দুর্ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সারা দেশে তোলপাড় থাকছে, হইচই হচ্ছে। মিডিয়াপাড়া উত্তাল থাকছে। কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন হচ্ছে; কর্তৃপক্ষ দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত রিপোর্টও জমা দিচ্ছে। ব্যাস, এতটুকুই। কার্যত ভূমিকা আর রাখা হচ্ছে না।
প্রতিবার-ই নৌ-দুর্ঘটনার পরে টেলিভিশন, সংবাদপত্র, তদন্ত রিপোর্ট ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণের বদৌলতে যে বিষয়গুলো সামনে উঠে আসে তা হলো, মেয়াদোত্তীর্ণ, লাইসেন্সবিহীন নৌযান, ফিটনেস নেই, ধারণ ক্ষমতার বেশি যাত্রী বহন, চালকের অদক্ষতা। আর যে বিষয়গুলো নজর এড়িয়ে যায়, মুনাফালোভী মালিকের গাফিলতি, নৌযান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা। অর্থাৎ আমরা কেবল সম্যক ঘটনা দেখছি, ঘটনার নেপথ্য পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছি না। নেপথ্যের ঘটনা থেকে যাচ্ছে নেপথ্যেই। তাই সমস্যার কার্যত সমাধানও প্রতিবার-ই ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে যাচ্ছে।
প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে আমরা কেন ঘটনার নেপথ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছি। আমাদের অধিকাংশ নৌ-দুর্ঘটনা স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক নয়, তা হচ্ছে মানবসৃষ্ট কারণে। অতীতে আমরা দেখেছি, প্রায় সময় দুর্ঘটনায় জন্য দায়ী ব্যক্তিরা আটক হলেও শেষ পর্যন্ত আইনের ফাঁকফোকরে বা রাজনৈতিক প্রভাবে কালো টাকার জোরে কিংবা প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। এরপর আবার দুর্ঘটনা ঘটছে। বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল।
নদীকেন্দ্রিক দেশ হওয়ায় নৌপথ একটা জনপ্রিয় জনপথ বলে গণ্য হয়েছে আমাদের কাছে। বাণিজ্যিক কারণে অনেক আগে থেকেই নৌপথের জনপ্রিয়তা রয়েছে। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নৌপথ গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রাধান্য পেয়েছে বেশ আগে থেকেই। এর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে, দ্রুত গন্তব্য স্থানে পৌঁছানোর সুবিধা, প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগসহ বেশ কিছু কারণ। কিন্তু বর্তমানে নৌপথ যেন এখন মৃত্যুকূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক দিনের ব্যবধানের নৌ-দুর্ঘটনার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। বাতাসে ভাসছে প্রিয়জন হারানোর বিষাদমাখা হাহাকার। ফুটফুটে তাজা প্রাণগুলো হেরে যাচ্ছে জীবনের কাছে। সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র তুলনামূলক বেশি দৃশ্যমান হলেও নৌ-দুর্ঘটনার ফলাফলের তীব্রতা অধিক। নৌ-দুর্ঘটনায় শোকের মাতম অনেক বেশি। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতদেহ উদ্ধার বা শনাক্ত করা গেলেও নৌ-দুর্ঘটনায় অনেক মৃতদেহ পানির নিচ থেকে উদ্ধার করা সম্ভবপর হয় না। চিরদিনের মতো তারা হারিয়ে যায়; পানিতে সলিল সমাধি হয়ে যায়। শেষবারের মতোও স্বজনরা দেখতে পান না, সমাধিচিহ্ন পর্যন্ত থাকে না।
নৌ-দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। একে অপরকে না দুষে সম্মিলিত প্রচেষ্টাই দুর্ঘটনা থেকে উত্তরণের পথ। নৌপরিবহন সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে প্রশাসনিকভাবে আরো সক্রিয় হতে হবে। নৌচালক, মাস্টার, বন্দর তত্ত্বাবধায়ক ও যান মালিকদের কর্মকাণ্ডও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। প্রশিক্ষণ বা লাইসেন্সবিহীন চালক ও যানগুলো চিহ্নিত করে তাদের নৌপরিবহন সংক্রান্ত কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে। আইন অমান্যকারীদের ভ্রাম্যমাণ আদালত বা সংশ্লিষ্ট বিভাগের সহায়তায় আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যাত্রা শুরু করার পূর্বে দুর্ঘটনার কবল থেকে উদ্ধার হওয়ার উপায়সংক্রান্ত নির্দেশনা যাত্রীদের উদ্দেশ্যে প্রদান করতে হবে।
কারণ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় লঞ্চে বা ফেরিতে দুর্ঘটনা থেকে বাঁচার সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও যাত্রীসাধারণের অজ্ঞতার কারণে তা অব্যবহূত থেকে যায়। সাঁতার না জানা যাত্রীদের জীবন রক্ষাকারী জ্যাকেট সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। অতিরিক্ত যাত্রী বহন কঠোরভাবে দমন করতে হবে। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের নিজেদেরকেও সচেতন হতে হবে। কারণ ঈদ বা পূজাপার্বণে ঘরমুখো মানুষের ঢল দেখে বোঝা যায় যে, যাত্রীদেরও দোষ কোনো অংশে কম নয়। নৌযান কর্তৃপক্ষের বাধা উপেক্ষা করেও অনেকে অতিরিক্ত যাত্রী হিসেবে ভ্রমণ করে দুর্ঘটনার পথকে ত্বরান্বিত করে থাকে। যাত্রী, চালক ও কর্তৃপক্ষ সবার সম্মিলিত প্রয়াসেই নৌ-দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব।
লেখক: শিক্ষার্থী, ড্রাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
