প্রতিদিন ৫ হাজার মেট্রিক টনের ওপরে ময়লা তৈরি হয় রাজধানী ঢাকায়। প্রতিদিন জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ময়লা-আবর্জনা তৈরির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। ময়লা ফেলার নির্ধারিত জায়গা ও পর্যাপ্ত আস্তাকুঁড়ের (ডাস্টবিন) যথাযথ ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা না থাকায় যত্রতত্র আবর্জনার স্তূপ জমে ছোটোখাটো একটা আবর্জনার টিলা তৈরি হয়ে যায়। নিয়মিত এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকায় এসব স্তূপ থেকে যেমন একদিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পথচারীদের অসুবিধার সৃষ্টি করছে, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এসব ময়লার স্তূপ থেকে তৈরি হওয়া মিথেন গ্যাস ও লিচেট (ময়লা থেকে নিষ্কাশিত তরল) সহজেই পরিবেশদূষণের পাশাপাশি রোগজীবাণু বহনকারী বিভিন্ন কীটপতঙ্গকে আকর্ষণ করে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। এছাড়া বর্জে্যর দূষণ থেকে পেটের পীড়া, চর্মরোগ, ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস, ব্রংকাইটিস, শ্বাসকষ্ট, আলসার, গ্যাস্ট্রিক এমনকি লিভার ও কিডনি নষ্ট হওয়ার মতো কঠিন অসুস্হতার শিকার হয় মানুষ।
আমাদের মোট আবর্জনার ৩৭ শতাংশ তৈরি হয় রাজধানী ঢাকায়। যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকায় এই আবর্জনা আমাদের নগরজীবনের এখন প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণে যথাযথ কতৃর্পক্ষের পরিকল্পিত আবর্জনা ব্যবস্থাপনা একান্ত প্রয়োজন। আবর্জনা ব্যবস্থাপনা বলতে মূলত আবর্জনা সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনর্ব্যবহার ও নিষ্কাশনের সমন্বিত প্রক্রিয়াকে বোঝায়। কিন্তু বর্তমান সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তৈরি হওয়া অধিক পরিমাণ বর্জ্য পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে তৈরি কোনো ল্যান্ডফিলে নিরসন করা হচ্ছে না। অপরিকল্পিত ল্যান্ডফিলগুলো থেকে সংগৃহীত কঠিন বর্জে্যর মাত্র ৫৫ শতাংশ সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে এবং এদের থেকে মাত্র ২৫-৩০ শতাংশ পুনরায় ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন উপাদানে রূপান্তর করা যাচ্ছে। ঢাকার পুরাতন ল্যান্ডফিলগুলো বর্তমানে বর্জে্য পরিপূর্ণ হয়ে আছে এবং সিটি করপোরেশনগুলো আধুনিক টেকসই ল্যান্ডফিল ব্যবহারের পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করার পরিবর্তে কেবল আরো বেশি জমি অধিগ্রহণ করছে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য প্রথমেই ময়লা সংগ্রহের সুবিধার্থে ময়লাকে যেভাবে শ্রেণিবিভাগ করা যেতে পারে: (১) পৌর এলাকার আবর্জনা, (২) বাণিজ্যিক এলাকার আবর্জনা, (৩)ি শল্প এলাকার আবর্জনা। এছাড়া যেখানে শেষ গন্তব্যস্হল হিসেবে ময়লাকে মূলত মাটিচাপা দেওয়া হয়, সেখানে শ্রেণিবিভাগটা হতে পারে :(১) পচনশীল ও (২) অপচনশীল। যে শহরগুলোতে ময়লা পোড়ানো হয়, সেখানে শ্রেণিবিভাগটা এমন হয়—দহনযোগ্য, অদহনীয়, পুরর্ব্যবহারযোগ্য, প্লাস্টিক, পুরাতন কাপড়, খবরের কাগজ, পেট-বোতল, কাচের বোতল, ধাতব বস্ত্ত, অতিরিক্ত বড় ময়লা, ইলেকট্রনিক দ্রব্যাদি ইত্যাদি। আবর্জনা ব্যবস্থাপনার জন্য আবর্জনার গাঠনিক ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার থাকাটা খুব দরকার।
আবর্জনার গঠন সম্পর্কে জানার জন্য নিম্নলিখিত বৈশিষ্টগুলো জানতে হয় :আংশিক অনুপাত বিশ্লেষণ। বর্জ্যকণার আকার বিশ্লেষণ। বর্জে্যর জলীয় অংশ। বর্জে্যর ঘনত্ব। আংশিক অনুপাত বিশ্লেষণে যেসব আলাদা রকমের উপাদান একত্রে মিশে আবর্জনা তৈরি হয়েছে, সেগুলো চিহ্নিতকরণ এবং এগুলোর (শতকরা) অনুপাত নির্ণয় করা হয়। এই অংশের অধীনে বর্জে্যর শতকরা ওজনের তালিকা (তথ্যসূত্র :আহমেদ এবং রহমান, ২০০০, ডধঃবত্ ঝঁঢ়ঢ়ষু ধহফ ঝধহরঃধঃরড়হ, ওঞঘ-ইধহমষধফবংয) থেকে জানা যায় যে, বাংলাদেশে খাবার ও তরকারি বর্জ্য প্রায় ৭০ শতাংশ, যেখানে কাগজ ও কাগজজাত সামগ্রী, প্লাস্টিকজাতীয় পদার্থ, কাচ ও সিরামিক বর্জে্যর পরিমাণ দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪, ৫ ও শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। তাই আমাদের গৃহস্থালি বর্জে্যর যথাযথ ব্যবস্থাপনা আমাদের আবর্জনার মোট পরিমাণ কমাতে পাে,র যা আমাদের সুন্দর, আবর্জনার দুর্গন্ধমুক্ত পরিবেশ উপহার দিতে পারে।
এই গৃহস্থালি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি আমরা সবাই নিজ ঘর থেকেই শুরু করতে পারি জার্মান পদ্ধতি অনুসরণ করে। এ পদ্ধতি অনুসারে রান্নাবান্নার সময় তৈরি হওয়া যত আবর্জনা তা এক ব্যাগে রাখা আর কাগজপত্র অন্য ব্যাগে রাখা। এরপর রং অনুযায়ী, ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট কনটেইনারে সেগুলো ফেলতে হবে। রঙের বিষয়টিও জটিল নয়—কালো রঙের কনটেইনারে ফলতে হবে রান্নাবান্নার সময় উৎপাদিত জৈব আবর্জনা, কাগজপত্রের জন্য নীল কনটেইনার আর প্লাস্টিক দ্রব্যের জন্য হলুদ কনটেইনার। এই তিন ধরনের কনটেইনার প্রায় সব বাড়ির সামনেই কতৃর্পক্ষ থেকে ব্যবস্থা করা গেলে আর আমাদের এগুলো ব্যবহার সম্পর্কে আইন করে যথাযথ নির্দেশ দেওয়া হলে এবং আইন আমান্যে যথাযথ শাস্তির বিধান করা গেলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অনেক সহজেই সমাধানযোগ্য হবে বলে আশা রাখা যায়। এছাড়া রয়েছে কাচের বোতল ফেলার নির্দিষ্ট কিছু কনটেইনার। বাদামি, সবুজ আর সাদা বা স্বচ্ছ বোতলগুলো রং দেখে ফেলতে হয় সেই সব কনটেইনারে। তবে ব্যাটারি, অ্যাসিড বা রঙের মতো দ্রব্য ফেলা যায় না এসব কনটেইনারে। সেগুলোর জন্য আলাদা পাত্র। এখানেই শেষ নয়, বাসার আসবাবপত্র পুরোনো হয়ে গেছে এবং সেগুলো ফেলে দিতে হবে; এসব জিনিস ফেলে দেওয়ার জন্য ঠিক করা হবে নির্দিষ্ট কিছু দিন, যে দিনগুলোতে নগর কতৃর্পক্ষ বা যাদের সেসব জিনিস প্রয়োজন তারা তা নিয়ে যাবে। এখানে পুরোনো জামাকাপড় ফেলার জন্যও যথাযথ ব্যবস্থা রয়েছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে বা পার্কিং লটে একধরনের কনটেইনার থাকবে, যেগুলোতে পুরোনো জামাকাপড়, জুতো ফেলা যায়। সেগুলো আবার দান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে এবং ব্যবহারের উপযোগী পোশাক গরিব-দুঃখীদের দান করা হবে। এভাবে পরিকল্পিতভাবে ময়লা-আবর্জনা ফেলার উদ্দেশ্য হচ্ছে নিখুঁত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আবর্জনামুক্ত সুন্দর পরিবেশ তৈরি এবং সংগৃহীত আবর্জনা থেকে সর্বোচ্চ রিসাইক্লিং করা। এক্ষেত্রে পরিবেশ সুন্দর হাওয়ার পাশাপাশি আমাদের সমাজের অসচ্ছল মানুষেরও সাহায্য করা হবে। আর আমরা পাব পরিকল্পিত বর্জ্যব্যবস্থার সুন্দর আবাসিক ঢাকা নগরী।
এজন্য অবশ্যই কতৃর্পক্ষের দৃঢ় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন, সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষের এ বিষয়ে সচেতন হয়ে কতৃর্পক্ষের সঙ্গে সম্মিলিত কাজই পারে আমাদের স্বাস্থ্যকর ঢাকার পরিবেশ উপহার দিতে।
লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
