অসত্য বক্তব্য অনাকাঙ্ক্ষিত

আপডেট : ২১ জুন ২০২২, ০৮:১৫

অনেক পাঠক শুনে অবাক হলেও একটি সত্য কথা এই যে, যুক্তরাজ্যের উত্তরাঞ্চল কেম্বি্রয়ায় প্রতি বছর নভেম্বর মাসে মিথ্যা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এবং প্রতিযোগীদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি চমকপ্রদ মিথ্যা বলতে পারে, তাকে শ্রেষ্ঠ মিথ্যাবাদী বলে তকমা দেওয়া হয়। এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল উইল রিটসন নামক এক পানশালা মালিকের স্মরণে। কারণ, ব্যবসার পাশাপাশি তার ছিল জনগণকে মিথ্যা কাহিনি বলার নেশা। এটি তিনি করতেন নিজেকে আনন্দ দেওয়ার জন্য। তার বহু উদ্ভট কাহিনির মধ্যে একটি ছিল এ রকম— তিনি একটি আহত ইগল পাখিকে সারিয়ে তোলার পর একটি শৃগাল তা খেয়ে ফেলেছিল, কিন্তু পরে সেই শৃগাল সেই ইগলকে প্রসব করেছিল। যেসব ব্যক্তি গত কয়েক বছর মিথ্যা প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন, তাদের মধ্যে ২০০৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার আব্রি কুংগার, ফ্রিডা কাহালো, ২০০৬ সালে সু্য পারকিনস নামক নারী কৌতুক অভিনেত্রী, ২০০৮ সালে জয়ী হয়েছিলেন জন গ্রাহাম নামক একজন। এ কথা বলে যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একটি জার্মান ডুবোজাহাজ যুক্তরাজ্য আক্রমণ করেছিল, সেখান থেকে ডিজিটাল টেলিভিশনের ডি-কোড অপহরণের জন্য, যা কিনা ছিল সেই সময়ের খুবই অবান্তর। এই প্রতিযোগিতায় একসময় কারলাইলের বিশপ এই উক্তি করে শ্রেষ্ঠ মিথ্যাবাদীর তকমা অর্জন করেছিলেন যে, তিনি জীবনে কখনো মিথ্যা বলেননি। কেননা, তার সেই উক্তি এ কারণে বিশ্বাসযোগ্য ছিল না যে, তিনি ছোটবেলা থেকে শুরু করে কোনো না কোনো সময় অবশ্যই মিথ্যা বলেছেন।

এই প্রতিযোগিতার উদ্যোক্তারা নিশ্চয়ই বাংলাদেশের কারো কারো কথা জানতে পারেননি। কেননা, এ পর্যন্ত যে সব ব্যক্তি মিথ্যার জন্য পদক পেয়েছেন, মির্জা ফখরুলের বলা অসত্য তার চেয়েও অনেক বেশি শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। কেননা, তিনি পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর খালেদা জিয়া স্থাপন করেছিলেন বলে ভুল তথ্য দিয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। এটি পুরোপুরি অবান্তরের মোড়কে ঢাকা এমন একটি ভুল তথ্য, যার পক্ষে কোনো প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে না। যে কারণে মির্জা সাহেবের বক্তব্য সমর্থন করে কেউ কোনো মন্তব্য করেননি। বরং খালেদা জিয়ার আমলে সেতুমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা কথাটি সত্য নয় বলে বিবৃতি দিয়েছেন। কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি কোনো কিছুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলে সেই প্রস্তর সর্বকালের জন্য রক্ষিত থাকে। খালেদা জিয়া ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলে তা-ও নিশ্চয়ই রক্ষিত থাকত। কিন্তু মির্জা সাহেব তো তা দেখাতে পারছেন না। তাছাড়া কোনো রাষ্ট্রনায়ক কিছুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলে তা ঢালাওভাবে গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়, যে জন্য ভবিষ্যতে বহু বছরও জনগণ তা মনে রাখে। অথচ খালেদা জিয়া পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন বলে কোনো মানুষই কখনো শোনেননি। মির্জা সাহেবের এই অসত্য বলা কি রাতকে দিন বানানোর মতোই না? অসত্য তো মিথ্যারই সমার্থক। ফলে প্রতিযোগিতায় তার তো পুরস্কার পাওয়ার কথা!

কোনো না কোনো সময়ে প্রায় সব মানুষই বিভিন্ন কারণে মিথ্যা বা অসত্য বলে থাকেন। কিন্তু যারা সীমা লঙ্ঘন করেন, উদ্ভট কথা বলেন, তাদের নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে এদের অনেকেই স্কিজোফ্রেনিয়া নামক মানসিক বিকারগ্রস্ত। কেউ আবার হেলোসিনেশনেও ভুগে থাকেন। এদের সাধারণত ‘পেথোলজিক্যাল লায়ার’ বলা হয়। কেননা, এরা অনেক সময় মিথ্যা বলা বন্ধ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। বিশ্বে খুব কম লোকই আছেন, যারা নাত্সি নেতা গোয়েবলস ও লর্ড হো হোর নাম শোনেননি। দ্বিতীয় মহাসমরকালে তারা পেশাগতভাবে নাত্সিবাদের সপক্ষে বার্তা প্রচার করতেন জার্মান বেতার থেকে।

গোয়েবলস এই মতবাদে বিশ্বাস করতেন যে একটি মিথ্যা শত বার প্রচার করলে মানুষ একসময় তা বিশ্বাস করবে। আর লর্ড হো হোর ভাবতেন, খুব কেতাদুরস্ত ইংরেজি ভাষায় মিথ্যা বলতে পারলে মানুষ তাকে সত্য বলেই মেনে নেয়। এদের দুজনের মতবাদই যে ব্যর্থ হয়েছে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ই তার প্রমাণ। তাদের কথা কেউ বিশ্বাস করত না।

এছাড়া যে কয়েক জনকে বিশেষ ধরনের মিথ্যাচারি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রখ্যাত শিল্পী ফ্রিডা কাহলে, যিনি নিজের জীবন নিয়ে মিথ্যা বলতেন, সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটন, যিনি হোয়াইট হাউজের নারী কর্মীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ককে অস্বীকার করার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন। রিচার্ড নিক্সন, যিনি ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর নিজেকে বাঁচাতে মিথ্যাচার করেছিলেন। মার্কিন বিজ্ঞানি, দার্শনিক ও রাজনীতিক বেঞ্জামিন ফ্রেংকলিন, যিনি কৃষ্ণাঙ্গদের মুক্তির অগ্রদূত ছিলেন, তাকেও অন্যতম মিথ্যাচারি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কারণ জীবনে তিনি বহু সাজানো গল্প করেছেন, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, যিনি ইরাকে মারণাস্ত্র রয়েছে বলে অসত্য তথ্য দিয়েছিলেন, যার ফলে যুক্তরাজ্যে শ্রমিক দলের ভরাডুবি হয়েছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার কারণে গদিই হারিয়েছিলেন। কিন্তু এদের সবার মিথ্যার রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে মির্জা ফখরুল সাহেবের অসত্য কথনে।

তার আর দুটি উদ্ভট দাবি হলো, তিনি বলেছিলেন, খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী মুক্তিযোদ্ধা এবং তারেক জিয়া ছিল বালক মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু পরিষ্কার ইতিহাস বলছে, মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস কাল খালেদা জিয়া ঢাকা সেনানিবাসে পাকিস্তানি সেনা অধ্যক্ষদের নিরাপদে, বিশেষ তত্ত্বাবধানেই ছিলেন। মর্যাদাপ্রাপ্ত অতিথি ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সব মানুষ এ ব্যাপারে ওয়াকিবহাল। জেনারেল জানজুয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনের জন্য খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে প্রোটোকলের নিয়ম ভঙ্গ করে তার মৃতু্যতে শোকবার্তা পাঠিয়েছিলেন এবং পরে তার কবর জিয়ারত করেছিলেন। এ তো কোনো লুকানো বিষয় নয়। রাষ্ট্রীয় রেকর্ডেই সেটা রয়েছে। এসব ব্যাপারে অসত্য, সম্পূর্ণ উলটো কথা বলে মির্জা সাহেব এমনকি তার দলের মানুষের কাছেও হাসির পাত্রে পরিণত হয়েছেন। প্রাক্তন সোভিয়েত ঔপন্যাসিক মিখাইল বুলগাকভ বলেছেন, ‘মিথ্যাবাদীর জিব সত্যকে ঢাকতে পারলেও তার চোখ পারে না।’ মির্জা সাহেব যখন এসব অবান্তর ও উদ্ভট উক্তিগুলো প্রকাশ করতেন, তখন কিন্তু তার চোখ দেখেই বোঝা যেত তিনি সঠিক কথা বলছেন না।

অসত্য কথা প্রচারকারীকে যে কেউ বিশ্বাস করে না, তার নজির অফুরন্ত। স্কুলে পড়াশোনাকালে একটি গল্প পড়েছিলাম। গল্পটি এমন ছিল যে এক লোক অকারণে বলে বেড়াতো বাঘ এসেছে। এরপর যখন সত্যিই বাঘ এসে তাকে ভক্ষণ করল, তখন আর কেউ তার চিৎকারের জবাবে সাহাঘ্যে আসেনি। সবাই ধরে নিয়েছিল সে অকারণেই চিৎকার করছে। মির্জা সাহেবেরও আজ একই অবস্থা। তার বিশ্বাসযোগ্যতা এখন শূন্যের কোটায়। ইরাকে মারণাস্ত্রের মজুত রয়েছে, জেনেশুনে এমন অসত্য বলায় সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার দেশবাসীর দ্বারা ঘৃণিত ও প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। মিথ্যা বলার কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্পও গদি হারিয়েছেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা থমাস জেফারসন বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি একবার মিথ্যা বলে, দ্বিতীয়বার মিথ্যা বলতে তার অসুবিধা হয় না।’ বিশ্বনন্দিত দার্শনিক জন রাসকিন বলেছেন, ‘মিথ্যার ভিত্তি হচ্ছে প্রতারণার অভিপ্রায়।’ মার্ক টোয়েন, যাকে যুক্তরাষ্ট্রের সাহিত্যজগতের স্রষ্টা বলা হয়, যার অমর উপন্যাস ‘অ্যাডভেঞ্চার অব হেকেলবারিফিন’ ইংরেজি সাহিত্যে বিপ্লব ঘটিয়েছিল, তিনি বলেছেন, ‘সত্য বললে কিছু মনে রাখতে হয় না।’

প্রথম মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ ওয়াশিংটন বলেছেন, অসত্য ব্যাখ্যা দেওয়ার চেয়ে কোনো ব্যাখ্যা না দেওয়াই শ্রেয়। বিশ্ববরেণ্য রাশিয়ান ঔপন্যাসিক লিও টলস্টয় বলেছেন, সবকিছুই মিথ্যার চেয়ে ভালো। একটি সংস্কৃত শ্লোক হলো, ‘সত্যম, শিবম, সুন্দরম’, অর্থাত্ যাহা সত্য তাহাই ভগবান, তাহাই সুন্দর। মহাত্মা গান্ধী তার আত্মজীবনী পুস্তকের নাম দিয়েছিলেন ‘মাই এক্সপেরিমেন্ট উইথ দ্য ট্রুথ’, আর সেই পুস্তকে তিনি মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বলে গেছেন। কলকাতার মাদার তেরেসা বহু ভাষণে মিথ্যা বর্জনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

আব্রাহাম লিংকন বলেছেন, ‘তুমি সব সময় কিছু লোককে মিথ্যা কথা বলে বোকা বানাতে পারো, কিন্তু সব সময় সবাইকে বোকা বানাতে পারবে না।’ লিংকন আরো বলেছেন, ‘একজন সফল মিথ্যাবাদী হওয়ার মতো স্মৃতিশক্তি কোনো মানুষেরই নেই।’ মির্জা সাহেব আব্রাহাম লিংকনের এই উক্তি পড়েছেন কি না জানি না, পড়ে থাকুন বা না-ই থাকুন, এটি যে বিশেষ করে একজন রাজনীতিবিদের জন্য অবশ্যই অনুসরণীয়, সে কথা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত সবারই উপলব্ধি করা উচিত। যারা এই অমূল্য বাণী অনুসরণ করতে ব্যর্থ হন, জনগণের ঘৃণা দিয়েই তাদের রাজনৈতিক জীবনের যবনিকাপাত ঘটে।

লেখক: আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি

ইত্তেফাক/এসজেড