সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সম্ভাবনাময় শিল্প ‘রিসাইক্লিং’

আপডেট : ২৮ জুন ২০২২, ০২:৩৪

কালের বিবর্তনে কিংবা মানুষের প্রয়োজনে এই পৃথিবীতে নানান কিছুর আবির্ভাব ঘটে। নতুন নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়। আর আমরা প্রয়োজন মেটাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ি। আধুনিক যুগে এসে এসব যেন একটু বেশিই পরিলক্ষিত হচ্ছে। যাহোক, কথা বলছি ‘রিসাইক্লিং’ নিয়ে। এই টার্মিনোলজির সঙ্গে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। তবে এটা সম্পর্কে সবার যে স্বচ্ছ ধারণা আছে, তা বলা চলে না। মূলত রিসাইক্লিং হচ্ছে বিভিন্ন ব্যবহৃত জিনিসকে পুনরায় রিসাইকেল করে ব্যবহারের উপযুক্ত করা। এটা যে অবশ্যই পূর্বের পণ্য হতে হবে, বিষয়টা এমন না।

যেমন— কাগজ, বোতল, প্লাস্টিক, কাঁচ, অ্যালুমিনিয়ামজাত বিভিন্ন দ্রব্য অন্য পণ্যতে রূপান্তর করা বা তৈরিতে ব্যবহার করা। আমরা এখন যে সময়ে বসবাস করছি তাতে মানুষের জীবনমান বৃদ্ধি পাচ্ছে, চাহিদা ও জৌলুস বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বর্জ্যও। একটা সমীক্ষা চমকে ওঠার মতো। দ্য গার্ডিয়ান বলছে, ১৯৬০ সালের তুলনায় আজ পর্যন্ত শুধু টেক্সটাইল বর্জ্য বৃদ্ধি পেয়েছে ৮১১ শতাংশ। অন্যান্য বর্জ্যের কথা নাইবা তুললাম। এছাড়া বর্তমান সময়ে অপচনশীল দ্রব্য যেমন : প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল ইত্যাদির চাহিদা পোশাকের ন্যায় ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে আরেকটি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সারা বিশ্ব প্রতিবছর শুধু প্লাস্টিক নিঃসারণ করে থাকে প্রায় ৩০ কোটি টন! এই বিশাল সংখ্যা থেকে মাত্র ৯ শতাংশ রিসাইকেল বা পুনর্ব্যবহার করা হয়।

সুইডেন হলো স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশ। এই দেশটি গত বছর তার গৃহবর্জ্য নষ্ট হতে দিয়েছে মাত্র ১ শতাংশ, মানে একশো ভাগের এক ভাগ! শুধু তাই নয়, এই হার বিগত কয়েক বছর উর্ধ্বে যেতে দেয়নি। ‘রিসাইক্লিং’ সম্পর্কে একটি দেশ ও সে দেশের নাগরিক কতটা সচেতন তা সহজেই অনুমেয়। তবে, এটা রাতারাতি সম্ভব হয়নি? তাদেরও অনেক বেগ পোহাতে হয়েছে। আমাদের দেশে একটু ভারি বৃষ্টি হলেই নালা-নর্দমা আটকে শহরে জলাবদ্ধতার কথা প্রায় শুনি। এটার পেছনে অন্যতম একটি কারণ হলো আমাদের ব্যবহূত বর্জ্য আমরা নালায় ফেলি যা জলাবদ্ধতা তৈরিতে বৃহদাংশ ভূমিকা রাখে। অথচ এই বর্জ্য রিসাইকেল করে বিভিন্ন দেশ নিজেদেরকে যেমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখছে একইভাবে আর্থিক এবং পরিবেশগত উন্নতি সাধন করছে। যাহোক সুইডেনের এমন অসাধারণ কার্যপটুতা দেখে ইউরোপের অনেক দেশ রীতিমতো ঈর্ষান্বিত হচ্ছে।

১৯৯৬-এর ল্যান্ডফিল আইন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে কেউ ল্যান্ডফিলে বর্জ্য ফেললে তাকে মোটা অংকের জরিমানা গুনতে হয়। এছাড়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার অন্তভু‌র্ক্ত দেশগুলোর জন্য লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে, ২০২৫ সালের মধ্যে প্রত্যেকটি দেশকে তার মোট বর্জে্যর ৫০ শতাংশ রিসাইকেল করতে হবে। কিন্তু অঞ্চলভেদে রিসাইক্লিংয়ে তারতম্য থাকায় বস্তুত এই লক্ষ্যে পৌঁছানো দুরূহ। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠে, তবে সুইডেন কীভাবে এতদূর এগিয়ে গেছে? উত্তর খুব সহজ—পরিবেশের দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে সুইডিশরা যথেষ্ট সচেতন। তাছাড়া ১৯৯১ সালে বিশ্বের যে কটি দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চড়া কর ধার্য করেছে তার মধ্যে সুইডেন অন্যতম। এমনকি এই দেশ তার ব্যবহূত বিদু্যতের মোট ৫০ শতাংশ উত্পাদন করে থাকে পুনঃনবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। আর, আমরা? কয়লা ও পারমাণবিক যন্ত্র ব্যবহার বৃদ্ধি করে চলেছি।

বর্তমান টক অব দ্যা ওয়ার্ল্ড হচ্ছে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’। বলা হয়ে থাকে, বর্তমান প্রজন্মই এটি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে। এরপর হয়তো এটি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যেতে পারে। তো এই জলবায়ু পরিবর্তন কিছুটা হ্রাস করতেও ‘রিসাইক্লিং’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের অপচনশীল পণ্য যেমন প্লাস্টিক, রাবার, পলিথিন, বোতল, প্রযুক্তিগত বর্জ্য ইত্যাদি যে মাত্রায় ব্যবহূত হচ্ছে, যা কি না প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। এছাড়াও, একটি দেশকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্যও দরকার যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্হাপনা। এই যে একটু বৃষ্টি হলেই শহরে দেখা দেয় হাঁটু সমান পানি, এর জন্য নালা-নর্দমায় বর্জ্য ফেলা বৃহদাংশে দায়ী।

শুধু তাই নয়, ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ লোয়ার স্ট্রিমে অবস্থিত। ফলে প্রতি বছর বাংলাদেশকে বন্যা, খরা, সুনামি, নদী ভাঙনসহ নানান দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়। তার ওপর প্লাস্টিকজাত পণ্যের ব্যবহার তো আছেই, যা কিনা ব্লু ইকোনমিকেও হুমকির মুখে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৭৯ শতাংশ বর্জ্য পরিবেশের সঙ্গে মিশে পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে। এমনকি প্লাস্টিকজাত পণ্য পরিবেশের সঙ্গে মিশে আমাদের ফুড চেইনে অন্তর্ভুক্ত হয়ে দৈনন্দিন খাবারের অংশীদার হয়ে যায়, যা জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। এছাড়া বর্তমান সময়ে মানুষের চাহিদা অনুযায়ী এসব বর্জ্য রিসাইকেলের উদ্যোগ নিলে পরিবেশের জন্য যেমন উপকারী হতে পারে, তেমনি আর্থিকভাবে লাভবানেরও দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। কাজেই একে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে একটি ‘সম্ভাবনাময় শিল্প’ হিসেবে। তবে এর জন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি। সচেতনতা বৃদ্ধি, বর্জ্য পুনর্ব্যবহারে প্রশিক্ষণ বা উৎসাহ প্রদান, সুফল সম্পর্কে আলোকপাত, যত্রতত্র বর্জ্য নিক্ষেপে জরিমানা, আইন প্রয়োগ ইত্যাদি বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া গেলে একটি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শিক্ষা ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত হবে কবে? 

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ বোঝা নয় 

পারিবারিক সংকটে বিপদে পড়ছে শিশুরা 

অর্থনীতিতে জ্বালানি মূল্যস্ফীতির প্রভাব

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা 

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই সমন্বিত উদ্যোগ 

বইপড়ুয়া জাতির তালিকায় নাম নেই কেন?

আশার আলো ‘সৌরবিদ্যুৎ’