শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শহরগুলোতে খেলার মাঠ সংরক্ষণ জরুরি

আপডেট : ১৯ মে ২০২২, ০৯:০৪

ছোট্ট একটা মানুষ। যে বয়সে পড়াশোনা হতে পারত খেলাধুলার অংশ, সে বয়সেই বই-খাতা ভরা ভারী ব্যাগ নিয়ে যেতে হয় স্কুলে। পড়তে হয় কঠিন সব ইংরেজি আর কষতে হয় জটিল সব অঙ্ক। স্কুল শেষে কোচিং, গানের ক্লাস, নাচের ক্লাস, আবৃত্তি ক্লাস আবার কখনো বা ড্রয়িং ক্লাস। এভাবেই চার দেওয়ালের মধ্যে এক অলিখিত যান্ত্রিক রুটিনে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে আমাদের শহুরে শিশুদের শৈশব।

নজরুলের বিখ্যাত সেই সংকল্প কবিতার মতো বদ্ধ ঘর থেকে বেরিয়ে পৃথিবীকে জানার কৌতূহল তো প্রতিটি কিশোরেরই। চিরকৌতূহলী শিশু-কিশোরেরা ছুটে চলতে চায় দিক হতে দিগন্তে। জানতে চায় অজানাকে, জয় করতে চায় অজয়কে। তাদের মন কখনোই চার দেওয়ালের বদ্ধ ঘরে আটকে থাকতে চায় না। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে এসে আমাদের বর্তমান নগর-মহানগরগুলোয় শিশু-কিশোরদের মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গাগুলো অনেক সংকুচিত হয়ে এসেছে। রাজধানী ঢাকার প্রায় প্রতিটি স্থানেই সবুজ মাড়িয়ে গড়ে উঠছে কংক্রিটের বহুতল ভবন, কমে যাচ্ছে বিস্তৃত খোলা জায়গার পরিমাণ। যে কারণে শহুরে শিশু-কিশোরদের একরকম বাধ্য হয়েই রাস্তার অলিতেগলিতে খেলার সুযোগ খুঁজতে হয়। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ঢাকার ব্যস্ত সড়কে জ্যামের মধ্যে একটু খালি জায়গা পেয়েই কয়েক জন ব্যাট-বল হাতে নিয়ে ক্রিকেট খেলায় মেতে ওঠে; যা ঢাকায় পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকারই বহিঃপ্রকাশ। আজকাল রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত মফস্বল শহরে পর্যন্ত খেলার মাঠগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। সেই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে মাঠগুলোকে জড়িয়ে থাকা উচ্ছল শৈশব ও তারুণ্যের উদ্যম।

তবে এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, সুস্থ দেহ ও সুন্দর মনের জন্য খেলাধুলা আবশ্যক। খেলাধুলা শিশু-কিশোরদের মধ্যে কর্মে উৎসাহ আনে, মনে আনন্দ দেয় ও দেহে সজীবতার সঞ্চার ঘটায়। পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি নিয়মিত খেলাধুলার ফলে শরীরে রোগপ্রতিরোধের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া প্রকৃতির উন্মুক্ত প্রান্তরে খোলা আকাশের নিচে যে খেলাগুলো হয়, সেগুলো শিশু-কিশোরদের অধ্যবসায়ী ও শৃঙ্খলাবদ্ধ হতেও সাহায্য করে।

নতুন প্রজন্মের মধ্যে দলবদ্ধভাবে কাজ করার মানসিকতা, নেতৃত্ব প্রদান, সহানুভূতি ও সহমর্মিতা বোধ সৃষ্টিতে খেলাধুলা আবশ্যক। এসব মানবিক মূল্যবোধ একজন প্রকৃত নাগরিকের একান্ত প্রয়োজন। তাছাড়া প্রত্যেকটা মানুষের জীবনেই সাফল্য, ব্যর্থতা, রাগ, অভিমান থাকে। আর খেলাধুলায় হার-জিত, সাফল্য-ব্যর্থতা তো অবশ্যম্ভাবী। হোঁচট খেয়ে পড়ে যাওয়ার পরও যে ঘুরে দাঁড়ানো যায় তা শেখা যায় প্রতিযোগিতামূলক খেলাধুলার মাধ্যমেই।

খেলায় একপক্ষ জয়লাভ করে তো অন্য পক্ষ পরাজিত হয়। এই জয় ও পরাজয়গুলো ব্যক্তিজীবনে সহজভাবে গ্রহণ করার জন্যও শৈশবের এই খেলাধুলার অবদান অপরিসীম। তাছাড়া খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুরা প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলার মাধ্যমে চাপ নেওয়া ও কঠিন সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার শিক্ষাটাও পায় খেলাধুলার মাধ্যমেই।

বস্তুত শৈশবে খেলাধুলাকে বর্জন করা অথবা খেলাধুলার সুযোগ না পাওয়ার অর্থ জীবন অসার ও নীরস হয়ে পড়া। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশু তার আত্মকেন্দ্রিক জগৎ থেকে বের হয়ে ক্রমেই সামাজিক হয়ে ওঠে। তাদের মানসিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নৈতিকতার বিকাশও ঘটতে থাকে খেলাধুলার মাধ্যমে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ ও দূষণসহ নানা কারণে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোয় ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠছে খোলা জায়গা ও খেলার মাঠের পরিমাণ। শহরে যেটুকু খেলার মাঠ আছে তাও আবার বড়দের দখলে চলে যায়। অপেক্ষাকৃত কম বয়সি বাচ্চারা সেখানে খেলার যথেষ্ট সুযোগ পায় না। আর যারা পায় তাদের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, একই মাঠে বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে খেলতে গিয়ে বাধে বিপত্তি।

এহেন পরিস্থিতিতে কোমলমতি শিশুরা মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, তৈরি হচ্ছে অসহিষ্ণু মনোভাব। হতাশা, বিষণ্নতা, অবসাদ ও খিটখিটে মেজাজ নিত্য সঙ্গী হয়ে যাচ্ছে তাদের। পাশাপাশি বাড়ছে সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর গেমস ও অ্যাপসের প্রতি তাদের আসক্তি। তাছাড়া অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় কিশোর অপরাধের মাত্রাও বেড়েছে অনেক বেশি। এমন অবস্থায় শিশুদের জন্য খেলার মাঠ সংরক্ষণ জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রত্যেকটা ওয়ার্ডে এখনো যে পরিমাণ খোলা জায়গা অবশিষ্ট রয়েছে তা সংরক্ষণ করা উচিত। তাছাড়া অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকা মাঠের দিকে নজর দিয়ে সেগুলোকে খেলাধুলার উপযোগী করাও আশু জরুরি। সম্ভব হলে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে হলেও শিশুদের জন্য খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন ।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের গুরুত্ব

জলাবদ্ধতা ও আমাদের দায়

দুর্যোগ-হুঁশিয়ারি এবং জলবায়ু সচেতনতা

লোকসংগীতের শেকড় হারানো যাবে না

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

হলগুলোতে সিট-বাণিজ্যের অপসংস্কৃতি বন্ধ হোক

পরিবেশ রক্ষা ও প্রাণবন্ত অর্থনীতি

সুনীল অর্থনীতির অপার সম্ভাবনা

উপকূল রক্ষার্থে বনের গুরুত্ব