নদী বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে

আপডেট : ০৫ জুন ২০২২, ১০:০০

বাংলাদেশ ও নদী এক সূত্রে গাঁথা। একসময় নদী পথে মালামাল পরিবহন করা হতো দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় মাধ্যমও ছিল নদীপথগুলো। নদনদীকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতো দেশের অর্থনীতির চাকা। তাছাড়া কত গান-কবিতাই না রচিত হয়েছে নদীকে আশ্রয় করে। সাহিত্যের এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে নদী বন্দনা। তবে, সেই নদী এখন আর আগের মতো নেই। নদীর রূপ-যৌবনে এখন ভাটা পড়েছে অনেকটাই। নদীগুলো যেন ধুঁকে ধুঁকে মরছে। এ মরার পেছনে রয়েছে মানুষেরই হাত। নদীর প্রতি মানুষের অপরিণামদর্শিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষ নিজেই। তবে তা বোঝার চেয়ে না বোঝা লোকের সংখ্যাই অধিক। আসল কথা, বহুভাবে মানুষের দ্বারা নদীগুলো ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। দূষণ এবং দখলই নদীর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বড় কারণ।

নদীর তীরে গড়ে তোলা ট্যানারি, ডায়িং, টেক্সটাইল, ওয়াশিং মিল এবং পোশাক তৈরির শিল্পকারখানাগুলো নদীদূষণের প্রধান কারণ। ঢাকার হাজারীবাগ, তেজগাঁও ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরার নদীরক্ষা বাঁধের পার্শ্ববর্তী এলাকায় ছোট-বড় প্রায় ৭ হাজার শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। এসব শিল্পকারখানার শিল্পবর্জে্যর শেষ গন্তব্য হচ্ছে ঢাকার ফুসফুস খ্যাত বুড়িগঙ্গা নদী। এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে স্থাপিত বিভিন্ন ধরনের শিল্পকারখানা থেকে প্রায় ৬০ হাজার টন বর্জ্য পদার্থ মিশে যাচ্ছে বুড়িগঙ্গার পানিতে। নদী যেন এক ভাগাড়! বুড়িগঙ্গা থেকে সেটা ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের নদীগুলোতে। এরকম দূষণের কবলে পতিত নদীর তালিকাতে রয়েছে তুরাগ, টঙ্গী খাল, বালু, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী। প্রতিদিনই কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য পদার্থ সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোতে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৪ হাজার টন বর্জ্য ও ৫৭ লাখ গ্যালন দূষিত পানি পতিত হচ্ছে। এতে নদীর যেমন ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি ক্ষতি সাধিত হচ্ছে নদীর পানিতে থাকা উপকারী জীবকূল ও মাছের। মাছের দেহে থাকা সেসব ক্ষতিকর উপাদান খাদ্যচক্রের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। তারপর সেটা চক্রাকারে ক্ষতি করছে আমাদেরই।

শিল্প পর্যায়ের এসব দূষণ বাদেও মানুষের ব্যক্তিগত ব্যবহার্য বিভিন্ন প্লাস্টিক সামগ্রীও ফেলা হচ্ছে নদীর পানিতে। এসব প্লাস্টিক সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে বোতল, বস্তা, তৈজসপত্র ইত্যাদি। ইদানীং ওয়ান টাইম পণ্যের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। এভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে এসব প্লাস্টিক বর্জ্য মিশে যাচ্ছে নদীর পানিতে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি দূষণের শিকার হচ্ছে নদীগুলো। দুঃখের ব্যাপার হলো, অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেনি। এ কারণে বর্জে্যর ক্ষতি আমাদেরকে একটু বেশিই ভোগ করতে হচ্ছে এবং এ প্রবণতা চলতে থাকলে সামনের দিনগুলোতেও হবে।

দূষণের পাশাপাশি নদীগুলো আরো বেশি মাত্রায় যে ক্ষতির সম্মুখীন তা হলো—নদী দখল ও নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। সারাদেশে আনাচেকানাচে ছড়িয়ে থাকা পরিচিত-অপরিচিত বিভিন্ন নদী বিভিন্নভাবে দখলের শিকার। গণমাধ্যমে যেসব ঘটনা উঠে আসে তা বাস্তব ঘটনার চেয়ে অনেক কম। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নানাভাবে প্রভাব খাটিয়ে নদী ও খালের তীরবর্তী স্থান দখলে নিয়ে বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন রকম স্থাপনা নির্মাণ করছে। এমনকি নদীর তীরবর্তী স্থানে অবৈধভাবে বসানো হয়েছে হাটবাজারও। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের এক হিসাব মতে, সারা দেশে নদী দখলদারদের সংখ্যা প্রায় ৬৩ হাজার।

নদী দখল ও দূষণ বন্ধ করতে ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০২০’-এর খসড়া অনুমোদন করেছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। খসড়ার নতুন এ আইনে নদীদখল ও দূষণের জন্য শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে এবং বাড়ানো হয়েছে উক্ত কমিশনের ক্ষমতা। বড় কথা হলো, কেবল কাগজে-কলমে এসব আইন সীমাবদ্ধ করে রাখা চলবে না। সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থাকে সজাগ হতে হবে। একজন অপরাধীকে কেবল একজন অপরাধী হিসেবেই দেখতে হবে। তার পদমর্যাদা, দলীয় পরিচয়কে রাখতে হবে বিবেচনার বাইরে। অপরাধীকে দিতে হবে আইনানুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি। আর এসব আইনের ব্যাপারে নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষদের সচেতন করে তুলতে হবে। যাতে তারাও অপরাধীদের ব্যাপারে প্রশাসনকে অবহিত করতে পারে। এভাবে তৃৃণমূল থেকেই গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধ। তবেই অমানুষদের হাত থেকে নদীগুলো বাঁচতে পারবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন