শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২, ১৭ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি বিশ্বশান্তির অন্তরায়

আপডেট : ১৯ মে ২০২২, ০৮:৫৯

একটি দেশের সামরিক ব্যয়কে সে দেশের ‘সামরিক বোঝা’ নামে অভিহিত করা হয়। করোনা ভাইরাস মহামারির মধ্যে অর্থনীতি সংকুচিত হলেও বিশ্ব জুড়ে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশগুলো তাদের অস্ত্রাগারে অস্ত্র বাড়িয়েছে, প্রতিরক্ষা খাতে গবেষণা ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করেছে। আর এই সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি মানে দেশগুলোর অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে এর প্রভাব পড়ে থাকে। বিশেষ করে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো যখন সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি করতে থাকে তখন সে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে।

স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (এসআইপিআরআই) প্রতি বছর এপ্রিল মাসে বিশ্বের সামরিক ব্যয় সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ‘TRENDS IN WORLD MILITARY EXPENDITURE’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। এ বছরের ২৫ এপ্রিলও প্রকাশ করেছে ২০২১ সালের সামরিক ব্যয় সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি। সেখানে দেখা গেছে, একুশ সালে প্রকৃত অর্থে সামরিক ব্যয় ০.৭ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ১১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাত্, প্রথমবারের মতো বিশ্বে সামরিক ব্যয় ২ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। ২০২১ সালের বিশ্বে মোট সামরিক ব্যয় বিশ্বের মোট জিডিপির ২.২ শতাংশ। ২০২১ সালে পাঁচটি বৃহত্তম সামরিক ব্যয়কারী দেশ হলো— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, যুক্তরাজ্য এবং রাশিয়া; শুধু এই পাঁচটি দেশের মোট সামরিক ব্যয় বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের ৬২ শতাংশ।

২০২১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একাই ব্যয় করেছে ৮০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের ৩৮ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র গত ১০ বছরে তাদের সামরিক ব্যয় ২৪ শতাংশ বাড়িয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে চীন, তাদের মোট ব্যয় ছিল ২৯৩ বিলিয়ন ডলার, যা মোট সামরিক ব্যয়ের ১৪ শতাংশ এবং গত বছরের থেকে ৪.৭ শতাংশ বেশি। চীন গত ২৭ বছরে ধারাবাহিকভাবে তাদের সামরিক ব্যয় বাড়িয়েই চলেছে। ভারতের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে ৭৬.৬ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে; যা তাদের ২০১২ সালের তুলনায় ৩৩ গুণ বেশি। রাশিয়ার সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে ৬৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যেটা তাদের জিডিপির ৪.১ শতাংশ। এদিকে ন্যাটোও তাদের মোট জিডিপির ২ শতাংশ বা তার বেশি সামরিক ব্যয়ের লক্ষ্য অর্জন করেছে। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যভাবে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি করার মধ্যে আছে জাপান ৭.৩ শতাংশ, নাইজেরিয়া ৫৬ শতাংশ, ইরান ১৪ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়া ৪ শতাংশ। নাইজেরিয়াতে সামরিক ব্যয় এত বৃদ্ধির কারণ মূলত তাদের দেশে চরম সহিংসতা, চরমপন্থা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহের মতো অসংখ্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের প্রতিক্রিয়া হিসেবে। ইউক্রেন ২০২১ সালে সামরিক ব্যয় কমিয়ে দিলেও ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করার পর ইউক্রেনের সামরিক ব্যয় বেড়েছে ৭২ শতাংশ।

বিশ্বের দেশগুলো ২০২১ সালে বিগত বছরের তুলনায় গড়ে তাদের মোট বাজেটের প্রায় ৬ শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয় করেছে। ২০২১ সালে বিশ্বের মাত্র ১৫টি দেশের সামরিক ব্যয় ১৭১৭ বিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয়ের ৮১ শতাংশ। অর্থাত্ এই ১৫টি দেশ এবং তাদের ভিন্ন ভিন্ন মিত্র রাষ্ট্রগুলো যে কোনো সময় বিশ্বের উত্তেজনা বৃদ্ধি করে সবকিছু থমকে দিতে পারে। বিভিন্ন দেশের নিয়মিত বড় আকারে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি বিশ্বের অন্যান্য দেশের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধিতেও প্রভাব ফেলে। তাই এই সামরিক ব্যয় থেকে বোঝা যায় যে, বিশ্বশান্তি কতটা দূরে? বিশ্বের দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা যার যেমনই থাকুক না কেন, প্রত্যেকটি দেশ প্রতি বছর তাদের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি করে যুদ্ধের জন্য নিজেদের স্বয়ংসম্পূর্ণ করে গড়ে তুলছে। সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির এহেন কর্মকাণ্ড কখনই বিশ্বশান্তির সম্ভাবনা বয়ে আনতে পারে না, বরং সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি বিশ্বশান্তির জন্য হুমকিস্বরূপ।

মুক্তবাজার অর্থনীতির জনক অ্যাডাম স্মিথ সমাজের প্রতিরক্ষাকে সরকারের প্রাথমিক কাজগুলোর মধ্যে একটি এবং যুক্তিসঙ্গত হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন এবং নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সামরিক ব্যয়ের পেছনে যৌক্তিকতা দিলেও সে ব্যয়টা সে দেশের জিডিপির কত শতাংশ পর্যন্ত হবে কিংবা জাতীয় বাজেটে সে ব্যয়টা কী পরিমাণ ধরা হবে যাতে দেশের মানুষের জরুরি প্রয়োজনীয় খাতের বাজেটে এসবের প্রভাব না পড়ে, এসবের সঠিক কোন নির্দেশনা দেননি। এটাই মানবতার জন্য হুমকির সংকেত। কেননা, প্রতিরক্ষায় ব্যয় করা প্রতিটি অর্থ এমন একটি অর্থ যা অন্য সরকারি পরিষেবাগুলোতে ব্যয় করা হয় না। অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশে সাধারণ মানুষের জীবনে এই সামরিক ব্যয় একটা বড় বোঝা; যা প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক শক্তির মাঠে নিজেকে ‘প্রস্তুত’ পরিচয় দিতে গিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু খাতের বাজেটে এই সামরিক ব্যয়ের প্রভাব পড়ছে।

অনু্ন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংকট এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক ব্যয়ের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে সামরিক খাতে ব্যয় কমিয়ে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারত তবে পৃথিবীর অনেক সামাজিক সমস্যাই যেমন কমে যেত, তেমনি বিশ্বশান্তির পথটাও হয়তো আরো একটু সুগম হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শিক্ষাগুরুর মর্যাদা

পানিতে ডুবে অকালমৃত্যু রোধে সচেতনতা

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন দ্বার

সম্ভাবনাময় শিল্প ‘রিসাইক্লিং’

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আমাদের পর্যটনশিল্প

ব্লু- ইকোনমি: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

বন্যা হ্রাসে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ

পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের গুরুত্ব