সাম্প্রতিক বন্যা ও কৃষকদের করণীয়

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২২, ০৭:৪৬

এই বছর যখন বন্যা এসেছিল, তখন শুধু ধানের খেতের ধানই ভেসে যায়নি, বরং বসতবাড়িতে সঞ্চিত যে ধানগুলো ছিল তাও এই হঠাৎ বন্যায় ভেসে গিয়েছে, যা অনেককে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, এপ্রিল ও মে মাসে বন্যা সত্ত্বেও মাঠ থেকে ২ কোটি টন বোরো ধান কাটা হয়েছে যা গত বছরের তুলনায় বেশি অথচ সারা বছরের জন্য মজুত করে রাখা তাদের গুদামগুলো এখন খালি পড়ে আছে। প্রতিটি স্বাস্থ্যকর বসতবাড়ি এখন ত্রাণখাদ্যে বেঁচে আছে। ১৫ জুন শুরু হওয়া বন্যা দুই মাসের মধ্যে তৃতীয় আঘাত। শুধু সিলেট জেলাতেই ২৬ জুন পর্যন্ত ২৮ হাজার ৯৪৫ হেক্টর ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে। নিম্নাঞ্চলে বন্যার পানি এখনো না কমায় আরো তিনটি জেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হচ্ছে। সিলেট জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব মতে আউশের প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই বন্যা সিলেটের কৃষির জন্য একটি বড় ধাক্কা। তাছাড়া, বন্যার পানি না কমায় কৃষকগণ আমন বীজতলা তৈরি করতে শুষ্ক জমির বিশাল সংকটের সম্মুখীন হচ্ছেন। সারা দেশের আউশ ফলনের প্রায় ১৬ শতাংশ এবং বোরোর আট শতাংশ উৎপাদিত হয় শুধু সিলেট বিভাগে। এবারের হঠাৎ বন্যায় থমকে যায় সিলেট অঞ্চল। কেবল খাদ্য-পানি আর আশ্রয়ের সংকটই ছিল না, ছিল বিদ্যুৎ সংকটও। মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যায়, চার্জের অভাবে অনেকে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারেননি। নৌকা ভাড়া অনেক বেশি থাকায় ত্রাণ পৌঁছানোয় সংকট দেখা দিয়েছিল।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যার কারণ

বাংলাদেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ ও কুড়িগ্রামসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোয় হঠাৎ শুরু হওয়া বন্যার পেছনে অতিবৃষ্টির বাইরে আরো কয়েকটি কারণ দেখছেন গবেষকগণ। ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে অতিবৃষ্টি একটি বড় কারণ হলেও এর বাইরে আরো কিছু উপাদান কাজ করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে ভারতের চেরাপুঞ্জি অঞ্চলে। সেখানে এ বছর ২৪ ঘণ্টায় ৯৭২ মিলিমিটার এবং তিন দিনে ২ হাজার ৪৮৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, ফলে বাংলাদেশে এই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। সুনামগঞ্জ জেলার সীমান্ত থেকেই ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি এলাকার শুরু হয়েছে। ফলে সেখানকার পানি সরাসরি বাংলাদেশের হাওরে এসে মেশে। ভৈরব বা মেঘনা নদী হয়ে সাগরে চলে যায়। কিন্তু অতীতের বৃষ্টিপাতের প্রেক্ষাপট আর এখনকার নদীগুলোর অবস্থার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে বলে নদী গবেষকগণ মনে করছেন। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে আবহাওয়া-জলবায়ু বা বৃষ্টির ধরন বদলে গিয়েছে। এখন বৃষ্টি হলে কম সময়ে বেশি পরিমাণে বৃষ্টি হয়। কিন্তু এবারের বন্যার পেছনে হঠাৎ উজান থেকে আসা অতিরিক্ত পানি বের হতে না পারাও অন্যতম একটি কারণ। চেরাপুঞ্জিতে যখন বৃষ্টি হয়, সেটা ছয় থেকে আট ঘণ্টার ভেতরে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে চলে আসে কিন্তু নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় সেখানে এসে পানি দ্রুত নামতে পারে না, ফলে তখন সেটা আশপাশের এলাকায় বন্যার সৃষ্টি হয়। হাওরে অসময়ে বর্ষার পানি অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রতি বছর বাঁধ নির্মাণ ও পুরাতন বাঁধ মেরামত করে থাকে তবে এর পাশাপাশি নদীগুলো ঠিকমতো ড্রেজিং না হওয়া, ময়লা-আবর্জনায় নদীর তলদেশ ভরে যাওয়া, ঘরবাড়ি বা নগরায়ণের ফলে জলাভূমি ভরাট হয়ে যাওয়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ফলদায়ক হচ্ছে না। এছাড়া ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূতাত্ত্বিক গঠন বাংলাদেশে বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।

সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি

সাম্প্রতিক বন্যার কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হবে। এখন যা অনুমান করা হচ্ছে তা হলো বন্যার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি ভয়াবহ হবে। পানি কমতে শুরু করায় পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাবে, এতে জনগণকে আরো বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হবে। মে মাসের বন্যা এই অঞ্চলের প্রায় ১২ লাখ মানুষকে প্রভাবিত করেছিল এবং খাদ্য মজুতের ৭৮ শতাংশ ক্ষতি করেছিল। সর্বশেষ বন্যার প্রভাব জীবিকার ওপর আরো বিধ্বংসী হতে পারে। ১৮ মে, আকস্মিক বন্যায় বেশির ভাগ ফসল এবং খাদ্য সঞ্চয়স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয় অন্যদিকে ১৭ জুন ও পরবর্তী দিনগুলোতে, বাড়িঘর, গবাদি পশু এবং অবশিষ্ট খাদ্য সঞ্চয় বন্যায় ভেসে যায়। দেশের বোরো চাষের এক-চতুর্থাংশ উৎপাদিত হয় সিলেট হাওর এলাকার সাতটি জেলায়। উৎপাদিত ফসলের মারাত্মক ক্ষতি চালের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বন্যায় অন্যান্য অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যার অর্থনৈতিক মূল্য অপরিসীম।

বন্যার ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় করণীয়

৫০ বছর আগে, বর্ষার প্রথম দিকে প্রথম আকস্মিক বন্যা হতো এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে এবং মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে। বন্যা প্রতিরোধী বাঁধের উচ্চতা মে মাসের শেষ পর্যন্ত ফসল রক্ষা করার জন্য ছিল। ১৫ বছর আগেও বন্যা প্রতিরোধী বাঁধের উচ্চতা একই ছিল, তবে সে সময়ে আমরা দেখতে পেয়েছি যে, মে মাসের শুরুতেও নদীগুলো অনেক বেশি স্ফীত হয়েছে। তারপর সরকার কৃষকদের পরামর্শ দেয় যে, তারা যেন এপ্রিলের মাঝামাঝি বোরো ফসল কাটে। গত ১০-১৫ বছরে, বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় এবং বর্তমানে এপ্রিলের পরিবর্তে মার্চের শেষের দিকে ফসল তোলার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়। হাওরকে কীভাবে পরিচালনা করা যায় সে সম্পর্কে একটি নতুন চিন্তাভাবনা প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন যার মাধ্যমে আমরা ধান ও মৎস্য চাষ থেকে আমাদের সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে পারি। আমাদের একটি জলভিত্তিক বাস্তুতন্ত্র এবং প্রকৃতিভিত্তিক উন্নয়ন কার্যকলাপের দিকে যেতে হবে। আমাদের স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। ফসল কাটা একটি বড় সমস্যা, কারণ নদীগুলো হঠাৎ করে বেড়ে যায়। তাই যান্ত্রিকীকরণ (একটি প্রক্রিয়ায় মেশিন বা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের প্রবর্তন) ফসল কাটার প্রক্রিয়ায় প্রবর্তন করাও জরুরি। আরেকটি উল্লেখযোগ্য সমস্যা হচ্ছে, বর্ষার শেষে বা আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের মধ্যে, পোল্ডার থেকে জল সরে যেতে পারে না। তাই পোল্ডারগুলো থেকে পানি নিষ্কাশনের উপায় খুঁজতে হবে। স্থানীয় সম্প্রদায়কে এ প্রক্রিয়ায় জড়িত করা এবং Adaptation কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মানুষ ও প্রাণিকুলকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। এছাড়াও বন্যার পানি দ্রুত বঙ্গোপসাগরে সরিয়ে নেওয়ার জন্য নদী বা খাল-বিল খননের নিয়মিত ব্যবস্থা করতে হবে।

বন্যা-পরবর্তী সময়ে কৃষকদের করণীয়

সিলেট-সুনামগঞ্জের মতো নিচু এলাকাতে তেমন কোনো ফসল চাষ করা হয় না। মাঝারি উঁচু এলাকাতে রোপা আমন জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্ট মাস জুড়ে লাগানো হয়। আগাম বন্যার পূর্বাভাস পাওয়া গেলে রবি মৌসুমে স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন ফসল চাষ করতে হবে। অন্যদিকে মৌসুমি বন্যার ক্ষেত্রে খরিফ-১ ও খরিফ-২ মৌসুমের ফসল চাষ করা যাবে না, তবে বন্যার পানি নেমে গেলে সময় প্রাপ্তি সাপেক্ষে চাষ করতে হবে। এক্ষেত্রে বন্যার সময় উঁচু জমি বা ভিটাবাড়িতে ফসলের চারা তৈরি করে রাখতে হবে যা পানি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লাগাতে হবে। কৃষিতে বন্যায় ক্ষতির প্রভাব পড়ে দীর্ঘমেয়াদি। এ কারণে কৃষক ভাইদের ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং বন্যার পানি নেমে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সব ধরনের ফসলের যত্ন ও রবি ফসল চাষাবাদ কার্যক্রম যথারীতি চালিয়ে যেতে হবে। রোপা আমন ধানের আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে, ভালো জায়গার সুস্থ গুছি থেকে কিছু অংশ তুলে নিয়ে ফাঁকা জায়গা পূরণ করে দিতে হবে। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর পরই চারার পাতার ৮-১০ সেন্টিমিটার (৩-৪ ইঞ্চি) আগা কেটে দিতে হবে এবং ছত্রাকনাশক স্প্রে করে দিতে হবে। চারা না পাওয়া গেলে স্থানীয় জাতের আউশ ধান (হাসিকলমি, সাইটা, গড়িয়া) এর গজানো বীজ আশ্বিনের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ছিটিয়ে বোনা যেতে পারে। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর মরিচ ও ডাল জাতীয় ফসলের বীজ বোনা যেতে পারে। বন্যার পানি নেমে গেলে বিনা চাষে গিমাকলমি, লালশাক, ডাঁটা, পালং, পুঁইশাক, ধনে, সরিষা, খেসারি, মাষকালাই আবাদ করা যেতে পারে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত শাকসবজি ও অন্যান্য ফসলি জমির রস কমানোর জন্য মাটি আলগা করে ছাই মিশিয়ে এবং সামান্য ইউরিয়া ও পটাশ সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। এ বছর লাগানো ফলের চারার গোড়ার পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রয়োজনে গোড়ায় মাটি দিয়ে সোজা করে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দিতে হবে। বন্যার পানি নেমে যাবার সঙ্গে সঙ্গে ভাসমান কচুরিপানার ওপর লাউ, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া ও অন্যান্য সবজির তৈরি চারা নির্ধারিত জায়গায় বসিয়ে দিতে হবে।

পরিশেষে, জাতীয় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি তথা অব্যাহত রাখার স্বার্থে বন্যা-পরবর্তী কৃষি পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। এ জন্য সরকারি বেসরকারি সংস্থা থেকে সমন্বিত পদক্ষেপ হাতে নিতে হবে। সিলেট-সুনামগঞ্জের মতো নিচু এলাকাতে বারবার আগাম ও আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। এজন্য সঠিক বন্যা-পূর্বাভাসের ব্যবস্থা করা, ফসল চাষাবাদে কার্যকর সময় ব্যবস্থাপনা, নদী ও খাল-বিল খননের মাধ্যমে পানি প্রবাহ সচল রাখা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: ভাইস চ্যান্সেলর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন