স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ভাসছে সিলেট ও সুনামগঞ্জের অর্ধকোটি মানুষ। কখন অবস্থার উন্নতি হবে বলা যাচ্ছে না। তবে সরকারি-বেসরকারি, আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ ও উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, বিজিবিসহ বিভিন্ন সংস্থা বন্যা কবলিত মানুষের উদ্ধার করছে। সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল এসএম সফি উদ্দিন আহমদ রবিবার দুপুরে বন্যা কবলিত সিলেট সফরে এসে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সেনাবাহিনী বন্যা কবলিত এলাকায় সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে যাবে।’
এদিকে রবিবার সিলেটের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি কম হওয়ায় মানুষের মধ্যে কিছুটা আশা জাগালেও সার্বিক অবস্থার তেমন পরিবর্তন নেই। আবহাওয়া বিভাগ বলেছে আরও বৃষ্টি হবে। তাই বন্যার্তরা উৎকণ্ঠার মধ্যে আছেন। সিলেট ও সুনামগঞ্জের ২৪টি উপজেলার অবস্থা খুব খারাপ। কোথায়ও সড়ক যোগাযোগ নেই। বন্যা কবলিত এলাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ওষুধ ও গো-খাদ্যের চরম সংকট। অনেক স্থানে গবাদি পশু মরে গেছে। চাষের মাছ, হাস-মুরগি ভেসে গেছে। অন্যদিকে আশ্রয় শিবির ও বাসা বাড়িতে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহের আবেদন জানিয়েছেন অনেকেই। নৌযানের অভাবে ত্রাণ পৌঁছানো যাচ্ছে না অনেক স্থানে। মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় অনেক স্থানের প্রকৃত খবর পাওয়া যাচ্ছে না। রবিবার দুপুরে সিলেট রেলস্টেশন থেকে পানি নেমে যাওয়ায় রেল যোগাযোগ শুরু হয়েছে। বানভাসি মানুষের সার্বিক অবস্থার উন্নতি নেই। তবে সুনামগঞ্জ পৌর শহরে বন্যার পানি খানিকটা কমেছে। গতকালের তুলনায় পানি কিছুটা কমায় বাড়ির বাইরে বের হয়েছেন মানুষ। শহরের বাইরের অন্যান্য এলাকার পরিস্থিতির এখনো আশানুরূপ উন্নতি ঘটেনি।
সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল এসএম সফি উদ্দিন আহমদ বলেছেন, এমন বিপর্যয়ের জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। হঠাৎ করে বন্যা এসে গেছে। এখন কাজের সময়, যত কষ্টই হোক দুর্গম এলাকায় উদ্ধার কাজ ও ত্রাণ সহায়তা দিয়ে যাবো। সেনাবাহিনী নিজস্ব উদ্যোগে খাবার, চিকিৎসা দিচ্ছে । তবে অনেক অর্গানাইজেশন বন্যার্তদের ত্রাণ দিতে প্রস্তাব করেছে। বিষয়গুলো সমন্বয় করার চিন্তা করছি।’
সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমি সব জায়গায় যাচ্ছি- আমাদের অপারেশন কিভাবে আরও সুন্দর করা যায় তা দেখার জন্য। জানাতে এসেছি বাসভাসি মানুষের পাশে সেনাবাহিনী আছে। আর সবাই মিলে বিপর্যয় কাটিয়ে উঠবো।’
এদিকে সুনামগঞ্জ জেলা শহরসহ ১২টি উপজেলা দ্বীপের ন্যায় বিচ্ছিন্ন। এমনকি মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান ঢাকা থেকে ইত্তেফাক প্রতিনিধিকে জানান, সুনামগঞ্জে পানি কমছে। জেলা প্রশাসন বন্যার্তদের জন্য সব কিছু করে যাচ্ছে। সরকারি সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
বন্যা দুর্গত এলাকার মানুষ খাদ্য-আশ্রয় ও বিশুদ্ধ পানি, জ্বালানী, মোমবাতির জন্য হাহাকার করছেন। দোকানগুলোতেও খাদ্য সংকট চলছে।
রবিবার বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমলে সুনামগঞ্জ জেলা শহরের মূল ট্রাফিক পয়েন্ট থেকে পানি কয়েক ইঞ্চি নেমেছে। তবে বিভিন্ন পাড়া, মহল্লা বিপর্যয়ে আছেন এখনো। নিজেদের জমানো সঞ্চয় আর মানুষের সহায়তাই এখন তাদের ভরসা। স্থানীয়রা জানান, টানা বৃষ্টি ও জমে থাকা পানির কারণে ঘর থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। যাতায়াত ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় ত্রাণ কার্যক্রমও খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। অনেকের ঘরে চাল-সবজি থাকলেও সেগুলো রান্না করে খাওয়ার মতো ব্যবস্থা নেই। বেশিরভাগ ঘরবাড়িতে পানিতে কারণে আগুন জ্বালানের ন্যূনতম সুযোগও নেই। অনেকেই বলেছেন টাকা আছে, খাবার নেই।
সিলেট সিটি করপোরেশনের বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রুহুল আলম বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে কতজন রয়েছে, সেটি বলা যাচ্ছে না। এখন সব কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সরকারিভাবে ৩০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে। কিন্তু বৃষ্টির মধ্যে সেগুলো আনা হয়নি। যে যেভাবে পারছেন, সহযোগিতা করছেন। এর বাইরে জনপ্রতিনিধিরাও এগিয়ে আসছেন।
এদিকে সুনামগঞ্জ ও সিলেটে সরকারি-বেসরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক হুমায়ূন কবীর সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জের বন্যার্তদের জন্য ৮ লাখ টাকার শুকনো খাবার পাঠিয়েছেন। পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, একসময় হুমায়ূন কবীর আমার এলাকায় চাকরি করেছেন। তিনি সেখানকার মানুষের অবস্থা জানেন বিধায় ত্রাণ পাঠিয়েছেন। এজন্য তাকে ধন্যবাদ। কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক এসেছে। আবস্থার উন্নতি হচ্ছে। যথেষ্ট ত্রাণের মজুদ।
অন্যদিকে সিলেট থেকে নৌপথে খাদ্যসামগ্রী নিয়ে একটি নৌযান রওনা হয়। দোয়ারাবাজারের কাছে গিয়ে সেটি আটকে যায়। হেলিকপ্টারে করেও খাদ্য নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, কিন্তু সুনামগঞ্জ শহরের কোথাও কোনো দালানের ছাদে হেলিকপ্টার নামার মতো ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসনের বরাত দিয়ে অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ জেসমিন আরা বেগম বলেন, ‘মানুষ কি কষ্টে ও বিপদে আছে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। বিদ্যুৎহীন শহরটি সন্ধ্যা হলেই কবরের মত মনে হচ্ছে।'

জামালপুরে বন্যা পরিস্থিতি অবনতি
চন্দ্রঘোনায় ডুবে গেছে ঘাটের পাটাতন, বন্ধ হতে পারে ফেরি চলাচল