সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের গুরুত্ব

আপডেট : ২৩ জুন ২০২২, ০৯:২০

সুন্দর ও সুস্থভাবে বাঁচার জন্য চাই সুন্দর ও নির্মল পরিবেশ। আমরা পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত। পরিবেশের নির্মলতা আমাদের সভ্যতার সোপানে নিয়ে যায়। আবার কখনো পরিবেশের বিপর্যয়ের কারণে জীবনে নেমে আসে হাজারো যাতনা। প্রকৃতি ও পরিবেশ আজ সংকটের মুখোমুখি। শিল্প বিপ্লবের একটি অপরিহার্য অংশ শিল্পায়ন। আর্থ-সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবে এর উদ্ভব ঘটে। শিল্পায়নের মাধ্যমে কৃষি এবং হস্তচালিত উৎপাদন নির্ভর অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে যান্ত্রিক ও শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি ও সমাজে রূপান্তরিত হয়। আর্থসামাজিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসেবে শিল্পায়নের উদ্ভাবন ঘটলেও বর্তমানে শিল্পায়ন শব্দটির সঙ্গে পরিবেশ শব্দটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যেখানেই শিল্পায়ন হচ্ছে সেখানে কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ। শিল্পায়ন পরিবেশের ওপর কতটা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে, রাজধানীর নদনদীগুলোর অবস্থা দেখে তা সহজেই বোঝা যায়।

প্রতিনিয়ত গড়ে উঠেছে বিভিন্ন শিল্পকারখানা। শিল্পকারখানার অব্যবস্থাপনা ও অসচেতনতার কারণে নষ্ট হচ্ছে আমাদের পরিবেশ। শিল্পকারখানার ধোঁয়া সরাসরি আমাদের পরিবেশে মিশে গিয়ে বায়ুদূষণ করছে। কারখানার বর্জ্য সরাসরি নদী কিংবা অন্য কোনো জলাধারে ফেলা হচ্ছে। এতে পানি তো দূষিত হচ্ছেই, নদীতে থাকা অনেক জীবও হারিয়ে যাচ্ছে। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, মোট বায়ুদূষণের ৫০ শতাংশেরও বেশি, নদীদূষণের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং শব্দদূষণের প্রায় ৩০ শতাংশ শিল্পকারখানা থেকে সৃষ্ট। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বায়ু ও বিষাক্ত বর্জে্যর দূষণে ২০১৫ সাল থেকে প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ফলে পরিবেশ দূষণ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েই চলেছে।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উত্স তৈরি পোশাক শিল্প। পোশাক শিল্পের ক্রমাগত বিকাশ অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখলেও তা পরিবেশের জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে। শুধু এই খাত থেকেই বিশ্বের ২০ শতাংশ বর্জ্য পানি এবং ১০ শতাংশ কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরিত হয়। টেক্সটাইল মিলে স্ক্রোলিং, ব্লিচিং, ডায়িং, ওয়াশিংসহ নানা প্রক্রিয়ায় পানি ব্যবহার হয়। নানা কেমিক্যাল ও ডাই ব্যবহারের ফলে কারখানার আউটলেটে প্রচুর বর্জ্য পানি জমা হয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই এই বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থাতেই ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে নদী-নালায়। ফলে মাছ ও জলজ প্রাণীর ক্ষতিসাধন হয়। বর্জে্যর উচ্চ পিএইচের মান জলজ উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্পকারখানা হতে নিষ্কাশিত বর্জের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। জলাশয়কে ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

বাংলাদেশের চামড়া শিল্প বৃহৎ রপ্তানি পণ্য হিসেবে পরিগণিত হলেও দেশে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ ও পণ্য উত্পাদনে পরিবেশসম্মত কোনো ব্যবস্থা না থাকায় চামড়া শিল্পে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি শিল্প এখন ধলেশ্বরী নদীর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে দৈনিক ৪০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য উত্পাদন হয়। যেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা রয়েছে ২৫ হাজার ঘনমিটার। অর্থাত্ দৈনিক ১৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য পরিবেশে মিশছে। বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে। বুড়িগঙ্গার মতো পরিণতির দিকে যাচ্ছে ধলেশ্বরী। চামড়াশিল্প দূষণের হাত থেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন বর্জ্য পরিশোধনাগারকে সক্ষম করা এবং সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেই ট্যানারি চালু করা।

বর্তমানে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে অনেক আবাসিক এলাকায়ও ইটভাটা দেখা যায়। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঢাকায় বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে ৫৪ শতাংশ ইটভাটা থেকে হয়। শুধু ঢাকার চারপাশে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ ইটভাটা রয়েছে। ইটভাটার দূষিত কালো ধোঁয়া সরাসরি ছড়িয়ে পড়েছে বাতাসে। এসব দূষিত উপাদানের মধ্যে পার্টিকুলেট ম্যাটার, কার্বন মনোঅক্সাইড, সালফার অক্সাইড ও কার্বন ডাইঅক্সাইড প্রতিনিয়ত বায়ুমণ্ডলে নির্গত হচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু উভয়ের জন্য পার্টিকুলেট ম্যাটার স্বাস্থে্যর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। মানবদেহে শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে প্রবেশ করে রেসপিরেটরি সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ইটভাটা থেকে নির্গত ছাই পার্শ্ববর্তী নদী বা জলাশয়ে নিষ্কাশিত হয়ে নদীদূষণ করছে। কৃষি জমির ওপরও ঋণাত্মক প্রভাব ফেলছে। মাটির উর্বরতা ও উত্পাদন ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। বর্ধিত জনসংখ্যার বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের জন্য ইটভাটার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে ইটভাটা থেকে নির্গত দূষিত উপাদানের প্রভাবে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে এসব ঝুঁকি রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে তবেই ইট উত্পাদন অব্যাহত রাখা যেতে পারে। অন্যদিকে জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজভাঙা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের দেশে এক সম্ভাবনাময় শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এটি সুনিয়ন্ত্রিত নীতিমালার মধ্য দিয়ে পরিচালিত না করলে, নদীদূষণের মাত্রা ভয়ানকভাবে বেড়ে যাবে। দেশের বিভিন্ন নদীর তীরে রয়েছে হাজারো রকমের জাহাজভাঙা ও লঞ্চ-স্টিমার মেরামত শিল্প। এখানে নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে। এসব ছাড়াও ওষুধ, রসায়নিক, প্লাস্টিক, জুতা, সিমেন্ট, সিরামিকস, ইলেকট্রনিকস, টিন ও প্যাকেটজাত খাদ্য তৈরির কারখানা, কয়লাভিত্তিক বিদু্যত্কেন্দ্রসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

অতএব, শিল্পবর্জ্য যাতে জলাশয়গুলোকে বিষাক্ত করে না তোলে, সে ব্যাপারে যত্নবান হতে হবে। শিল্প, কল-কারখানা গড়ে তোলার জন্য শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে হবে এবং তা অবশ্যই আবাসিক এলাকার বাইরে। কেননা পরিবেশকে রক্ষা করে শিল্পায়নের বিকল্প নেই। এ দুটোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা গেলে আমাদের টেকসই উন্নয়নের পাশাপাশি উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শিক্ষা ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত হবে কবে? 

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ বোঝা নয় 

পারিবারিক সংকটে বিপদে পড়ছে শিশুরা 

অর্থনীতিতে জ্বালানি মূল্যস্ফীতির প্রভাব

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা 

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই সমন্বিত উদ্যোগ 

বইপড়ুয়া জাতির তালিকায় নাম নেই কেন?

আশার আলো ‘সৌরবিদ্যুৎ’