বুধবার, ২৯ জুন ২০২২, ১৫ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নজর রাখিতে হইবে চারিদিকে

আপডেট : ১৮ মে ২০২২, ০৮:৫১

একসময় পৃথিবীর একটি দেশে রক্তারক্তি হইলে আরেকটি দেশের মানুষ তাৎক্ষণিক জানিতেই পারিত না। দেখা যাইত, এক দেশের মানুষ খাইয়া পড়িয়া সুখে শান্তিতে আছে, কিন্তু অন্য আরেকটি দেশ চরম দুর্ভিক্ষপীড়িত। হালাকু খান যখন বাগদাদ শহর পুড়াইয়া দেয়, তখন তাহা লইয়া ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় হেনরি অথবা দিল্লির সুলতান নাসিরউদ্দিনকে কিছু ভাবিতে হয় নাই। তাহাদের অর্থনীতিতেও ইহার প্রভাব পড়ে নাই। কিন্তু দিনে দিনে পৃথিবী যত আধুনিক হইয়াছে, একটি সহিত সঙ্গে আরেকটি দেশ তত ঘনিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছে। এখন এক দেশের প্রয়োজনে আরেক দেশ সাধ্যমতো হাত বাড়াইয়া দেয়। আবার পারস্পরিক স্বার্থে আঘাত লাগিলে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়।

এক দেশ শস্য উৎপাদন করিয়া তাহা আরেক দেশে বিক্রয় করে এবং অন্য একটি দেশ প্রযুক্তি বিক্রয় করিয়া শস্য ক্রয় করে। এমনকি এক দেশের নাগরিকের সহিত আরেক দেশের নাগরিক বিবাহবন্ধনেও আবদ্ধ হইতেছে অহরহই। অর্থাৎ জগতের সকল মানুষের মধ্যে যোগাযোগ নিবিড় হইয়াছে, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করিতে হইতেছে। আর এই নিবিড় যোগাযোগের সুফল-কুফল উভয় দিকই প্রতিটি দেশকে ভাগাভাগি করিতে হয়। সুতরাং চোখ বুজিয়া থাকিবার সুযোগ নাই। সম্প্রতি দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনায় মুদ্রাস্ফীতি ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হইতে অতি দ্রুত লাফাইয়া ২৩ শতাংশে উঠিয়াছে। দরিদ্র হার বাড়িয়াছে ৪৩ শতাংশ। ইহা দেখিয়া অন্যান্য দেশের অর্থনীতি-সংশ্লিষ্টদের সজাগ থাকিতে হইবে, যাহাতে ঐ রকম পরিস্থিতি মোকাবিলা করিতে না হয়।

অন্যদিকে যুদ্ধ এবং বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক উত্তাপের কারণে বিশ্বব্যাপী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিতেছে। আফ্রিকার দেশগুলিতে বাড়িয়াছে জঙ্গি হামলা, পাকিস্তান আফগানিস্তানে বোমা হামলার সংখ্যা বাড়িয়াছে মাত্রাতিরিক্ত। এইগুলি অবলোকন করিয়া অন্য দেশগুলির আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার সহিত সংশ্লিষ্টদের সতর্ক হইতে হইবে। ইহাও সকলের মনে রাখা দরকার যে, সাম্প্রতিক বত্সরগুলিতে কোনো দেশই ভালো নাই একের পর এক দুর্ঘটনার কারণে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে দেখা দিল কোভিড ভাইরাস। চীনের উহান হইতে ছড়াইয়া পড়িল সমগ্র বিশ্বে। বহু দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করিয়া দিল। এমনকি মানবসভ্যতার জন্যই হুমকি হইয়া দেখা দিল।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থার দেশে ১০ লক্ষ মানুষ এই রোগে মৃত্যুবরণ করিয়াছে। মানুষের মৃত্যু ছাড়াও বিশ্বের সকল দেশেই অর্থনীতিতে চরম মন্দা নামিয়া আসিয়াছে। বিশ্বব্যাপী বেকারত্ব বাড়িয়াছে, বহু বাণিজ্যিক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হইয়া গিয়াছে। বিশেষজ্ঞরা যখন জানাইয়াছেন এহেন পরিস্থিতি হইতে পরিত্রাণ মিলিতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হইতে কমপক্ষে ১০ বৎসর সময় কাটিয়া যাইবে, তখনই শুরু হইল রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ। তাহা আরো এক ধাপ বিশ্ব খাদ্যনিরাপত্তা, বাণিজ্যে, আমদানি-রপ্তানিতে চরম আঘাত করিয়া বসিল। বিশেষ করিয়া খাদ্য আমদানিকারক দেশগুলি এবং দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলির এখন নাভিশ্বাস উঠিয়াছে। কোনো কোনো দেশ এখনো খানিকটা স্থিতিশীল থাকিলেও অচিরেই যে কোনো দুর্বিপাকে পড়িতে পারে, তাহা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি বারংবার বলিয়া দিতেছে।

সুতরাং জনবহুল দেশগুলিতে অত্যন্ত সতর্ক হওয়া জরুরি। কেবল কৃচ্ছ্রসাধনই নহে, আগামী দিনগুলিতে দেশ কী করিয়া চলিবে, খাদ্যনিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা যাইবে, মুদ্রাস্ফীতি কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হইবে—এই সকল বিষয়ে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করিতে হইবে। প্রত্যেক দেশকে মনে রাখিতে হইবে, বর্তমান সময় সংকীর্ণ রাজনীতির দিকে মুখ করিয়া থাকিবার সময় নহে। যদিও সংকটের সময়েই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হইবার সম্ভাবনা অধিক থাকে, কিন্তু সকল কিছুর উপরে সংশ্লিষ্ট দেশগুলিকে অর্থনীতি বাঁচাইয়া রাখার দিকেই সর্বাধিক নজর রাখিতে হইবে। এক দেশের সহিত আরেক দেশের বৈরী ভাব কাটাইয়া আরো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়িয়া তুলিতে হইবে, যাহাতে দুর্ভোগ-দুর্দশা চরম আকার ধারণ করিলে মিলিতভাবে তাহার মোকাবিলা করা সম্ভব হয়।

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আত্মতৃপ্তি লাভ মানে যবনিকা পতন

দুখু মিয়াদের দুঃখ করিবার কারণ নাই!

প্রকৃতির প্রতি সুবিবেচনার সময় আসিয়াছে

স্বপ্ন আজ সত্য হইয়া ধরায় নামিল

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

স্বপ্ন ভাঙিয়া যায় বাস্তবতার করাঘাতে

নার্স নিয়োগ ও সেবাব্রত

গণপরিবহনের দুই রকম চিত্র কেন?

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই রক্ষাকবচ