শুক্রবার, ১৯ আগস্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মানসিক সমস্যা অভিশাপ নয়

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২২, ০৯:৩৪

দেহ এবং মন এই দুইয়ের সমন্বয়ে মানুষের সৃষ্টি। দেহ যেমন বিভিন্ন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা বাহ্যিক দুর্ঘটনার মাধ্যমে অসুস্থ হতে পারে, তেমনি মনও আক্রান্ত হতে পারে বিভিন্ন মানসিক সমস্যার দ্বারা। যেমন: ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি, সিজোফ্রেনিয়া ইত্যাদি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, শারীরিক কোনো সমস্যা হলে আমরা সেটাকে যেভাবে গুরুত্ব দিই, মানসিক সমস্যাকে সমানভাবে এড়িয়ে চলি আমরা।

আমরা ধরে নিই—‘এটা কোনো ব্যাপার না, এমনি এমনি ঠিক হয়ে যাবে’। এর ফলে আদতে আমরা কি মুক্তি পাই? নাকি সমস্যা নিয়েই চলতে থাকি? শরীরের কোনো অংশে ক্ষত তৈরি হলে আমরা হয়তো সেটাকে সরাসরি দেখতে পাই, কিন্তু মনের ক্ষত হলে সেটা দেখা সম্ভবপর হয়ে উঠে না কোনোভাবেই। মনের ক্ষতের একটা বহিঃপ্রকাশ পাওয়া যায় আমাদের চিন্তা ও আচরণের অস্বাভাবিকতায়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, মানসিক রোগ হচ্ছে রোগীর অস্বাভাবিক আচরণ, যা প্রকৃতপক্ষে সামাজিক বা সাংস্কৃতিক নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত নয়। মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আমরা প্রায়শই ‘পাগল’ বলে আখ্যায়িত করে থাকি। সমাজে তাদেরকে নানান ভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়।

সাধারণত আমরা সমস্যাকে বাদ দিয়ে ব্যক্তিকেই নানাভাবে হেনস্তা করে থাকি, আর সমস্যার পুরো দায়ভার ব্যক্তিকেই দিই। এই ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি সুচিবাই-গ্রস্ত। অর্থাত্ কারণে-অকারণে বারবার হাত ধোয়া। এখন একজন নরমাল মানুষ উক্ত সমস্যা-গ্রস্ত ব্যক্তিকে উল্লেখ করে বলতে পারে, বারবার হাত ধোয়ার কি আছে? তোমার হাত তো পরিষ্কারই আছে বা অযথা কেন হাত ধোয়ার কাজে সময় নষ্ট করছ? অর্থাত্ নরমাল মানুষটি তার নিজের অবস্থান থেকে বিচার করে এসব মন্তব্য করছে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি কি ইচ্ছা করেই বারবার হাত ধুচ্ছে, নাকি সে মানসিক সমস্যার শিকার? মনোবিজ্ঞান বলছে, সুচিবাই একটি মানসিক সমস্যা। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি একই চিন্তা বারবার করে এবং একই কাজ বারবার করে—ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও।

গবেষণা মতে, একক কোনো কারণে মানসিক সমস্যার উদ্ভব ঘটে না। নানাবিধ কারণ এর পেছনে দায়ী। যেমন : জিন ও ক্রোমোজমের ত্রুটির কারণে মানসিক রোগ হয়। সিজোফ্রেনিয়ার জন্য ত্রুটিপূর্ণ জিন দায়ী। নিউরোট্রান্সমিটার ত্রুটির ফলে অস্বাভাবিক আচরণ তৈরি হয়। শিশু মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় বা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর পর মস্তিষ্কে আঘাত পেলে বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যা হয়। মনস্তাত্ত্বিক কিছু কারণও আছে।

যেমন: শৈশবকালীন দ্বন্দ্ব, ত্রুটিপূর্ণ আচরণ শিক্ষণ, ভ্রান্তবিশ্বাস, আত্মক্ষমতার অভাব, পীড়াদায়ক অভিজ্ঞতা, মানসিক চাপ ইত্যাদি। মানসিক সমস্যার ব্যাপ্তি যে কত বিস্তৃত তা বিভিন্ন পরিসংখ্যানিক হিসাব থেকেই বোঝা যায়। ২০১৯ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় উঠে আসে, প্রতি আট জন লোকের মধ্যে এক জনের মানসিক রোগ বিদ্যমান। ঐ একই সংস্থার ২০২০ সালের পরিচালিত গবেষণার ফলে দেখা যায়, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে অ্যাংজাইটি এবং ডিপ্রেশন আগের চেয়ে অনেক মাত্রায় বেড়ে গেছে। মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশের মানুষও পিছিয়ে নেই। ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত পরিচালিত একটি গবেষণার ফলাফল থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশের শতকরা ১৭ ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি মানসিক সমস্যায় ভোগে, যার মধ্যে ১৬.৮ ভাগ পুরুষ এবং ১৭ ভাগ নারী। গবেষণার ফলাফল থেকে জানা যায়, ৬.৭ ভাগ মানুষ বিষণ²তা-বৈকল্য, ৪.৫ ভাগ উদ্বেগ, ২.১ ভাগ সোমাটিক সিম্পটমস, ০.৭ ভাগ সুচিবাই, ০.৩ ভাগ নিউরো-ডেভেলপমেন্ট ডিস অর্ডারস, ০.২ ভাগ মাদকাসক্তিজনিত সমস্যা, ০.১ ভাগ পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে ভোগে। ফলাফলে আরো দেখা যায়, শহরের ১৮.৭ ভাগ মানুষ এবং গ্রামের ১৬.২ ভাগ মানুষ মানসিক সমস্যায় ভোগে। মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে উক্ত সমস্যা থেকে উত্তরণের বিভিন্ন পথ ব্যাখ্যা করেছেন মনোবিজ্ঞানীরা। উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার স্নায়ুবিধ সিগমুন্ড ফ্রয়েড। তিনি সাইকোডাইনামিক তত্ত্বের প্রবক্তা। তার মতে, আমাদের অবচেতন মনের দ্বন্দ্বগুলো সমাধান করার মাধ্যমে মানসিক সমস্যার সমাধান সম্ভব। আলোচিত আরেকটি থেরাপি হলো কগনিটিভ-বিহেভিয়ার থেরাপি। এ থেরাপি মতে, আমাদের সমস্ত সমস্যার মূলে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ চিন্তাভাবনা।

এসব চিন্তা সরিয়ে পজিটিভ চিন্তা স্থাপন করা গেলে সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। আরো কিছু উল্লেখযোগ্য চিকিৎসাপদ্ধতি আছে যেমন—সমগ্রতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি, মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি। মোটকথা, মানসিক সমস্যা কোনো ভূত বা অপদেবতার অশুভ দৃষ্টি নয়। এটি শারীরিক রোগসমূহের সম্পূরক রোগ, যা চিকিৎসায় ভালো হয়। কিছু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভালো না হলেও রোগের মাত্রা কমানো সম্ভব। তাই আমাদের উচিত সময় থাকতেই মানসিক স্বাস্থে্যর যত্ন নেওয়া।

লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এসজেড

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন