ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে দূর হোক অব্যবস্থাপনা 

আপডেট : ২৬ মে ২০২২, ০২:০৮

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় ভোগান্তি বেড়েছে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের। গুটি কয়েক ব্যবসায়ী অতিরিক্ত লাভের আশায় বাজারে তৈরি করেছে কৃত্রিম সংকট। বিশেষ করে চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজসহ বেশির ভাগ দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। মাঠ পর্যায় থেকে এসব পণ্যের দাম তুলনামূলক না বাড়লেও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে হু-হু করে বাড়ছে এসব পণ্যের দাম। প্রতি বছরই এসব মুনাফালোভী অতিরিক্ত খাদ্য মজুত করায় এমন সংকট দেখা দেয়। 

দেশের অধিকাংশ নিম্ন আয়ের মানুষ আয়রোজগারের বেশির ভাগ টাকা ব্যয় করে খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতে। কিন্তু এসব মানুষের কর্মস্হল কিংবা মজুরির মূল্য আগের তুলনায় না বাড়ায় জীবন বাঁচাতে অতিরিক্ত দামে বাধ্য হয়ে এসব খাদ্যপণ্য ক্রয় করতে হচ্ছে তাদের। এর ফলে বর্তমান সরকার ১ কোটি মানুষের মধ্যে সাশ্রয়ী মূল্যে কয়েকটি পণ্য বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ফ্যামিলি কার্ডের উদ্যোগ নিয়েছে। এই নির্দেশনায় সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে টিসিবির কিছু পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে বিক্রির লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ড প্রস্তুত করে গত ২০ মার্চ উদ্বোধন করা হয়েছে। ঢাকা ও বরিশাল বিভাগে ফ্যামিলি কার্ড তৈরিতে কিছুটা জটিলতা থাকায় এই দুই বিভাগে এখনো আগের নিয়মেই, অর্থাৎ ট্রাকসেলের মাধ্যমে টিসিবির পণ্য বিক্রয় চলমান রয়েছে।

সরকারের এই মহৎ উদ্যোগের ফলে দেশে প্রায় ৫ কোটি মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারবে। বলা হয়েছে, করোনাকালীন যারা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অনলাইনে মোবাইলের মাধ্যমে আড়াই হাজার টাকা করে প্রণোদনা পেয়েছিল, তাদের মধ্যে ৩০ লাখ পরিবার এই ফ্যামিলি কার্ড পাবে। বাকি পরিবারগুলো নতুন করে নির্ধারণ করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের ওপর। কিন্তু দেখা গেছে, বেশির ভাগ জায়গায় প্রশাসনের সংশ্লিষ্টতা কম থাকায় এই তালিকা প্রণয়ন করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। এর ফলে দেখা দিয়েছে অনিয়ম, দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি। ইতিমধ্যে দেশের বেশ কিছু জায়গায় পত্র-পত্রিকায় নির্বাচিত এসব জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। তারা দুর্নীতি করে তাদের নির্বাচনে পক্ষে ছিল কিংবা তাদের দল করেছে এমন পরিবার যারা পাওয়ার যোগ্য নয়, অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত সচ্ছল পরিবার তাদের এই ফ্যামিলি কার্ডে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে দেখা দিয়েছে চরম ক্ষোভ আর বিশৃঙ্খলা। সরকারের নেওয়া এমন মহৎ উদ্যোগকে তারা বিতর্কিত করে ফেলেছে। ইতিমধ্যে যেহেতু ট্রাকসেলে বিসিবির পণ্য বিক্রয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, এজন্য অবশ্যই সরকারকে এ বিষয়ে আরো বেশি নজর রাখতে হবে, তা না হলে গুটি কয়েক দুর্নীতিবাজ জনপ্রতিনিধির কারণে সরকারের এমন মহৎ উদ্যোগ বিফলে যাবে।

সেক্ষেত্রে অবশ্যই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গাটিতে সরকারকে আরো বেশি সুদৃষ্টি দিতে হবে। যেসব অঞ্চলে এসব দুর্নীতিবাজ প্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে এসব কাজে সংযুক্ত করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে দেখা যাবে প্রকৃত পাওয়ার যোগ্য মানুষ সরকারের দেওয়া এসব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাছাড়া সরকার ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যের এই ব্যবস্থা সারা বছর অব্যাহত রাখতে পারলে নিত্যপণ্যের বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। অসাধু কোনো ডিলার যেন এ ক্ষেত্রে নিয়োগ না পায়, সেটিও নিশ্চিত করতে সরকারকে সুদৃষ্টি রাখতে হবে। যদিও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে, ফ্যামিলি কার্ড তৈরিতে বা বিতরণে অনিয়ম হলে তা অবশ্যই খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরাও আশা রাখছি, অসহায়, হতদরিদ্র মানুষের কথা বিবেচনা করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি থেকে দূরে থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেওয়া এই বিরাট উদ্যোগে তারা অবশ্যই সহযোদ্ধা হিসেবে কাজ করবেন। এছাড়া টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি নিত্যপণ্যের বাজারেও দাম স্বাভাবিক রাখতে সরকারের মনিটরিং কমিটি যথাযথভাবে কাজ করবে এমন প্রত্যাশাই রইল।

লেখক :শিক্ষার্থী, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা

ইত্তেফাক/ ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন