গ্রিন ব্যাংকিংয়ের প্রসার চাই 

আপডেট : ১২ জুন ২০২২, ০৩:৪৬

ব্যাংক এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান যা যুগ যুগ ধরে পরিবেশবান্ধব ও সামাজিক জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে আসছে। ব্যাংক শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং প্রচলিত ধারণার বাইরেও নানামুখী সামাজিক ও পরিবেশবান্ধব কাজ করে থাকে এটি; তারই একটা অংশ হচ্ছে ‘গ্রিন ব্যাংকিং’। গ্রিন ব্যাংকিং মূলত পরিবেশকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য একদল উদ্যোক্তা শ্রেণি কর্তৃক গৃহীত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ।

গ্রিন ব্যাংকিংয়ের ধারণাটি প্রথমে বিকশিত হয় পশ্চিমা দেশগুলোতে। পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যে ২০০৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রিন ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালের মার্চ মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য ক্রিস ভ্যান হোলেন তৎকালীন মার্কিন সরকারের মালিকানাধীন গ্রিন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে গ্রিন ব্যাংক আইন চালু করেন। গ্রিন ব্যাংকিং আইন প্রণয়নের পর প্রাথমিকভাবে ব্যাংকিংয়ের কাজগুলোতে কাগজের ব্যবহার হ্রাস করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কারণ কাগজ তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে প্রচুর পরিমাণে গাছ ব্যবহার করা হয়, যা বনায়ন ও প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

বৈশ্বিক উষ্ণতা, গ্রিন হাউজের প্রভাব, বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, গৃহস্থালির বর্জ্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রভৃতি কারণগুলো পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। যেমন :বাংলাদেশ নাতিশীতোষ্ণ দেশ হওয়ায় ঘনঘন জলবায়ুর পরিবর্তন দেখা যায়। পরিবেশের এসব বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে গ্রিন ব্যাংকিং পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করে। পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করা গ্রিন ব্যাংকিংয়ের প্রধান উদ্দেশ্য। এজন্য গ্রিন ব্যাংকিংকে পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং ব্যবস্থা বলা হয়। গ্রিন ব্যাংকিং এক ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্হা যা থেকে প্রাকৃতিক পরিবেশ বর্ধিত হয়, দেশ ও জাতি পরিবেশগতভাবে সুফল পায়।

গ্রিন ব্যাংকিং কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এবং বিশ্বের প্রথম কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রিন ব্যাংকিংয়ের পরিচ্ছন্ন ধারণা নিয়ে ২০১১ সালে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম গ্রিন ব্যাংকিং নীতিমালা তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে ২০১৩ সালে সব তফসিলী ব্যাংক তাদের নিজস্ব গ্রিন ব্যাংকিং নীতি এবং গ্রিন ব্যাংকিং ইউনিট তৈরি করেছে। ব্যাংকিং জগতে গ্রিন ব্যাংকিং নিয়ে ইংরেজিতে প্রচলিত বেশ কিছু স্লোগান আছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—Save paper save trees, Pay your bills online, Reduce, reuse and recycle ইত্যাদি। গ্রিন ব্যাংকিং অনুশীলনের দুটি মৌলিক পদ্ধতি রয়েছে। প্রথমটি হলো, অনলাইন ব্যাংকিং, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন, শারীরিক বৈঠকের পরিবর্তে ভিডিও কনফারেন্সয়ের জন্য ওয়েবক্যাম ব্যবহার, উচ্চ মাইলেজ যানবাহন ব্যবহার, অনলাইন বিবৃতি, ই-মেইল করার নথি প্রভৃতি গ্রিন ব্যাংকিংয়ের আওতাভুক্ত। অন্যটি হলো, সবুজ বিল্ডিং স্থাপন , সবুজ প্রকল্পের অর্থায়ন, বৃক্ষরোপণ ও ব্যাংকের বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুসারে, বাংলাদেশের সব সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক ইতিমধ্যে গ্রিন ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমের পাশাপাশি গ্রিন প্রকল্পেও অর্থায়ন জোরদার করেছে। ব্যাংকগুলোর ১০ হাজার ৩৪২টি শাখার মধ্যে ৯২৫১টি শাখা অনলাইনভিত্তিক, যা মোট শাখার ৮৯.৪২ শতাংশ। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ৩ হাজার ২২৬টি শাখা অনলাইন সুবিধা প্রদান করছে গ্রাহকদের। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ২১২টি শাখা এবং ১৫০টি এসএমই ইউনিট ও এটিএম বুথ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে সম্পূর্ণভাবে চালিত হচ্ছে। গ্রিন ব্যাংকিং শিল্পে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। সবুজ অর্থায়ন, ব্যাংকের অভ্যন্তরে সবুজচর্চা ও পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকা ব্যাংগুলো হলো—শাহজালাল ইসলামি ব্যাংক, আল আরাফাহ ইসলামি ব্যাংক, MTB, Brac Bank, Trust Bnak, Dutch Bnagla Bnak ইত্যাদি।

গ্রিন ব্যাংকিং পরিবেশের জন্য একটি টেকসই প্রকল্প এবং সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ বিনিয়োগকে উন্নীত করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যা আমাদের প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে সমাজ ও দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ত্বরান্বিত করবে। গ্রিন ব্যাংকিংয়ের উল্লেখযোগ্য এমন কিছু সুবিধা রয়েছে, যা ব্যাংকিং কার্যক্রম ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় ব্যাপকভাবে কাজ করতে পারে। গ্রিন ব্যাংকিং কাগজ ব্যবহারের যৌক্তিকতা কমায়, বন উজাড় নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, গ্রাহকদের দ্রুত ব্যাংকিং সেবা প্রদান করে, পরিষ্কার এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করে। এটি দেশের মানবসম্পদের উন্নয়ন করে, কম কার্বন ইমিসন তৈরি করে। এর ফলে ব্যাংকে বেশি ট্রিপ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তাছাড়া গ্রিন ব্যাংকিং ব্যাংকের মুনাফা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ গ্রিন ব্যাংকিংয়ের প্রসার বেশ কল্যাণকর। এমতাবস্থায়, দেশব্যাপী গ্রিন ব্যাংকিংয়ের প্রসার ঘটাতে হবে। বিপ্লব ঘটাতে হবে গ্রিন ব্যাংকিংয়ে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/ ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন