সোমবার, ২৩ মে ২০২২, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ইউক্রেন যে কারণে জিতবে

আপডেট : ০৮ মে ২০২২, ০২:৫৯

গত ১০ মার্চ আমি ‘প্রিপ্যারিং ফর ডিফিট’ বা ‘পরাজয়ের জন্য প্রস্তুতি’ নামে একটি ছোট্ট নিবন্ধ লিখেছিলাম। (ইউক্রেনে যুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী-সংক্রান্ত এই লেখার অনুবাদ ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়েছে)। এই লেখায় আমি যুক্তি দিয়েছিলাম যে ইউক্রেনে আগ্রাসন চালিয়ে রাশিয়া সরাসরি পরাজয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই লেখা সেই সময় অনেকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। অনেকে ভেবেছিলেন যে আমি একটু বেশিই আশাবাদী। এখনো পর্যন্ত সেই খোঁচা দেওয়ার প্রবণতা তারা বেশ ভালোমতোই ধরে রেখেছেন। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ জয়লাভ করার প্রচেষ্টায় রাশিয়ানরা আসলে পরাজিত হয়েছে। এপ্রিলের প্রথম দিকে তারা উত্তর ইউক্রেন থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। পরবর্তীকালে তারা তাদের কৌশলগত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে নাটকীয়ভাবে সরে আসে। এই যুদ্ধ এখন ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়ে এক নতুন মাত্রা লাভ করেছে।

মস্কো এখন লুহানস্ক ও দোনেত্স্কের অবশিষ্ট অঞ্চলগুলো জয় করতে চায়। সেই সঙ্গে ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর মারিউপোলও তারা কবজা করতে চায়। কিন্তু সেখানে ইউক্রেনীয় মুক্তিযোদ্ধারা আট সপ্তাহের বেশি সময় ধরে প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এবং অবিশ্বাস্যভাবে এখনো তারা মারিউপোল ধরে রেখেছেন।

এখানে প্রথাগত রণকৌশল ও প্রজ্ঞা আবারও পরিবর্তন করতে দেখা গেল। রাজধানী কিয়েভের আশপাশের এলাকার তুলনায় ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের উন্মুক্ত ভূখণ্ডে রাশিয়ানরা ভালো করবে। কারণ তারা এখানে একজন কমান্ডার নিযুক্তের মাধ্যমে সমন্বিত ও একীভূত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং চারটির পরিবর্তে তারা এখন একটি ফ্রন্টে যুদ্ধ করছে। অনেক পর্যবেক্ষক অবিরতভাবে বলার চেষ্টা করছেন যে, উভয় পক্ষ একটি দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার দিকে যাচ্ছে, যা শুধু আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা যেতে পারে। আমি বিশ্বাস করি, এটি একটি ভুল ধারণা এবং ইউক্রেনীয়রা এখন রাশিয়ানদের তাদের দখলকৃত অঞ্চল থেকে তাড়িয়ে দিতে সফল হবে। এর বেশ কিছু কারণ রয়েছে।

প্রথমত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো মিত্ররা ভলোদিমির জেলেনস্কির আবেদনে সাড়া দিয়ে ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা হিসেবে এখন অনেক বেশি পরিমাণে অস্ত্র-সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে। যেমন— দূরপাল্লার কামান, ড্রোন, বিমান ইত্যাদি। এর ফলে রাশিয়া অনেক ক্ষেত্রে সুবিধা করতে পারবে না। যদিও আমরা এখনো জানি না ইউক্রেনীয়দের আসলে কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কেউ কেউ অনুমান করছেন, কিয়েভে এখন পর্যন্ত যে সাঁজোয়া যান আছে, তা দিয়ে সমানে সমানে লড়াই চলতে পারে। দ্বিতীয়ত, রাশিয়ার মনোবল আরো ভেঙে যেতে পারে। উত্তর ইউক্রেন থেকে প্রত্যাহার করা সেনা ইউনিটগুলো যথেষ্ট বিশ্রাম প্রদান ও পুনর্গঠিত করার সময় না দিয়েই ডনবাস যুদ্ধে তাদের নিযুক্ত করা হয়েছে। এ পর্যন্ত তাদের জনশক্তি ও সরঞ্জামের বিশাল ক্ষতি হয়েছে। তাছাড়া তারা কিছুদিন আগে আরো কয়েক জন জেনারেলকে হারিয়েছে। ফলে ইউক্রেনীয়রা জয়ের জন্য আরো বেশি অনুপ্রাণিত ও উজ্জীবিত। রাশিয়ার দখলকৃত অনেক এলাকা তারা ছিনিয়ে নিয়েছে এবং সেখানে রাশিয়ার সেনারা কী ধরনের নৃশংসতা চালিয়েছে তা এখন প্রত্যক্ষ করছে।

তৃতীয়ত, রাশিয়ানরা পরাজয় থেকে শিক্ষা নিতে এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্রুত মানিয়ে নিতে সক্ষম কি না, তা স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে তারা একটি বৃহৎ ও সম্মিলিত যুদ্ধাভিযান কার্যকরভাবে সমন্বয় করার সক্ষমতা এখনো অর্জন করতে পারেনি এবং যুদ্ধে অগ্রসর হওয়ার জন্য তারা নৃশংস ফায়ারপাওয়ারের ওপর নির্ভর করে চলেছে। এর বিপরীতে ইউক্রেনীয়রা তাদের বাহিনীর সামগ্রিক কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে নিম্ন কমান্ড স্তরে কর্তৃত্ব বদল করার ক্ষেত্রে খুব ভালো দক্ষতা অর্জন করেছে। চতুর্থত, রাশিয়ার কাছে পর্যাপ্ত জনবল বা রিজার্ভ বাহিনী নেই, যা তারা যে কোনো বিপত্সংকুল পরিস্থিতিতে তাদের ডাকতে পারে। কারণ ডনবাসে তাদের সেনাবাহিনী ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

আমি বরং যা হতাশাজনক বলে মনে করি তা হলো, আমার কিছু রক্ষণশীল সহকর্মী যুদ্ধের আগে থেকে ইউক্রেনের সমর্থনে যথেষ্ট কাজ না করার জন্য বাইডেন প্রশাসনকে আক্রমণ করে আসছিলেন। তারাই এখন উলটো কথা বলছেন। তারা যুক্তি দেখাচ্ছেন, আমরা ইউক্রেনে অনেক বেশি কিছু করে ফেলেছি। এতে পূর্বাঞ্চলে ইউক্রেনের সাফল্য পুতিনকে রাসায়নিক বা জৈবিক অস্ত্র এমনকি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে করে প্রকারান্তরে তারা তথাকথিত শান্তিবাদী বামদের সঙ্গেই হাত মেলাচ্ছেন, যারা ইউক্রেনের প্রতি শক্তিশালী সমর্থন প্রদানের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই আমাদের সতর্ক করে আসছেন। তাদের কথা হলো, এতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটবে।

ইউক্রেন যুদ্ধ ধাপে ধাপে বৃদ্ধির আশঙ্কাকে কারো উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। নো-ফ্লাই জোনের বিরুদ্ধে একটি যুক্তি ছিল যে এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটো সরাসরি রাশিয়ার মাটিতে রাশিয়ার লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় জড়িয়ে পড়বে এবং তারা গুরুত্বপূর্ণ রেডলাইন বা লাল রেখা অতিক্রম করবে। তবু আমি মনে করি, রাশিয়ার ডব্লিউএমডি বা মারণাস্ত্র ব্যবহার বৃদ্ধির সম্ভাবনা কম। রাসায়নিক বা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার রাশিয়ানদের অবনতিশীল অবস্থান থেকে উদ্ধার করতে খুব বেশি কার্যকর হবে না। কেননা, তখন এই যুদ্ধে ন্যাটোর অংশগ্রহণ অনেক উচ্চ স্তরে বৃদ্ধি পাবে। এটি সম্ভবত ডব্লিউএমডি ব্যবহারে প্রতিসাম্যপূর্ণ হবে না, তবে প্রথাগত অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে এই যুদ্ধে ন্যাটো অংশগ্রহণ করতে পারে এমন অনেক উপায় রয়েছে। যেমন— ইউক্রেনে একটি নৌ ফ্লাই জোন কার্যকর করা বা রাশিয়ার যে ঘাঁটিগুলো থেকে মারণাস্ত্র প্রয়োগ করা হবে, সেখানে হামলা চালানো। এতে রাশিয়ার অবস্থানের বিশাল ক্ষতি হবে। রাশিয়া যদি ইউক্রেনীয়দের কাছেই বাজেভাবে হেরে যায়, তাহলে ভাবুন তো, একটি ন্যাটো দেশ এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে?

রাশিয়ার চূড়ান্ত পরাজয়ের রাজনৈতিক পরিণতি কী দাঁড়াবে, তা এখনো ইউরোপে অনুভূত হচ্ছে না। ভিক্টর অরবান হাঙ্গেরির জাতীয় নির্বাচনে যথেষ্ট ব্যবধানে জিতেছেন, যেমনটি সার্বিয়ায় আলেকজান্ডার ভুসিক করেছিলেন। ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ এই তো কিছুদিন আগে মেরিন লে পেনকে একটি শালীন ব্যবধানে পরাজিত করতে সফল হয়েছেন। কিন্তু অনেক পর্যবেক্ষক উল্লেখ করেছেন যে, নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডে ম্যাক্রঁবিরোধী ভোট বেশি ছিল এবং পরবর্তী রাউন্ডে লে পেনের ভোটে ভাগ বসিয়েছেন ম্যাক্রঁ। রাশিয়ার প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সহানুভূতি আমার কাছে সম্পূর্ণ বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে হয়। তবে তার এই সহানুভূতি রিপাবলিকান পার্টিতে তার অবস্থানকে খুব বেশি উন্নত করেছে বলে মনে হয় না।

যা হোক, ইউক্রেনে যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। ২৪ ফেব্র‚য়ারির পরে রাশিয়া যে অঞ্চলগুলো দখল করেছিল, তা থেকে বিতাড়িত হয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেও যদি এই যুদ্ধ শেষ না হয়, তবে পুতিন কোনো এলাকা জয়লাভ ছাড়াই তার চকচকে নতুন সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করে দেবেন এবং তার দেশকে উত্তর কোরিয়ার মতো বিচ্ছিন্নতার দিকে নিয়ে যাবেন। এই স্তরে ব্যর্থতার পরিণতি হবে ভয়াবহ, রাশিয়া ও বিশ্বে উভয় ক্ষেত্রেই। জনতুষ্টিবাদী যেসব নেতা রাশিয়ার পেছনে লাইন দিয়েছেন, তাদের করুণ পরিণতি বরণ করতে হবে।

রাশিয়ার এ ধরনের পরাজয়ের পর ইউক্রেনের সংগ্রাম শেষ হবে না। যদি দেশটির কার্যকর কোনো অর্থনৈতিক ভবিষ্যত্ আমরা দেখতে চাই, তাহলে ইউক্রেনের কৃষ্ণসাগর বন্দরগুলোর অর্থনৈতিক অবরোধ অবশ্যই ভাঙতে হবে। ইউক্রেনীয় বন্দরগুলো পুনরায় চালু করা এবং দেশটির অভ্যন্তরে ও বহির্দেশের সঙ্গে নিরাপদ যোগাযোগ রক্ষার দিকে ন্যাটোর মনোযোগ দিতে হবে। এর মাধ্যমে ইউক্রেনের জন্য অপরিহার্য বৃহত্ পুনর্গঠন প্রচেষ্টার যাত্রা শুরু হবে মাত্র।

তবে এখানেও সুযোগ রয়েছে। যুদ্ধের আগে ইউক্রেনের একক ও বৃহত্ দুর্বলতা ছিল এর অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অভিজাততন্ত্রের আধিপত্য। কিন্তু ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা শুরুর পর থেকেই দেশটিতে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রথম সুযোগেই অভিজাত শ্রেণির লোকজন দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। ডনবাসভিত্তিক অভিজাত শ্রেণির একজন হলেন রিনাত আখমেটভ। তার সাবেক পার্টি পূর্ব ইউক্রেনে রাশিয়ান ভাষাভাষীদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য অভিযুক্ত। তিনি তার আজভস্টাল স্টিল প্ল্যান্টে রাশিয়ার সেনাদের বোমা হামলা এবং দখলদারদের কাছ থেকে তা পুনরুদ্ধার করতেও দেখেছেন। এভাবে নতুন প্রতীক ও ক্ষমতার ভারসাম্যের মাধ্যমে ইউক্রেনের জাতীয় পরিচয়কে দৃঢ় করার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ সালের আগে বিদ্যমান দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত উত্তরাধিকারগুলোকে অতিক্রম করারও একটি বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে।

লেখক: আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও রাজনৈতিক-অর্থনীতিবিদ
আমেরিকান পারপাস ম্যাগাজিন থেকে অনুবাদ: ফাইজুল ইসলাম

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

চাকরির আবেদন ‘ফি’ বাবদ বেকারদের ‘পকেট কাটা’ কেন?

হায় রে বুড়িগঙ্গা নদী!

রনিল কি শ্রীলঙ্কার চার্চিল হতে পারবেন?

দুর্ভোগ-দুর্যোগের শহর নয়, বাসযোগ্য সুন্দর শহর চাই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

অসুখ-বিসুখ

ইউক্রেন যুদ্ধোত্তর ‘বিশ্বব্যবস্হা’ পরিকল্পনা এখনই

ভীতিটা যখন সামাজিক 

সামাজিক নিরাপত্তায় গৃহহীনদের আবাসন কর্মসূচি