শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আমাদের পর্যটনশিল্প

আপডেট : ২৬ জুন ২০২২, ১০:১৬

সব বাঁধা পেছনে ফেলে স্বপ্নের পদ্মা সেতু আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। পদ্মা সেতু নিয়ে আমরা গর্বিত। দৃঢ় মনোবল আর ইচ্ছা শক্তি থাকলে যে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায় বাঙালি সেটা আবার প্রমাণ করে দেখাল। এক সময় এ দেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আখ্যা দেওয়া হলেও পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আমরা দেখাতে সক্ষম হয়েছি যে— আমরাও পারি।

পদ্মা সেতু, কর্ণফুলি টানেল, মেট্রোরেল প্রকল্প বাংলাদেশের সক্ষমতাকেই তুলে ধরে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন স্বপ্ন নয়, বাস্তব। এ সেতু দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নবদিগন্ত উন্মোচন করবে। মানুষ অল্প সময়ের মধ্যে রাজধানী ঢাকায় আসতে পারবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ যোগাযোগে পিছিয়ে থাকলেও স্বপ্নের পদ্মা সেতু তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূূরণে ভূমিকা রাখবে। এত দিন এ অঞ্চলের মানুষের রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় ফেরিই ছিল একমাত্র ভরসা। বৈরি আবহাওয়ায় ফেরি চলাচল অনেক সময় ব্যাহত হতো। ফেরিতে করে কৃষকের যত্নে ফলানো শস্য, ফলমূল, শাকসবজি রাজধানীতে পৌঁছানো ছিল কষ্টসাধ্য ও দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।

দক্ষিণাঞ্চলে পর্যটনশিল্পের অপার সম্ভাবনা থাকলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় পর্যটনশিল্পও তেমন এগোয়নি। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, বরিশাল, দ্বীপ জেলা ভোলা, মোংলা বন্দর, পায়রাবন্দর, সুন্দরবনসহ দক্ষিণের চিত্তাকর্ষক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে যেতে পর্যটকদের পোহাতে হয় দুর্ভোগ। এখন স্বপ্নের পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে পর্যটকরা সহজেই এসব চিত্তাকর্ষক স্থানগুলোতে পৌঁছাতে পারবে। ফলে এগিয়ে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পর্যটন। দেশের অর্থনীতি হবে বেগবান। বেকারত্বের হার কমে আসবে। পদ্মা বহুমুখী সেতু শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থায় নবদিগন্ত উন্মোচনই করবে না, পর্যটনশিল্পের পালে বইবে পরিবর্তনের হাওয়া। পদ্মা সেতু জাদুঘর হবে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। এখানে পদ্মা অববাহিকা ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত নানান প্রজাতির প্রাণীর নমুনা রাখা হচ্ছে, যা পর্যটকদের মানসিক প্রশান্িতর পাশাপাশি নতুন কিছু দেখার ও শেখার সুযোগ করে দেবে। অন্য দিকে পদ্মার ইলিশ খাওয়ার স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা। পদ্মাপাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগের আনন্দ পর্যটকদের বারবার এখানে নিয়ে আসবে।

পদ্মার দুই পাড়ে ইতিমধ্যে গড়ে ওঠেছে হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্টসহ নানা স্থাপনা। এখানকার মানুষের চিন্তায় লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। অনেকে পর্যটনে বিনিয়োগের স্বপ্ন দেখছেন। শুধু স্থানীয়রা নয়, প্রবাসী বাংলাদেশিরাও বিনিয়োগে আকৃষ্ট হচ্ছেন। স্বপ্নের পদ্মা সেতু দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা আসছে। পরিবারপরিজন নিয়ে এখানে এসে ছবি তুলছেন, ঘুরে ঘুরে চারদিকের দৃশ্য উপভোগ করছেন, যা আগমীদিনগুলোতে পদ্মা সেতু কেন্দ্রিক পর্যটন সম্ভাবনাকেই সামনে নিয়ে আসে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ব্রিজ বা সেতুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পর্যটন। নদীর পাড়ে সময় কাটাতে যে কারোরই ভালো লাগে। নদীপাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য পর্যটকদের মনে আনে প্রশান্তি। তাইতো উৎসবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্রিজগুলো বর্ণিল আলোক সজ্জায় সজ্জিত হয়ে ওঠে। স্বপ্নের পদ্মা সেতুও আলো ছড়াবে বিশ্ববাসীর হৃদয়ে। পদ্মা সেতুকে ঘিরে পর্যটনশিল্পে রয়েছে অমিত সম্ভাবনা। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। পর্যটন মন্ত্রণালয়কে নিতে হবে সুষ্ঠু পরিকল্পনা। যাতে এখানে একটি পর্যটনবান্ধব পরিবেশে গড়ে ওঠে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ পদ্মা সেতু কেন্দ্রিক পর্যটনকে অনেক দূর এগিয়ে নেবে। তাই সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা ও দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে, তরুণ উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে সুযোগ করে দিতে হবে।

প্রমত্তা পদ্মার ওপর দিয়ে অল্প সময়ে দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষ ঢাকা যাবে, এটি এক সময় স্বপ্নের বিষয় হলেও এখন তা বাস্তব। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেরির অপেক্ষায় থাকতে হবে না ঘরমুখী মানুষদের। ঈদের সময় তাদের পোহাতে হবে না দুর্ভোগ। পদ্মার দুই পাড়ের মানুষের মধ্যে তৈরি হবে মৈত্রী বন্ধন। পদ্মা সেতু নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। পুরো জাতি তাকিয়ে আছে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর দিকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে চোখ বুলালে পদ্মা সেতুর প্রতি বাঙালির অকৃত্রিম ভালোবাসা আর আবেগ চোখে পড়ে। প্রতি দিন অসংখ্য দর্শনার্থী ভিড় জমাচ্ছে পদ্মার দুই পাড়ে। শুধু পদ্মার পাড়ে ভিড় জমানো নয় বিভিন্নভাবে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করছে মানুষ।

পদ্মা সেতু বাস্তবে রূপ নেওয়ায় দেশের পর্যটন সম্ভাবনা বেড়েছে বহু গুণ। পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক পর্যটন এগিয়ে নিতে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে, তা হলো পরিকল্পিত পর্যটন গড়ে তোলা। পর্যটকদের জন্য যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। অবকাঠামো তুলতে গিয়ে সেতু বা সেখানকার পরিবেশ যেন বিনষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। মোদ্দা কথা হলো, পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক পর্যটন যেন পরিকল্পিত পর্যটন হয়। দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষ যোগাযোগে দীর্ঘদিন পিছিয়ে থাকলেও এবার তাদের অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার সময় এসেছে। শোনা যাচ্ছে, অনেকেই পেশা বদল করে পর্যটনশিল্পে আসতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এ শিল্প লাভজনক হওয়ায় মানুষ পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক পর্যটনকে কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজছে। এক্ষেত্রে সবাইকে অর্থ উপার্জনের সুযোগ করে দিতে হবে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য বদল নয়, এটি দেশের সার্বিক অর্থনীতির চেহারা বদলে দেবে— এটাই এখন বাস্তবতা।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড