যানজট ও নিয়ম মেনে চলার মানসিকতা

আপডেট : ১৪ জুন ২০২২, ০৩:৪০

বর্তমানে ঢাকা শহরে যানজট সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। দিন দিন এ সমস্যা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নামবিও-এর প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ট্রাফিক ইনডেক্স-২০১৯’- এ প্রকাশিত সূচকের তথ্যমতে, বিশ্বের সবচেয়ে যানজটপূর্ণ শহরের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ঢাকা। বিশ্বের সব দেশেই যানজট আছে, তবে ঢাকা শহরের যানজটের মাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

কাজের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে কতটুকু সময় লাগবে তার কোনো সঠিক ধারণা দিতে পারে না কেউ, এর একমাত্র কারণ যানজট। কোনো স্থানে পৌঁছাতে কতটুকু সময় লাগতে পারে এমন প্রশ্নে আমরা দুটো উত্তর পাই— যানজট ছাড়া ২০/২৬ মিনিটের রাস্তা, যানযট থাকলে কত সময় লাগবে কে জানে! এতে একদিকে সময় অন্যদিকে অর্থের অপচয় হচ্ছে। দেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যানজটের কবলে পড়ে ট্রাকভর্তি সবজি, ফলমূলসহ নিত্যপণ্যের নষ্ট হওয়ার ঘটনা কম ঘটেনি। আবার একজন শিক্ষার্থী কিংবা কর্মজীবী মানুষকে নির্দিষ্ট সময়ে তার গন্তব্যে পৌঁছাতে অনেকটা সময় হাতে নিয়ে বের হতে হয়, যার জন্য নষ্ট হয় অনেক শ্রমঘণ্টা। কখনো কখনো কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয় না নির্দিষ্ট সময়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা কিংবা কোনো চাকরির পরীক্ষার সময় আমরা দেখি শুধু যানজটের কারণে শিক্ষার্থীদের অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে পড়তে হয়, স্বপ্ন ভাঙে অনেক পরীক্ষার্থীর। যানজটের কবলে পড়ে ঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে না পেরে রাস্তায় প্রাণ হারানোর বহু ঘটনা ঘটছে আমাদের দেশে।

বাংলাদেশে যানজটের অন্যতম কারণ অতিরিক্ত গাড়ির সংখ্যা। প্রতি বছরই একটি বড় অঙ্কের গাড়ি যুক্ত হয় রাস্তায়, কিন্তু রাস্তার পরিমান অপরিবর্তিতই থেকে যায়। তাই গাড়ির পরিমাণ রাস্তার ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত হওয়ায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এছাড়াও রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ন, অবৈধভাবে ফুটপাত ও রাস্তা দখল, গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা, অসচেতনতা এবং নিয়ম মেনে চলার মানসিকতা না থাকা। এসব কারণেই সৃষ্টি হয় যানজটের। অধিকাংশ সময় দেখা যায়, নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাতে একটি দীর্ঘ সময় পার করতে হয় গাড়ির মধ্যে, ধুলোবালিময় রাস্তায় যা আমাদের স্বাস্থে্যর জন্য একদমই ভালো নয়। তার মধ্যে আবার বিদ্যমান থাকে তীব্র শব্দদূষণ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দিন দিন যানজট ফুসফুসজনিত বিভিন্ন রোগসহ অনেক রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। গবেষণা বলছে, ঢাকায় যানজটের কারণে স্বাস্থ্যগত যে সমস্যা তৈরি হয় তার দৈনিক ক্ষতি গড়ে ৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। যানজটের স্বাস্থ্যগত ক্ষতিও বড় চিন্তার বিষয়। যানজটের কারণে মানুষের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, শব্দদূষণ, উদ্বেগ-উত্তেজনায় উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। কাজের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দীর্ঘসময় রাস্তায় গাড়িতে কাটানোর কারণে ক্লান্তি চলে আসে বিধায় তারা ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না।

যানজটের তীব্র ভোগান্তির কারণে রাজধানী ঢাকার পরিস্থিতি দিন দিন এমন পর্যায়ে যাচ্ছে যে, কাজ ছাড়া বাড়ির বাইরে যাওয়া তো দূরের কথা কাজ থাকলেও মানুষ বাইরে যেতে ভয় পায়। স্বাভাবিক জীবনযাপন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। মেট্রোরেলের কাজ শেষ হলে যানজট থেকে আমরা মুক্তি পাবো— এমন সম্ভাবনাকে মলিন করে দিচ্ছে গবেষকদের বার্তা। তারা বলছেন, ১৭ শতাংশ মানুষ মেট্রোরেল ব্যবহার করলেও বাকিরা বাসের ওপর নির্ভরশীল থাকবে। তাই এমন একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে সমাধান খোঁজা আমাদের জন্য অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। গতিশীল জীবনকে স্থবির করে দেয় যানজটের তীব্রতা। ঢাকার রাস্তায় অসংখ্য গাড়ি রয়েছে যেগুলো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই, অনেক গাড়ি রয়েছে যেগুলো ফিটনেসবিহীন— এগুলো সাধারণত আমাদের নজরে আসে না। নজের আসে তখন যখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে। এ ব্যাপারে যথাযথ কতৃ‌র্পক্ষকে সচেতন হতে হবে। ফিটনেসবিহীন, লাইসেন্সবিহীন গাড়ি রাস্তা থেকে অপসারণ করা গেলে একটা বড় অঙ্কের গাড়ি কমবে, যার ফলে রাস্তায় গাড়ির চাপ কিছুটা হলেও কমবে। অনেক দুর্ঘটনাও এড়ানো যাবে এতে। পাশাপাশি ফুটপাত এবং অবৈধভাবে দখল করে রাখা রাস্তাকে মুক্ত করতে হবে, যাতে পথচারীরা ফুটপাত ব্যবহার করতে পারেন, রাস্তায় গাড়ি ঠিকভাবে চলতে পারে। ফুটপাত, ওভারব্রিজ ব্যবহারে পথচারীদের উত্সাহিত করতে হবে এবং আমাদের মধ্যে নিয়ম মেনে চলার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং করা, ওভারটেকিং করা কিংবা সিগন্যাল না মানা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে। নিয়ম মেনে গাড়ি না চালানোর কারণে একদিকে যেমন তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় অন্যদিকে তেমন দুর্ঘটনাও ঘটে। এ বিষয়ে ব্যক্তি সচেতনতা ও গুরুত্বপূর্ণ। যানজট সমস্যা সমাধানে সরকার এবং জনগণ উভয়কে এগিয়ে আসতে হবে। দিন দিন এটি একটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়ে উঠছে। কাজেই এ সমস্যা দূরীকরণে সত্ত্বর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন