জনপ্রতিনিধির আচরণ ও ব্যক্তিত্ব

আপডেট : ৩০ মে ২০২২, ০৯:৪২

জনপ্রতিনিধির আচরণ জনগণের কাছে একটা মুখ্য বিষয়। এ নিয়ে জনগণ সবসময়ই হয়তো আলোচনা করে না। কিন্তু জনগণের মনে এ ধরনের প্রশ্নগুলো থাকে যে, তাদের প্রতিনিধির আচরণ কেমন? কিংবা তাদের প্রতিনিধি তাদের প্রতি ভালো ব্যবহার করছে কি না ইত্যাদি। জনগণ আশা করে যে, তাদের প্রতিনিধি নিজের যেসব গুণ বা আচরণ দেখিয়ে নির্বাচনে ভোট নিয়েছেন, সেসব গুণ বা আচরণ তিনি যেন নির্বাচনের পরেও বজায় রাখেন। আর যখন তিনি তা বজায় রাখেন না, তখন সেটি নিয়ে জনগণের মনে হতাশার সৃষ্টি হয়। হতাশা বাড়তে বাড়তে একপর্যায়ে সেই জনপ্রতিনিধি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তাই একজন জনপ্রতিনিধির উচিত সব অবস্থায়ই নিজের আচরণ সম্পর্কে সচেতন থাকা। তিনি জনগণের সঙ্গে এমন আচরণ করবেন না, যে আচরণের কারণে তার ব্যক্তিত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে।

ব্যক্তিত্ব হলো ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য। আর জনপ্রতিনিধি হবেন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। এমন প্রত্যাশা জনগণ করে। এখন কথা হলো, বাংলাদেশের ইউনিয়ন পর্যায়ে মেম্বার-চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সংসদীয় আসনের এমপি পর্যন্ত প্রত্যেক জনপ্রতিনিধিই আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী কি না; তা জানা আমাদের জন্য এক বিরাট সময়সাপেক্ষ কাজ। তবে এ কথা ঠিক, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করে। এবং ভোট জনগণ তাকে দেয়, যাকে তাদের ভালো লাগে। যার আচার-ব্যবহার ভালো। এক কথায় যিনি একজন ভালো মানুষ। আর একজন ভালো মানুষ যদি দেখা যায় নির্বাচনে জয়ী হয়ে পালটে যান, জনগণের কাছের মানুষ থেকে দূরের মানুষে পরিণত হয়ে যান, ক্ষমতার দাপটে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন এবং জনগণের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতে শুরু করেন, তাহলে ধরে নিতে হবে তিনি ভালো মানুষ ছিলেন না, ছিলেন কপট। এর জবাব জনগণ সেই জনপ্রতিনিধিকে দেয়। এবং সেটা দেয় তারা ভোটের মাধ্যমে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটা জনগণের শক্তি।

জনপ্রতিনিধি সব ক্ষেত্রে সবার সঙ্গে সমান আচরণ করবেন। তিনি কারো প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করবেন না। কিংবা একজনের পক্ষ নিয়ে অপরজনের সঙ্গে অন্যায়ভাবে খারাপ আচরণ করবেন না। খারাপ আচরণের অনেক ধরন-ধারণ আছে। মুখে গালাগাল করা খারাপ আচরণ। আবার জনগণকে মারপিট করাও খারাপ আচরণ। যদিও এসব একজন জনপ্রতিনিধি জনগণের সঙ্গে করতে পারেন না। কথাটি যদি অন্যভাবে বলা হয়, এসব করা তার এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না। উদাহরণ দিয়ে বললে ব্যাপারটি নিশ্চয়ই পাঠকের কাছে আরো স্পষ্ট হবে। ধরুন, দুই জন মানুষ রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ঝগড়া লাগল। ঝগড়ার একপর্যায়ে তাদের দুই জনের মধ্যে মারামারিও হলো। এখন এই ঘটনার ফলাফল কী হতে পারে? দুই জনের মধ্যে যে দোষী, তার আইনি শাস্তি কিংবা ঘটনাটি সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা। কিন্তু সেই দুই জনের একজন যদি জনপ্রতিনিধি হয়, আর সেই জনপ্রতিনিধি যদি অপর জনকে মারধর করে, তাহলে এই ঘটনার ফলাফল গড়াতে পারে অনেক দূর পর্যন্ত। আক্রান্ত ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে সেই জনপ্রতিনিধির জনপ্রতিনিধিত্ব পদ চলে যেতে পারে। পাশাপাশি তার জেল-জরিমানাও হতে পারে।

এক্তিয়ার হলো অধিকার। অর্থাত্ একজন মানুষ কী করার অধিকার রাখেন, আর কী করার অধিকার রাখেন না সেটাকেই তার এক্তিয়ার থাকা না থাকা বোঝায়। জনপ্রতিনিধির দায়দায়িত্ব অনেক। ইচ্ছা করলেই তিনি যা ইচ্ছা তা করতে পারেন না। জনগণের ভোটে জনপ্রতিনিধি হয়ে জনগণকে মারধর করা তার এক্তিয়ারে কীভাবে থাকে? এরকম একটি ঘটনা এই কিছুদিন আগেই গোটা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, চট্টগ্রামের পটিয়ার হাইতগাঁও ইউনিয়নে জিতেন কান্তি গুহকে ইউপি চেয়ারম্যান মারধর করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। গাছে বাঁধা অবস্থায় জিতেনের মাথা থেকে ঝরঝর করে রক্ত গড়িয়ে পড়ার তার ঐ ছবি যে দেখেছে সেই শিউরে উঠেছে। আরেকটি ঘটনা ঘটে ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়ী ইউনিয়নে। সেখানেও ইউপি চেয়ারম্যান এক লোককে তার ঘর থেকে ডেকে এনে মারধর করে। এসব ঘটনা আমাদের ভাবায় এবং কিছু প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে, এগুলো কীসের আলামত? আমরা কোন সভ্য সমাজে বসবাস করছি, যে সমাজে জনপ্রতিনিধিদের নামে এমন অভিযোগ ওঠে? সত্যি বলতে, দেশটা তো রসাতলে যাচ্ছে না। বরং অপ্রতিরোধ্য গতিতে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। সবার এটা জানা। আরো জানা, বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। তাহলে কিছু কিছু জনপ্রতিনিধি এমন খারাপ খবরের শিরোনাম কেন হচ্ছেন? তারা ভালো খবরের শিরোনাম হোন। বাংলাদেশের মানুষের এটা চাওয়া। আর এই চাওয়ার পেছনে কল্যাণ নিহিত।

লেখক: শিক্ষার্থী, গণ বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন