শনিবার, ০২ জুলাই ২০২২, ১৮ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ক্ষমতার ভারসাম্যের নতুন হিসাবনিকাশ

আপডেট : ২১ মে ২০২২, ০৪:৩০

রাশিয়া যাকে ‘ক্ষমতার সমতা’ বলে অভিহিত করে থাকে তার দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখতে পাওয়া যায়, বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার ভারসাম্যে (ব্যালেন্স অব পাওয়ার) একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় মিত্ররা শক্তিশালী হয়েছে, অন্যদিকে রাশিয়া শক্তি হারিয়েছে। এই দাবির পক্ষে যুক্তিও বেশ পরিষ্কার। ইউক্রেনে অপরিণামদর্শী আক্রমণের ফলে রাশিয়া ক্রমশ শক্তি হারাচ্ছে। এ যুদ্ধ যেভাবেই শেষ হোক না কেন, রাশিয়া অপেক্ষাকৃত ছোট প্রতিবেশী দেশকে পরাজিত করতেই হিমশিম খাচ্ছে—বাস্তবতা এটাই। পক্ষান্তরে, আমেরিকা এবং তার মিত্ররা বিগত সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ। উপরন্তু, ফিনল্যান্ড এবং সুইডেন ন্যাটোতে যোগ দিলে এ জোট উল্লেখযোগ্যভাবে আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

চলতি মাসে ‘গ্র্যান্ড স্ট্রাটেজির মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে খ্যাত হেনরি কিসিঞ্জার ফাইনান্সিয়াল টাইমসের এক ফোরামে ঘোষণা করেছেন, ‘আমরা এখন একটি সম্পূর্ণ নতুন যুগে বাস করছি।’ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এ পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার ঘোষণায় বলেছেন যে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি বড় অভিযানকে সফলতায় রূপ দিতে ‘রাশিয়ার সক্ষমতাকে ঠিকভাবে গণনা করতে’ স্পষ্টতই ব্যর্থ হয়েছেন...এবং এখন মীমাংসার ক্ষেত্রে...আমরা আগের সম্পর্কে ফিরে যেতে চাইছি না, তবে এমন একটা অবস্হানে যাওয়ার চেষ্টা করছি, যা রাশিয়ার জন্য ভিন্ন হবে। বিষয়টার সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছা জড়িত নয় কিংবা এ পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য রাশিয়া দায়ী—সেজন্যও নয়।

রাশিয়ার সেনাবাহিনী যেভাবে হোঁচট খেল, এমন পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষদের কী করা উচিত? যুদ্ধের নিষ্ঠুর যুক্তি এটা বলে যে, যুদ্ধে এগিয়ে থাকা বাহিনীর উচিত হচ্ছে দ্রুত তাদের লক্ষ্য হাসিল করা এবং নতুন কৌশলগত অবস্হানের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সর্বোচ্চ ফায়দা তোলা।

সামরিক ইতিহাসবিদ রিক অ্যাটকিনসন ‘সুযোগকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে’ ব্যর্থতার একটি লম্বা তালিকা তুলে ধরেছেন। যেমন—ইউনিয়ন জেনারেল জর্জ মিড গেটিসবার্গে জয়লাভ করেছেন বটে; তবে তিনি কনফেডারেটদের থেকে সুযোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। ১৯৯১ সালে পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য সাফল্য সত্ত্বেও সুযোগকে বেহাত করার ঘটনা ঘটেছিল। ব্রিটিশ জেনারেল উইলিয়াম হাউ বেশ কয়েক বার ওয়াশিংটনের কন্টিনেন্টাল আর্মিকে ধ্বংস করার সুযোগ হাতছাড়া করেন। অ্যাটকিনসন ইউরোপের যুদ্ধের হিসাব কষেছেন এভাবে—‘তিন মাসেরও কম সময়ে কৌশলগত ল্যান্ডস্কেপ (কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ ভূভাগ) ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। উদার গণতন্ত্রের শক্তিশালী জোটে মার্কিন নেতৃত্বের পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে রুশ সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষার অবসান ঘটিয়ে সামরিক জোট ন্যাটো উদ্দীপিত হয়েছে, যা ‘মৃতপ্রায়’ হয়ে পড়েছিল।

ছবি: সংগৃহীত

ইতিহাস ‘মুহূর্ত’কে ধরে রাখার গুরুত্বের শিক্ষা দেয়। তবে কট্টর বাস্তবপম্হি কিসিঞ্জারের পরামর্শ হলো, বাইডেন প্রশাসনকে ইউক্রেনের বিষয়ে বেশি নাক গলানো ঠিক হবে না। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে রাশিয়ার মরিয়া প্রচেষ্টার কারণে অথবা ইউরেশিয়া জুড়ে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে রাশিয়ার খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে পুতিনের পরাজয় সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এই মুহূর্তে বিশ্ব পুনর্ভারসাম্যের মধ্যে রয়েছে। এই অবস্হায় যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থকে সব দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ইউরোপের কথাই যদি ধরা হয়, জার্মানির মতো ইউরোপীয় দেশগুলোর বাড়তি সামরিক শক্তি ন্যাটোতে যুক্ত হওয়ার ফলে এর শক্তিবলয় পূর্ব দিকে সম্প্রসারিত হবে। সুইডেন এবং ফিনল্যান্ড জোটে যোগদানের কারণে আর্কটিকের নতুন কৌশলগত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে উত্তরে ন্যাটোর প্রভাব বাড়বে। ইউরোপিয়ান ইউক্রেনীয়রা রাশিয়া এবং তার অবশিষ্ট স্যাটেলাইটগুলোকে পশ্চিমের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কার্যকরী প্রথম পদক্ষেপ হবে, রুশ বাহিনীর দখলে নেই ইউক্রেনের এমন অঞ্চলসমূহকে দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্ত করা।

সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা টম ডনিলন বলেছেন, “পুতিন রাশিয়ার ‘শক্তির নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী’ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত খ্যাতিকে ধ্বংস করেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ‘এনার্জি ইকোসিস্টেমকে (শক্তি বাস্ত্ততন্ত্র)’ নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।”

পুতিনের ভুলগুলো রাশিয়ার প্রধান মিত্র চীনকেও বেশ ভোগাবে। ফেব্র‚য়ারির শুরুতে বেইজিং অলিম্পিকে একটি যৌথ বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং পুতিন তাদের বন্ধুত্বের ‘কোনো সীমানা নেই’ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। সে সময় ইউক্রেন আক্রমণে পুতিনের অপরিণামদর্শিতার বিষয়টি আন্দাজ করতে পারেনি চীন। তবে, পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার প্রতি মৃদু সমর্থন বজায় রেখেছে দেশটি। অর্থাৎ, একটি হালকা বিভক্তি দৃশ্যমান হয়েছে (যদিও চীনের সমর্থন রাশিয়ার পক্ষে)। কিসিঞ্জার রাশিয়া এবং চীনের ব্যাপারে একটি সূক্ষ্ম বিভক্তির রেখা অঙ্কন করেছিলেন। কিসিঞ্জারের জীবনী ‘মাস্টার অব দ্য গেম’-এর লেখক মার্টিন ইন্ডিক আমাকে বলেছেন, বিভক্তির প্রশ্নে এখনো সুযোগ রয়েছে।

রাশিয়া এবং চীন উভয়ের পশ্চাত্পদতার বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ায় তার নিজস্ব কৌশলগত অংশীদারিত্বের ওপর জোর দিচ্ছে। রাষ্ট্রপতি বাইডেন ২৪ মে জাপানে কোয়াড সদস্য—ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে মিলিত হবেন। গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে প্রধান অংশীদার ইন্দোনেশিয়া এবং ভিয়েতনামসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছেন বাইডেন। এ সময় তিনি ঘোষণা করেছেন, “এই অঞ্চলের জন্য এটি একটি ‘নতুন যুগ’।”

ডোনিলন ‘গুরুত্বপূর্ণ তৃতীয় শক্তি’ যেমন—ভারত, সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্র, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ব্রাজিলের কথা বলেছেন, যেখানে ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচুর সুযোগ রয়েছে।’

লাতিন আমেরিকা হচ্ছে আরেকটি অঞ্চল যেখানে ইউক্রেনে সাফল্যের জোয়ারকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ব্রাজিল এই অঞ্চলের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ, একটি বড় অংশীদার। এমনকি তেল উত্পাদনের প্রশ্নে রাশিয়া ও কিউবার বিকল্প হিসেবে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক মজবুত করার একটি যুগান্তকারী সুযোগ সামনে এসেছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বকে একটি অনিবার্য সত্যের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। আমেরিকার সামরিক শক্তি, গোয়েন্দা আধিপত্য এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব অপ্রতিরোধ্যভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। যদিও ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন এখনো প্রক্রিয়াধীন। তবে, বিশ্ব পরিস্থিতি গত ২৪ ফেব্র‚য়ারির আগের থেকে এখন বেশ ভিন্ন। আপাতত আমেরিকা এগিয়ে রয়েছে।

লেখক: মার্কিন সাংবাদিক।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে ভাষান্তর :সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/বিএএফ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

‘বুঝিবে সে কীসে, দংশেনি যারে’

আইনের চোখে ‘নগরবধূ’ 

পদ্মা সেতু ও কৃষি অর্থনীতি

ফুটপাতের খাবার আশীর্বাদ না অভিশাপ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ছাত্রের হাতে শিক্ষক হত্যাও দেখতে হলো!

শি-র নতুন করে হংকং সাজানোর পরিকল্পনা কতটা বাস্তবতার মুখ দেখবে?

স্বপ্ন পূরণে বাস্তবতার নির্ণয় 

মানুষকে অনাহারে রেখে গাড়ির আহার!