লক্ষণীয় ব্যাপার যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা তীব্রতর হচ্ছে। ফ্যানের সিলিঙে ঝুলে, গলায় ফাঁস দিয়ে, ঘুমের ওষুধ খেয়ে, ছাদ থেকে লাফিয়ে— এসব অপমৃত্যু ঘটছে। তারুণ্যে ভরা জীবনের কী নিদারুণ অপচয়! অন্ধকার হলেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একেকটা মৃত্যুকূপ হয়ে ওঠে। বিষধর কোবরার মতো ফোঁসফোঁস করে হাবেলি হলগুলো।
সারাটা দিন বন্ধুদের আড্ডায় মাতিয়ে রাখা ছেলেটা রাতে ঘুমাতে পারে না। রাজ্যের সব চিন্তা মাথায় ভর করে। মাথা এতই ভারী হয়ে ওঠে যে, ধড়ে থাকতে চায় না। এই ছেলেমেয়েগুলো তো আগে এমনটা ছিল না। প্রথম যেদিন এখানে এসেছিল, সেদিনের প্রাণোচ্ছল পুলকিত আনন্দ সে ভুলে যায়। সে নিজের থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে যা আকাঙ্ক্ষা ছিল তা কোনোভাবেই পায় না। সে দেখে— একটা জীবন ডুবে যাচ্ছে যেন। হতবিহ্বল চোখে দেখে শুধু অন্ধকার। যেন কেয়ামত নেমে আসছে। তাকে বাঁচাবার কেউ নেই। জীবনের মতো অমূল্য সম্পদ তার কাছে তুচ্ছ হয়ে ওঠে। এটা তারও জানা যে, তার মৃত্যুতে কোথায় কোনো বাধা পড়বে না। পৃথিবীর গতিও তার আপন নিয়মে চলবে। আজ যে সূর্য ডুবে যাচ্ছে কাল আবার নতুন আলো নিয়ে আসবে। বেঁচে থাকা, না থাকার অঙ্গে সে মৃত্যুতেই লাভ দেখে। কী আশ্চর্য! মৃত্যু কত সহজ! বিশ্ববিদ্যালয়ে ওরিয়েন্টেশনের দিনে সে কি ভেবেছিল— স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নয়, সবাইকে ফেলে লাশ হয়ে ফিরতে হবে?
বিসিএস উন্মাদনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে জেঁকে বসেছে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত ফ্যামিলি, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবার কাছে বিসিএস ছাড়া কোনো চাকরির মূল্য নেই যেন! সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি হয়ে উঠেছে বিসিএস। বিয়ের বাজারেও এটির দর বেশ চড়া। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ৯০ জন শিক্ষার্থীর কাছে জানতে চাওয়া হয়— তারা কী হতে চায়। অন্তত ৭৭ জন শিক্ষার্থী বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডারের নাম বলেছে। এই প্রথম বর্ষ থেকে দীর্ঘ সময় দেখে যাওয়া স্বপ্নটা ভেঙে গেলে এখানেও হয়তো অনেকে আত্মহত্যা করবে। ৪৪তম বিসিএসে ৫৪টি দেশের জনসংখ্যার চেয়ে বেশি আবেদন পড়েছে। এই সংখ্যা সামনে আরো বাড়তে পারে। পছন্দের সাবজেক্টে পড়তে না পারলে প্রথম প্রথম একটু মন খারাপও হয়। কিন্তু পরে দেখা যায়, মেডিক্যাল, প্রকৌশলে পড়েও বিসিএস প্রথম পছন্দ। কম্পিউটার সায়েন্স, ইংরেজি, পদার্থবিজ্ঞান, অ্যাকাউন্টিং, পড়েও অনার্স শেষে সেও মোটা মোটা বইয়ে নাক ডুবিয়ে রেখেছে, তখন আর খারাপ লাগে না। কারণ, দিনশেষে সবাই ঐ ভারী সাধারণ জ্ঞানের বই। একালের একমুখী শিক্ষা জাতির উন্নতিতে চরম বাধা। পণ্যের দাম ক্রমশ বাড়ছেই, কিন্তু মানুষের দাম বাড়ছে না। শিক্ষার্থীরা মা-বাবার কোল ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোলে আসে। তখন ওটাই তাদের মা, অভিভাবক। মায়ের ওপর তাদের অভিমান হয়। প্রচণ্ড রকম অভিমান। কাউকে বলা যায় না যেটা। তাছাড়া কথিত বড় ভাইদের জন্য জীবন বিষিয়ে ওঠে। ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যায়। পড়ার সময়ও তাই। যেতে না চাইলে, হলের সিট তো হারাবেই। পাশাপাশি বেধড়ক মারধরও করবে। ক্লাসের হাজিরা খাতায় ‘অ্যাবসেন্ট’ হলেও বড় ভাইদের খাতায় ‘অ্যাবসেন্ট’ থাকা মানেই কপালে বড় বিপদ।
শুধু ব্যক্তিগত কারণ কিংবা প্রেমঘটিত বিষয়ে নয়, বেশির ভাগ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিস্টেমের কারণে নিজেকে হত্যা করে। কর্মচারীরাও কম ক্ষমতাধর নয়। তারাও শিক্ষার্থীদের প্রতি নাক সিঁটকায়। ধুর-ছাই বলে তাড়ায়। কাজের প্রয়োজনে গেলে বলে— ডিনারের পরে এসো। শিক্ষকরাও দায়ী অনেক ক্ষেত্রে। শিক্ষকরা নীতিকে বিসর্জন দিয়ে যেভাবে ‘দায়িত্বহীনতার কালচার’ গড়ে তুলেছেন তা শিক্ষার্থীদের হতাশ করে। সেশনজটে জীবন টালমাটাল হয়ে পড়ে অনেক সময়। পিতামাতার দায় রয়েছে। তারা বেকার সন্তানের বোঝা বইবার শক্তি হারিয়ে ফেলে। তারা ভাবেন, ছেলের একটা চাকরি হলেই জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এই ধরনের সিস্টেমিক মৃত্যুর দায় তাহলে কার? নাকি ঐ শিক্ষার্থীরই? উত্তরে অনেকটা শিক্ষার্থীদের দায়ই বলা যায়—তাই সে আর বাঁচতে চায় না। মাথা পেতে নেয় মৃত্যুদণ্ড। নিজের গলায় নিজে রশি পরানোর চেয়ে করুণ আর কী হতে পারে? নিজের গলায় ঢেলে দেওয়া বিষের যন্ত্রণা কেমন হতে পারে? আহারে জীবন! এই মৃত্যু বেঁচে যাওয়ার। সম্প্রতি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোও ‘আগুনে ঘি’ ঢালছে। লাইভে এসে আত্মহত্যা প্রবণতা বাকিদেরও উত্সাহী করছে। লাইভে আত্মহত্যা করলে নিউজ হয়। কমেন্ট বক্সে বন্ধুরা সান্ত¾নার বাণী লেখে। বাঁচার আশ্বাস দেয়। মৃত্যু পরবর্তী সস্তা জনপ্রিয়তার জন্যও অনেকে নিজেকে হত্যা করছে।
আত্মহত্যাকারীরা শুধু ব্যর্থতাই দেখে, একবার যদি সফলতার দিকে তাকানো যেত, তাহলে কোনোভাবেই মরতে ইচ্ছে হতো না। কারণ, বেঁচে থাকার চেয়ে বড় সফলতা আর নেই। জীবনে ছোট-বড় উঁচুনিচু অনেক বিপদ আসবেই, সেগুলো মোকাবিলা করার জন্য বুকে সাহস, দেহে বল ও মাথায় বুদ্ধির প্রয়োজন। বেঁচে থাকার অনেক কারণ আছে, কিন্তু মৃত্যুর কারণ সবসময় একটাই হয়। শিক্ষার্থীদের উচিত অন্তত মা-বাবার জন্য হলেও বাঁচা। ধর্মচর্চা ও শরীরচর্চা করা। রাতের প্রথম ভাগে ঘুমিয়ে যাওয়া, ভোরে ওঠার অভ্যাস তৈরি করা। সকালের স্নিগ্ধতা, পাখির কলকাকলী কতই না সুন্দর! এই বাংলার প্রাণ-প্রকৃতির দিকে তাকালে তো হাজার বছর বাঁচতে ইচ্ছে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত জীবন ও কর্মমুখী শিক্ষা দেওয়া। কাউন্সেলিং করা। কথিত বড় ভাইদের জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া, শিক্ষার্থীদের বাঁচতে দেওয়া। শিক্ষকতার মতো মহত্ পেশাকে কলুষিত না করে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া। তাহলে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অপমৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনা যাবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
