শনিবার, ২১ মে ২০২২, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিষে ভরা প্রাণঘাতী পটকা মাছ

আপডেট : ১৪ মে ২০২২, ০৩:১২

প্রফেসর ড. মোস্তফা এ আর হোসেন বাংলাদেশের নদী-নালা, খালে-বিলে ৩-৪ প্রজাতির আর বঙ্গোপসাগরে ৮-১০ প্রজাতির পটকা মাছ পাওয়া যায়। ইংরেজিতে মাছগুলি পাফার ফিশ নামে পরিচিত। জাপানে জনপ্রিয় এই মাছটিকে বলা হয় ফুগু। মাছগুলির ওপরের ও নিচের চোয়ালে দুটি করে দাঁত থাকার জন্য এরা Tetraodontiformes (গ্রিক ভাষায় Tetra হচ্ছে চার আর odous হচ্ছে দাঁত) বর্গের অন্তভু‌র্ক্ত। বিশ্বব্যাপী এই বর্গের অধীনে ১০টি পরিবারে চার শতাধিক পটকা মাছ রয়েছে। প্রজাতিভেদে মাছগুলির ওজন কয়েক গ্রাম থেকে কয়েক কিলোগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। ২০১৪ সালে প্রখ্যাত ব্রিটিশ মত্স্যবিজ্ঞানী বেন বেল্টনের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম দুবলার চরের উদ্দেশ্যে।

দুবলার চর আসলে অনেকগুলি আলাদা আলাদা চর নিয়ে গঠিত—আলোরকোল, মেহেরআলী, মাঝেরকিল্লা, অফিসকিল্লা, নারকেলবাড়ী, অফিস কিল্লা, শ্যালারচর, মানিকখালি প্রভৃতি। একটা চর থেকে আরেক চরে যেতেও বেশ সময় লাগে। তো একদিন সবচেয়ে বড় যে চর—আলোরকোলে জেলেদের মাছ ধরা দেখছিলাম। হঠাত্ দেখি লম্বাটে গোলাকার বড়সড় একটা মাছ, অসম্ভব সুন্দর গায়ের রং, বর্ণবৈচিত্রে্য ভরা, একটু অচেনা মনে হলো। মনে হচ্ছিল পটকা, কিন্তু প্রজাতিটা ঠাহর করতে পারছিলাম না। বেনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বেন, ডু ইউ নো দ্য ফিশ?’ ও উত্তর দিল, ‘ইটস অভিয়াসলি এ পাফার, বাট আই ডুন্নো দ্য স্পিসিস’। মাছটি ওজনে ৫০০-৬০০ গ্রামের মতো হবে। মাছটার মুখটা খুলে দেখি একেবারে টিয়া পাখির ঠোঁটের মতো—ওপরে নিচে চারটা বড় বড় দাঁত চকচক করছিল। মাছটি সংগ্রহ করলাম। ল্যাবে নিয়ে এসে স্টাডি করে জানা গেল, মাছটি সামুদ্রিক পটকা আর আমাদের উপকূল অঞ্চলের লোকেরা বলে ‘ডোরা পটকা’। 

এর পর আমি বাংলাদেশের অসংখ্য জায়গায়—নদী-নালা, খালে-বিলে, হাওরে, পুকুরে, সুন্দরবনে, কক্সবাজারে, চট্টগ্রামে বিভিন্ন ধরনের পটকার ছবি তুলেছি। রূপ-রঙের প্রতিযোগিতায় এরা অনেক মাছকেই হারিয়ে দেবে। ২০২১ সালের জানুয়ারি। জামালগঞ্জের সাচনা বাজারের একটা শুটকি ডাঙ্গিতে, মালিকের সঙ্গে কথা বলছি। হঠাত্ দেখি ১০-১২ বছরের একটা বাচ্চা ছেলে একটা টুকরিতে ডিম নিয়ে ডাঙ্গিতে ঢুকল। ছেলেটা কাছে আসতে দেখি, আরে এ তো ডিম নয়, শ্বেত-শুভ্র পেটফুলানো পটকা মাছ। একসঙ্গে এত পটকা আমি মনে হয় আর কখনো দেখিনি। বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলেই কম-বেশি পাওয়া যায়।

খুব বেশি বড় হয় না, মাত্র কয়েক গ্রাম। সারা দেশেই পটকা বা ট্যাপা মাছ নামে পরিচিত। পটকা বিষাক্ত মাছ। এদের বসবাস মিঠাপানি থেকে শুরু করে লোনাপানি অর্থাত্ মোহনা এবং সমুদ্র। এদের অনেক প্রজাতিই ভয়ংকর বিষাক্ত। বিষের উপস্হিতি সবচেয়ে বেশি থাকে মাছের চামড়ায়, পরিপাকতন্ত্র (নাড়িভুঁড়ি), লিভার (যকৃত বা কলিজা) আর ডিম্বথলি/শুক্রাশয়ে। আর প্রজনন ঋতুতে এই মাছের শরীরে বিষের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। আমাদের দেশের জন্য এই সময়টা এপ্রিল থেকে আগস্ট। এই ভয়ংকর বিষের নাম টেট্রোডোটক্সিন। এই বিষ সোডিয়াম চ্যানেলকে অকেজো করে দেয়, ফলে সোডিয়াম ব্রেন থেকে পেশিতে মেসেজ নিয়ে যেতে পারে না। যার জন্য পটকার বিষে আক্রান্ত মানুষের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিস্তেজ হয়ে পড়ে।

এর পরের স্টেজেই বিভিন্ন পেশি প্যারালাইজড হয়ে এক পর্যায়ে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। পটকা মাছ রান্নার আগে যদি ঠিকমতো পরিষ্কার করা না হয়, মাছের শরীরের যে সমস্ত অংশে বিষের আধিক্য রয়েছে সেগুলি ফেলে দিয়ে যদি ঠিকমতো ধোয়া না হয়, যদি লিভার বা ডিম্বাশয়ের একটু অংশও থেকে যায়, তাহলে যে খাবে তার মৃতু্য মোটামুটি অবধারিত। এরপরও জাপান, কোরিয়া ও চীনে পটকা মাছ সুস্বাদু খাবার হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। জাপানে পটকা মাছের কাঁটা-বাছা ও রেসিপি তৈরির জন্য রাঁধুনীদের দীর্ঘমেয়াদি ও যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং সার্টিফিকেট থাকা বাধ্যতামূলক। এইসব সাবধানতার কারণে জাপানে পটকা মাছ খেয়ে মৃতু্যর হার প্রায় শূন্যতে নেমে এসেছে। কিন্তু এর পরেও প্রতিবছরই কিছু মানুষকে পটকা খাওয়ার পর মাইনর ফুড পয়জনিংজনিত কারণে হসপিটালে ভর্তি হতে হয়।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পটকা মাছের বিষ মারাত্মক সায়ানাইডের চেয়েও ১২০০গুণ বেশি শক্তিশালী। পটকা মাছের বিষে আক্রান্ত হলে মানুষের ঠোঁট ও জিহ্বা অবশ হয়ে পড়ে, অতিমাত্রায় বমি হয়, হূদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস বাধাগ্রস্ত হয় এবং শরীরের পেশিসমূহ ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। প্রায়শই আক্রান্ত ব্যক্তি পটকা মাছ খাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মারা যায়। মানুষের জন্য টেট্রোডোটক্সিনের প্রাণঘাতী ডোজ বা মাত্রা হচ্ছে প্রতি এক কেজি দেহ ওজনের জন্য মাত্র ০.৩৩ মিলিগ্রাম। তার মানে হচ্ছে মাত্র ২৫ মিলিগ্রাম অর্থাত্ ১ গ্রামের ৪০ ভাগের এক ভাগ টেট্রোডোটক্সিন একজন ৭৫ কেজি ওজনের মানুষের মৃতু্যর জন্য যথেষ্ট। আজ পর্যন্ত এই বিষের কোনো চিকিত্সা আবিষ্কৃত হয়নি। প্রায় প্রতিবছরই বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে, উপকূল অঞ্চলে বেশ কিছু মানুষ পটকা মাছ খেয়ে মারা যান। এই মৃতু্যর সংখ্যাটা নেহাত কম নয়। গত মার্চের ১৪ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাকে পড়েছি, পিরোজপুরের কাউখালীতে পটকা মাছ খাওয়ার পর দুইজন জেলে মারা গেছেন। হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ছিলেন আরো কয়েকজন।

অনেকেই বলেন—আমরা তো আগেও খেয়েছি, তখন তো কিছু হয়নি। সেটা তো হতেই পারে, তখন হয়তো মাছে বিষের পরিমাণ ছিল নগন্য, মাছের নাড়িভুঁড়ি, কলিজা ফেলে দেওয়া হয়েছিল, রান্নার আগে খুব ভালোভাবে পরিষ্কার করে নেওয়া হয়েছিল। যাই হোক, এই অপ্রয়োজনীয় মানব-মৃতু্য রোধে আমাদের সচেতনতা বাড়ানো দরকার। তবে কখনোই পটকা মাছ দেশ থেকে দূর করা বা বিনাশ করার কথা চিন্তা করা উচিত নয়। কারণ এই মাছ আমাদের প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই মাছ অনেক ক্ষতিকর জলজ কীটপতঙ্গ খেয়ে থাকে, আবার এই মাছকে অন্যান্য বড় মাছ খেয়ে বাঁচে। অনেক দেশেই বৈজ্ঞানিক উপায়ে পটকার বিষ সংগ্রহ করে খুবই উচ্চ মূল্যে বিক্রি করা হয়।

বিভিন্ন উন্নত দেশে কোটি কোটি টাকা মূল্যে এই বিষ আমদানি করা হয়, যা ব্যথানাশক ও অন্যান্য প্রাণঘাতী অসুখের চিকিত্সায় ব্যবহার হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ও পলিসি মেকাররা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পটকা মাছের এই দিকটার কথাও বিবেচনায় আনতে পারেন। আমরা যদি প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে পটকার বিষে মৃতু্যর সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনতে পারি, দেশের পটকা মাছের জীববৈচিত্র্য সঠিকভাবে রক্ষা করতে পারি আর দেশের দরিদ্র জেলেদের কাজে লাগিয়ে পটকা মাছের বিষ সংগ্রহ করে মানব-কল্যাণে লাগাতে পারি—তাহলে দেশে উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। বিশেষ করে ঝউ‌ে গোল ১৪ যেখানে বলা হয়েছে—‘টেকসই উন্নয়নের জন্য সাগর, মহাসাগর ও সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার’; সেটি অর্জনে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যাব।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

ইত্তেফাক/বিএএফ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

সর্বাঙ্গে ব্যথা ঔষধ দিব কোথা!

‘রেখো মা দাসেরে মনে’ 

চাকরির আবেদন ‘ফি’ বাবদ বেকারদের ‘পকেট কাটা’ কেন?

হায় রে বুড়িগঙ্গা নদী!

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ক্ষমতার ভারসাম্যের নতুন হিসাবনিকাশ

আমাদের গরিবের সুখী সংসার

গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা এবং একজন কাঙ্গাল হরিনাথ

এমন মহিরুহ যুগে যুগে জন্মায় না