সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন দ্বার

আপডেট : ২৮ জুন ২০২২, ০৩:০৪

পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে আমরা এক সম্ভাবনার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করলাম। বাংলাদেশ নদীমাতৃৃক দেশ। নদীমাতৃৃক দেশ হিসেবে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাহিত্যে বারবার এসেছে বাংলাদেশের প্রধানতম এই নদী— প্রমত্তা পদ্মা নদী। পদ্মা নামটি এসেছে লোটাস ফুল থেকে। পদ্মার উৎপত্তি হিমালয়ের গঙ্গোত্রী পাদদেশের হিমপ্রবাহ থেকে। পদ্মা নাম শুনলেই দেশের মানুষের মনে ভেসে ওঠে দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ভোগান্তির চিত্র।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, শিল্পসহ সর্বক্ষেত্রে দুর্ভোগের এক নাম ছিল পদ্মা। এই পদ্মাকে ঘিরেই রচিত হয়েছে কত কবিতা, গান, রচনা। আর আজ পদ্মার বুকে রচিত হলো বাংলার ইতিহাসের বিস্ময়কর সৃষ্টি— পদ্মা বহুমুখী সেতু। খুলে গেল অপার এক সম্ভাবনার দ্বার। পদ্মা সেতু আজ বাঙালির অসীম সাহসিকতার নাম।

দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২৫ জুন বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা নিরলস পরিশ্রম-প্রচেষ্টায় সফলভাবে উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনে অংশ নিয়ে বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা সেতু শুধু ইট-পাথরের অবকাঠামো নয়, এটা আমাদের অহংকার ও সক্ষমতার প্রতীক’। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এই পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে বাংলাদেশকে। পাড়ি দিতে হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাময় বহু পথ। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের পথকে বাঁধাগ্রস্ত করেছে। কিন্তু আজ পদ্মা সেতু শুধু কল্পনা নয়, বহুল প্রত্যাশিত স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন বাস্তবে ধরা দিয়েছে বাংলার মানুষের কাছে। এ যেন বাংলাদেশের আরেক জয়। এটি শুধু একটি সেতুই নয়, বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের চালিকাশক্তি, সক্ষমতার প্রতীক এটি।

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। যোগাযোগ ব্যবস্থার অবনতি হলে পণ্যের জোগান বাধাগ্রস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সঠিক ভাবে, সঠিক সময়ে জোগান নিশ্চিত করা দুরূহ হয়ে পড়ে। এতে রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক বিপর্যয় হয়, অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয়। পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রাজধানীসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে, যা ঐ সব জেলার যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ত্বরান্বিত করবে। এই সেতুর নিচ দিয়ে রেল সংযোগের ব্যবস্থা রয়েছে।

পদ্মা সেতু এমন কয়েকটি জেলার সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপন করছে, যেসব জেলার সঙ্গে পূর্বে রেল যোগাযোগ ছিল না। সরাসরি সড়ক পথ ও রেল সংযোগের ফলে এসব জেলায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত হবে, শিল্পকারখানাসহ আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে, ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বার উন্মুক্ত হবে। পূর্বের তুলনায় যাতায়াত ব্যবস্থায় এখন তিন-চার ঘণ্টা সময় কম লাগবে।

ফলে বাংলাদেশ দ্রুতগতির উন্নয়নে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এগিয়ে যাবে। এতে দেশে গ্রস ন্যাশনাল প্রডাক্ট (জিএনপি) ১.২ হতে ১.৫-এ উন্নীত হবে। অপর দিকে গ্রস ডোমেস্টিক প্রডাক্ট (জিডিপি) বৃদ্ধি পাবে ২.৩ শতাংশ। এখন পুনরুদ্ধার করা লবণাক্ত জমি উর্বর হতে শুরু করবে, ফসলের ফলন বৃদ্ধি পাবে। মত্স শিল্পসহ সব প্রকার হিমায়িত পণ্যদ্রব্য আর হিমায়িত নয় বরং স্বল্পসময়ে বাজারজাতকরণের ফলে আয় বাড়বে বহুগুণ।

সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে এখন কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, খুলনা, মোংলায় পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে যাবে। এতে যেমন মানুষ কম সময়ে পর্যটন কেন্দ্রে পৌঁছাবে, তেমনি পরিবহন ব্যয় বহুলাংশে কমবে। পর্যটন এরিয়ার স্থানীয় নিঃস্ব ও নিম্নবিত্ত মানুষের উপার্জন ক্ষমতা বেড়ে যাবে, ঠিক ততগুণে সমৃদ্ধি হবে পর্যটনশিল্প। এতে ঘটবে ব্যাপক শিল্পায়ন ও বছরের শুরুতে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে আনুমানিক ০.৭৫ শতাংশ। পদ্মা সেতুর প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী হবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় তিন কোটিরও বেশি মানুষ। এতে কর্মসংস্থান, দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পিছিয়ে থাকা জেলাগুলোর উন্নয়নের মধ্য দিয়ে পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দরিদ্রতা কমবে। একদিকে যেমন যাতায়াতের সময় কমে আসবে, অন্যদিকে পরিবহন খরচও কমবে এই সেতুর কল্যাণে।

এখন আর চিকিৎসার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে থাকতে হবে না ফেরিঘাটে, চাকরিজীবী মানুষটাকে আর দেরিতে অফিসে যাওয়ায় মিথ্যা অজুহাত দেখাতে হবে না। ফেরি বা নৌযানে বহন করা কষ্টসাধ্য পণ্য এখন সহজেই রেলে বাজারজাতকরণ ও ভোক্তাদের কাছে বিপণন করা যাবে। ফলে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি রোধ করে বাজারের মূল্য স্হিতিশীল রাখা যাবে। এটি যেমন জাতীয় অর্থনীতি ও আঞ্চলিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে, তেমনি ২০৩০ সাল নাগাদ প্রায় ৫ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। পদ্মা সেতু শুধু স্থানীয়ভাবে নয়, এটি আন্তর্জাতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা পদ্মা সেতু ও সরাসরি সংযোগ সড়ক এশিয়ান হাইওয়ে রুটের অংশ হওয়ার ফলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ সহজ করবে। ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ করে চলাচল যেমন সহজ হবে, তেমনি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আর্থসামাজিক অবদান রাখার পাশাপাশি বহির্বিশ্বে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচয় এনে দেবে। সর্বোপরি, দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষের ব্যবসা, শিক্ষা, শিল্প ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সঙ্গী হয়ে থাকবে পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থা নয়, অর্থনীতিতে খুলল সম্ভাবনার নতুন দ্বার।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

শিক্ষা ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত হবে কবে? 

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ বোঝা নয় 

পারিবারিক সংকটে বিপদে পড়ছে শিশুরা 

অর্থনীতিতে জ্বালানি মূল্যস্ফীতির প্রভাব

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা 

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই সমন্বিত উদ্যোগ 

বইপড়ুয়া জাতির তালিকায় নাম নেই কেন?

আশার আলো ‘সৌরবিদ্যুৎ’