জন্মনিরোধক ব্যবহারে অনীহায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে বাড়ছে মাতৃ ও শিশুমৃত্যু: গবেষণা 

আপডেট : ২৮ মে ২০২২, ১৮:১০

শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মধ্যে কনডম ব্যবহারের আগ্রহ একেবারেই কম। এখানকার মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ পুরুষ কনডম ব্যবহার করেন। যদিও রোহিঙ্গাদের ৭৫ শতাংশ দম্পতি কনডমের ব্যাপারে ধারণা রাখেন। কনডম ব্যবহার না করে স্বাস্থ্যকর্মীদের বিতরণ করা অন্যান্য জন্মনিরোধক ব্যবহারে তুমুল হারে বাড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, বাড়ছে জনসংখ্যা, ফলে সৃষ্টি হচ্ছে নানা ধরণের সংকট। 

সম্প্রতি (২০ মে) বিশ্ববিখ্যাত গবেষণা জার্নাল দ্যা ল্যান্সেট রিজিওনাল হেলথ - সাউথইস্ট এশিয়া থেকে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে এ তথ্য উঠে আসে। অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির অর্থায়নে গবেষণাটি করেছেন লা ট্রোব ইউনিভার্সিটির পাবলিক হেলথ বিভাগের শিক্ষক এম মফিজুল ইসলাম, বাংলাদেশের কক্সবাজারের ফ্রিল্যান্স গবেষক মো. মশিউর রহমান ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের শিক্ষক ড. মো. নুরুজ্জামান খান। 

গবেষণায় আরো জানা যায়, রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ নারী ও পুরুষ জন্মনিরোধক হিসেবে কনডমের নাম শুনলেও মাত্র ২০ দশমিক ৮ শতাংশ দম্পতি একবার কনডম ব্যবহার করেছেন। তবে মাত্র ৮ দশমিক ৩ ভাগ মানুষ নিয়মিত এটি ব্যবহার করে থাকেন। 

এই বিশাল জনগোষ্ঠীর লোকেদের মধ্যে কনডম ব্যবহারের অনীহার কারণ হিসেবে গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে বেশ কটি কারণ। যেমন - সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাঁধা, কনডম ব্যবহারের ক্ষেত্রে বদ্ধমূল ভুল ধারণা, নারীদের অধিকাংশেরই কনডম সম্পর্কে ধারণা না থাকা, রোহিঙ্গা শিবিরে কনডম সরবরাহের মাত্রা কম থাকা এবং দাম্পত্য জীবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখা। 

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাঁধার কথা তুলে ধরতে গিয়ে গবেষকেরা রোহিঙ্গা শিবিরের বেশ কজনের উদ্ধৃতি তুলে ধরেছেন। দেখা যায়, রোহিঙ্গা পুরুষরা মনে করে যে সন্তান জন্ম দেয় নারীরা, পুরুষরা নয়। তাই কোনো ধরণের জন্মনিরোধক ব্যবহার করতে হলে নারীরা করবে৷  এছাড়াও এখানে ধর্মীয় (ইসলাম) বাঁধাকেও বড় করে তুলে ধরেন অনেকে। গবেষণায় আরেকটি বিষয় ফুটে উঠেছে, তা হল - রোহিঙ্গারা মনে করে তারা যত বেশি সন্তান নিবে তত বেশি রেশন বা সাহায্য সহযোগিতা পেতে পারে। তাই কোনো ধরণের জন্মনিরোধক ব্যবহারে আগ্রহী হয় না তারা। 

এখানকার অনেক বিবাহিত নারীই কনডম ব্যতীত অন্য জন্মনিরোধক ব্যবহার করে, কিন্তু তা স্বামীর অগোচরে। কারণ তারা মনে করে, তাদের স্বামী যদি জানতে পারে তাহলে তাদের সংসারে অশান্তি নেমে আসবে। গবেষক দলকে একজন নারী বলেন, ‘আমি ডিপো ব্যবহার করি, যদিও আমি জানি আমার ধর্ম (ইসলাম) সব ধরণের জন্মনিরোধক ব্যবহার নিষেধ করে। তবে আমি কনডম ব্যবহার করি না কারণ এটা আমার স্বামীর দৈহিক চাহিদা মেটাতে দেয় না এবং এটি ব্যবহার করা আমার জন্য স্ত্রী হিসেবে ঠিক নয়।’ 

দাম্পত্য জীবনের নিরাপত্তার কথা তুলে ধরে অনেক নারী বলেন, আমার স্বামী চায় না আমি পরিবার পরিকল্পনার সভাগুলোতে অংশগ্রহণ করি। তিনি নিজেও করেন না। তিনি কনডম ব্যবহারেও ইচ্ছুক নন। তাই আমি জন্মনিরোধক পিল নেই, যদিও এর কারণে আমার খারাপ লাগে ও মাথাব্যথা হয়। তাই আমি ডিপো গ্রহণ করার চিন্তাভাবনা করছি। কিন্তু আমি যদি আমার শারীরিক অসুস্থতার কথা আমার স্বামীকে বলি তাহলে হয়তো তিনি আরেকটা বিয়ে করে নিবেন।’

বিবাহিত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষদের সরাসরি সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে সম্পন্ন করা এই গবেষণাটিতে আরো জানা যায়, নারীদের মধ্যে অন্য জন্মনিরোধক ব্যবহারে স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক খারাপ প্রভাব পড়লেও অনেক নারীই কনডম ব্যবহার করতে চান না। একজনের বক্তব্য এরকম, ‘আমার স্বামী যদি কনডম ব্যবহার করতে চানও তবু আমি তা ব্যবহার করতে দেব না। যখনই এর কথা মনে হয় তখনই আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। এর চেয়ে ভালো আমি অন্য জন্মনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহার করবো কিন্তু কনডম ব্যবহার করবো না।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গবেষক ড. নুরুজ্জামান খান  বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিবছর ২৫ হাজার শিশু জন্ম নেয়। যার অর্ধেকের বেশি শিশুর জন্মই হয় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ফলে। এত উচ্চ সংখ্যক অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের কারণে একদিকে যেমন মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে ক্যাম্পগুলো বেশি জনবসতিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে যা বাংলাদেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।  

‘ক্যাম্পে কর্মরত উন্নয়ন সহযোগীরা বিভিন্ন ধরনের জন্মনিরোধক বিতরণ করে যাচ্ছে যার মধ্যে কনডম একটি। যদিও গবেষণার উদ্দেশ্য এটা নয় যে কনডম ব্যবহার করতেই হবে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধে খুবই কার্যকর একটি পদ্ধতি কনডম। সুতরাং, আমরা যদি কনডমের ব্যবহার করতে পারি তাহলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি কমবে, মাতৃ-শিশু মৃত্যুর হারও কমবে’, যোগ করেন ড. নুরুজ্জামান খান।

ইত্তেফাক/এআই