সোমবার, ২৭ জুন ২০২২, ১২ আষাঢ় ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

যে কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের মাসিক বেতন ১৭৯ টাকা

আপডেট : ২৩ মে ২০২২, ০৩:০৩

একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষের মূল বেতন ৪৩ হাজার টাকা। এর সঙ্গে আরো কিছু সুযোগ-সুবিধা আছে। কলেজের আর্থিক সামর্থ্য থাকলে বাড়িভাড়াও দেওয়া হয় কলেজ থেকে। সব মিলে ৭৫ হাজার টাকার বেশি পান অধ্যক্ষ। আবার দেশের অনেক কলেজ আছে যেখানে অধ্যক্ষ বেতন পান লাখ টাকারও বেশি। অবাক করার মতো খবর, দেশে এমন বেসরকারি কলেজও আছে যেখানে অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের মাসিক বেতন ১৭৯ টাকা ৪৫ পয়সা। সেই বেতন আবার প্রতি মাসে নয়, পান বছর শেষে। প্রতি বছর একবার এসব শিক্ষকের ১২ মাসের বেতন পরিশোধ করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর। এই কলেজগুলোর নাম সংস্কৃত, পালি টোল, চতুষ্পঠি কলেজ। তিন বছরের  ডিপ্লোমা ডিগ্রি দেওয়া হয় এখান থেকে। প্রতি বছর ১৯ হাজার শিক্ষার্থী এ কলেজ থেকে সনদ অর্জন করেন।

বাংলাদেশে এমন কলেজ আছে ২৩৭টি। প্রতি কলেজে অধ্যক্ষসহ তিন জন শিক্ষক আছেন। সে হিসেবে শিক্ষক সংখ্যা ৭০০-এর সামান্য বেশি। নামমাত্র বেতন-ভাতা না থাকায় শিক্ষকরা এ পেশা ছাড়ছেন। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কলেজগুলো। একমাত্র পেশা ও এই শিক্ষার প্রতি ভালোবাসার টানে জমি বিক্রি করে বা অন্য আয় থেকে কলেজগুলো টিকিয়ে রাখছেন কোনো কোনো শিক্ষক।

এই কলেজগুলো সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হয়। এসএসসি উৎতীর্ণ শিক্ষার্থীদের এসব কলেজে কাব্যতীর্থ, ব্যাকরণতীর্থ, আয়ুর্বেদতীর্থ, পুরাণ, জ্যোতিঃশাস্ত্র, স্মৃতি, বেদ ও বেদান্ত বিষয়ে তিন বছরের ডিপ্লোমা কোর্স করানো হয়। এখানে পড়ে পণ্ডিত, জ্যোতিষিসহ বিভিন্ন খেতাব অর্জন করা যায়। সাধারণ হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাই এই প্রতিষ্ঠানে পড়ে। তবে কোথাও কোথাও মুসলিম শিক্ষার্থীও রয়েছে। কলেজটি পরিচালনার জন্য একটি গভর্নিং বডিও রয়েছে।

ঢাকার সামীবাগে রয়েছে আর্য সংস্কৃত কলেজ। কলেজে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছেন। আর শিক্ষক আছেন তিন জন। তিন জন মিলে মাসে বেতন পান ৫৩৮ টাকা ৩৫ পয়সা। আর কোনো বরাদ্দ নেই। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নানা ধরনের খরচ আছে। সংস্কার, আনুষঙ্গিক কেনাকাটা। প্রতি মাসে ৯ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে কয়েকটি কক্ষ ভাড়া নিয়েছেন অধ্যক্ষ। কলেজটির অধ্যক্ষ দেবাশিস সাহা বলেন, ব্যক্তিগত টাকা থেকে এ খরচ করি। এই শিক্ষার প্রতি ভালোবাসার টানে। আমরা এই শিক্ষাকে ধরে রাখতে জীবন উৎসর্গ করে যাচ্ছি।

বাংলাদেশ সংস্কৃত ও পালি শিক্ষক সমিতির সদস্যসচিবেরও দায়িত্ব পালন করছেন দেবাশিস সাহা। তিনি বলেন, ১৯৭৭ সালে যখন বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তারা ১১৫ টাকা বেতন পেতেন, সংস্কৃত, পালি টোল, চতুষ্পঠি কলেজের শিক্ষকরা তখনই একই হারে বেতন পেতেন। সময়ের পরিক্রমায় সংস্কৃত, পালি টোল, চতুষ্পঠি কলেজের শিক্ষকরা এখন ১৭৯ টাকা ৪৫। বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তারা লাখ টাকার বেশি বেতন-ভাতা পান। শিক্ষকরা জানান, পৃথিবীর কোনো দেশেই শিক্ষকদের মাত্র ১৭৯ টাকা ভাতা নেই। অসাম্প্রদায়িক এই দেশে বিভিন্ন ধর্মের শিক্ষক ভিন্ন ভিন্ন বেতন গ্রহণ করতে পারে না। সব ধর্মীয় শিক্ষক ও শিক্ষাব্যবস্থায় সরকারের এক নৈতিক চিন্তা থাকা আবশ্যক। সংস্কৃত, পালি টোল, চতুষ্পঠি কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন স্কেল প্রদান ও মাসিক ভাতা বৃদ্ধির জন্য তিন বার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৪ সালে। দ্বিতীয়বার ২০১৭ সালে। আর তৃতীয়বার ২০২০ সালে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো এ সংক্রান্ত চিঠিতে বলা হয়, পালি টোল, চতুষ্পঠি কলেজ শিক্ষকদের বেতন কাঠামোর আওতায় আনার সুযোগ আছে কিনা সে বিষয়ে শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে জানতে চায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নীতিমালা যাচাই করে সংস্কৃত ও পালি, টোল শিক্ষকদের বেতন কাঠামোর আওতায় আনার বিষয়ে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে পাঠাতে বলা হয় শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে। সে আলোকে রিপোর্টও পাঠানো হয় মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু এই ফাইল আর এগোয় না। এতে ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা। তবে যাই পান না কেন, তবুও আমৃতু্য এই পেশা ধরে রাখতে চান তারা। 

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বিশেষ সংবাদ

প্রাইভেট টিউশনি কোচিং-নির্ভরতা বাড়বে

বিশেষ সংবাদ

উঠে যাচ্ছে সৃজনশীল পদ্ধতি

বিশেষ সংবাদ

সৃজনশীলে এখনো ভয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের

বিশেষ সংবাদ

পাঁচ বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি ইউজিসির সিদ্ধান্ত

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

রাবিতে ভর্তি পদ্ধতির ‘স্থিতিশীল কাঠামো’ তৈরি হয়নি!

বিশেষ সংবাদ

জবিছাত্রী অঙ্কনের মৃত্যু নিয়ে ধূম্রজাল

বিশেষ সংবাদ

রাজধানীর বিভিন্ন বেসরকারি স্কুল-কলেজে অনিয়ম-দুর্নীতি!

ঢাকা কলেজের সব ক্লাস-পরীক্ষা ‘স্থগিত’